মায়ের কাছে নস্কি আর লেভিনের মধ্যে কোন তুলনাই হতে পারে না। মায়ের ভালো লাগতো না যেমন লেভিনের উদ্ভট, উকট সব মতামত, সমাজে তার আনাড়িপনা (যেটা তার গর্বপ্রসূত বলে তিনি ধরে নিয়েছিলেন), তেমনি, মহিলাটির ধারণায়, গরু-বাছুর চাষী-বাসী নিয়ে গাঁয়ের কি-একটা বুনো জীবন;এটাও তার পছন্দ হয়নি যে লেভিন তার মেয়ের প্রেমে পড়ে এ বাড়িতে আসা-যাওয়া করেছেন দেড় মাস, যেন কিসের আশা করছিলেন, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলেন, যেন ভয় পাচ্ছিলেন, পাণিপীড়িনের প্রস্তাব দিলে কি ওঁদের বড় বেশি সম্মান দেখানো হবে, আর । ভেবেই দেখেননি, যে-বাড়িতে বিবাহযোগ্যা কন্যা আছে, সেখানে যাতায়াত করলে নিজেকে ব্যক্ত করে বলা দরকার। আর হঠাৎ কিছুই না বলে কয়ে তিনি চলে গেলেন। এতই ও অনাকর্ষণীয় যে কিটি তার প্রেমে পড়েনি, এটা ভালোই হয়েছে, ভেবেছিলেন মা।
সব দিক দিয়েই ভ্রনস্কি তৃপ্ত করেছিলেন মায়ের আকাঙ্ক্ষা। অতি ধনী, বুদ্ধিমান, অভিজাত, দরবারে যে চমৎকার একটা সামরিক কেরিয়ার গড়ে তুলতে চলেছেন, মনোহর একটা লোক। এর চেয়ে ভালো কিছুর আশা করা যায় না।
বলনাচগুলোয় ভ্রনস্কি স্পষ্টতই কিটির দিকে সবিশেষ মনোযোগ দিতেন নাচতেন তার সাথে, তাঁদের বাড়ি যেতেন, ফলে তার সংকল্পের শুরুত্বে সন্দেহের অবকাশ ছিল না। তাহলেও এই সারাটা শীত ছিলেন একটা অদ্ভুত অস্থিরতা আর উত্তেজনার মধ্যে।
ফুফুর ঘটকালিতে প্রিন্স-মহিষীর নিজের বিয়ে হয়েছিল ত্রিশ বছর আগে। পাত্র সম্পর্কে আগে থেকেই জানা ছিল সব কিছু, এল সে কনে দেখতে, তাকেও দেখা হল; কার কেমন লেগেছে সেটা জেনে ঘটকী ফুফু জানালেন পরস্পরকে; ভালোই লেগেছিল দু’পক্ষের; তারপর নির্ধারিত দিনে পিতামাতার কাছে এল পