ওঁদের মাথার ওপর থেকে মুকুট তুলে নিয়ে যাজক পাঠ করলেন শেষ প্রার্থনা, অভিনন্দন জানালেন নবদম্পতিকে। লেভিন চাইলেন কিটির দিকে, এমনটা তাকে আগে আর কখনো দেখেননি। তার মুখে সুখের যে নতুন প্রভা দেখা দিয়েছে, তাতে অপরূপ লাগছিল তাকে। লেভিন তাকে কিছু-একটা বলতে চাইছিলেন, কিন্তু ভেবে পাচ্ছিলেন না অনুষ্ঠান শেষ হয়ে গেছে কিনা। যাজক উদ্ধার করলেন তাঁকে। সহৃদয় মুখে হাসি নিয়ে মৃদুস্বরে তিনি বললেন, ‘চুম্বন করুন স্ত্রীকে, আর আপনি চুম্বন করুন স্বামীকে।’ ওঁদের হাত থেকে মোমবাতি নিয়ে নিলেন তিনি।
সন্তর্পণে স্মিত ওষ্ঠপুটে চুম্বন করলেন লেভিন, তারপর কিটিকে বাহুলগ্না করে নৈকট্যের একটা নতুন বিচিত্র অনুভূতি নিয়ে বেরিয়ে গেলেন গির্জা থেকে। এটা যে সত্যি তা বিশ্বাস হচ্ছিল না তাঁর, বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। শুধু যখন তাঁদের ভীরু ভীরু বিস্মিত দৃষ্টির বিনিময় হচ্ছিল, কেবল তখনই বিশ্বাস করছিলেন তিনি, কেননা অনুভব করছিলেন ওঁরা এখন এক।
নৈশাহারের পর নবদম্পতি সেই রাতেই চলে গেলেন গ্রামে।
সাত
আন্না আর ভ্রন্স্কি একসাথে ইউরোপ ভ্রমণ করছেন আজ তিন মাস। তাঁরা যান ভেনিস, রোম এবং নেসে এখন সত্য এসেছেন ছোট একটি ইতালীয় শহরে কিছুকাল এখানে কাটাবেন বলে।
পকেটে হাত গুঁজে, অবজ্ঞাভরে চোখ কুঁচকে সমীপবর্তী এক ভদ্রলোককে কি-একটা কড়া জবাব দিচ্ছিল সুদর্শন চেহারার হেড ওয়েটার, পমেড মাখানো ঘন চুল তার ঘাড় থেকে পাট করা, পরনে ফ্রক-কোট, বাতিস্ত শার্টে ঢাকা চওড়া বুক, গোল পেটের ওপর একগোছা দোলক। ঢোকবার অন্য মুখ থেকে সিঁড়ির দিকে পদশব্দ যেতে শুনে সে ঘুরে দাঁড়াল এবং তাদের ওখানে সেরা ঘরগুলো ভাড়া নিয়েছেন যে রুশী কাউন্ট, তাঁকে দেখে সসম্ভ্রমে পকেট থেকে হাত বার করে মাথা নুইয়ে জানাল যে কুরিয়ার এসেছিল, পালাৎসো ভাড়া নেওয়া চলবে, সরকার চুক্তি সই করতে রাজি।
‘আ, খুশি হলাম’, ভ্রন্স্কি বললেন, ‘উনি কি ঘরে আছেন?’
ওয়েটার বলল, ‘উনি বেড়াতে বেরিয়েছিলেন, তবে এখন ফিরেছেন।’
চওড়া কানার নরম টুপিটা মাথা থেকে খুলে ভ্রন্স্কি তাঁর ঘর্মাক্ত কপাল আর চুপ মুছলেন। চুল নেমে এসেছে কানের আধখানা পর্যন্ত, উল্টো দিকে তা আঁচড়ানোয় ঢাকা পড়েছে টাকটা। এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাঁকে লক্ষ করছিলেন। অন্যমনস্কভাবে সে দিকে চেয়ে চলে যাবার উপক্রম করলেন তিনি।
ওয়েটার বলল, ‘এ ভদ্রলোক রুশী, আপনার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন।’
পরিচিতদের হাত এড়িয়ে কোথাও যাবার নেই বলে বিরক্তি আর নিজের একঘেয়ে জীবনে বৈচিত্র লাভের বাসনার একটা মিশ্র অনুভূতি নিয়ে যে ভদ্রলোক খানিকটা সরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন, তাঁর দিকে আরো একবার চাইলেন ভ্রন্স্কি; আর একই সাথে জ্বলজ্বল করে উঠল দুজনেরই চোখ।
‘গোলেনিশ্যেভ!’
‘ভ্ৰনস্কি!’
সত্যিই ইনি গোলেনিশ্যেভ, পেজ কোরে থাকাকালে ভ্রন্স্কির বন্ধু। কোরে গোলেনিশ্যেভ ছিলেন উদারনৈতিক মতবাদের লোক, কোর থেকে বেরন অসামরিক পদ নিয়ে, ফৌজে কোথাও কাজ করেননি। কোর থেকে উত্তীর্ণ হবার পর দুই বন্ধুর একেবারে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়, পরে দেখা হয়েছিল কেবল একবার।
সে সাক্ষাৎটা থেকে ভ্রন্স্কি বুঝেছিলেন যে গোলেনিশ্যেভ কি-সব উচ্চমার্গীয় উদারনৈতিক ক্রিয়াকলাপে আত্মনিয়োগ করেছেন এবং সে কারণে ভ্রন্স্কির ক্রিয়াকলাপ ও পদে নাক সিঁটকাবার ইচ্ছে হচ্ছিল তাঁর। তাই গোলেনিশ্যেভের সাথে সাক্ষাতের সময় ভ্রন্স্কি লোকদের সামনে বরাবর যা করে থাকেন তেমন একটা শীতল ও গর্বিত ভাব ধারণ করেছিলেন যা শুধু তিনিই পারেন, যাতে বোঝানো হয় : ‘আমার জীবনধারা আপনার ভালো লাগতেও পারে, নাও লাগতে পারে, ওতে আমার কিছুই এসে যায় না; কিন্তু আমার সাথে পরিচয় রাখতে চাইলে সম্মান করতে হবে আমাকে।’ ভ্রন্স্কির ভাবভঙ্গিতে গোলেনিশ্যেভ ছিলেন ঘৃণাভরে উদাসীন। এ সাক্ষাৎটায় তাঁদের মনোমালিন্য বেড়ে যাবে বলেই মনে হতে পারত। এখন কিন্তু পরস্পরকে চিনতে পেরে জ্বলজ্বলে মুখে তাঁরা চেঁচিয়ে উঠলেন আনন্দে। ভ্রন্স্কি কখনো ভাবতেই পারেননি যে গোলেনিশ্যেভকে দেখে এত খুশি হবেন, তবে সম্ভবত তিনি নিজেই জানতেন না কত একঘেয়ে লাগছিল তাঁর। গত সাক্ষাৎকার যে অপ্রীতিকর ছাপ ফেলেছিল সেটা তিনি ভুলে গেলেন; আন্তরিক আনন্দোজ্জ্বল মুখে তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন প্রাক্তন বন্ধুর দিকে। গোলেনিশ্যেভের মুখেও আগের শংকার ছায়া কেটে গিয়ে ফুটে উঠল একই রকম আনন্দ।
‘কি যে খুশি হলাম তোকে দেখে!’ অমায়িক হাসিতে নিজের শক্ত সাদা দাঁত উদ্ঘাটিত করে ভ্রন্স্কি বললেন।
‘আমি অবশ্যই ভ্রন্স্কি নামটা শুনছিলাম, কিন্তু কোন ভ্রন্স্কি, জানতাম না। খুব আনন্দ হচ্ছে!’
‘চল যাই। কি করছিস তুই?’
‘এখানে আমি আছি এই দ্বিতীয় বছর। কাজ করছি।’
‘আ!’ দরদ দিয়েই বললেন ভ্রন্স্কি, ‘চল যাই।’
এবং রুশীদের যা অভ্যাস, চাকর-বাকরদের কাছ থেকে যেটা লুকিয়ে রাখতে চান সেটা রুশ ভাষায় না বলে বলতে লাগলেন ফরাসিতে।
‘কারেনিনার সাথে তোর পরিচয় আছে? একসাথে ভ্রমণ করছি আমরা, আমি ওঁর কাছে যাচ্ছি’, মন দিয়ে গোলেনিশ্যেভের মুখভাব লক্ষ করতে করতে তিনি বললেন ফরাসি ভাষায়।
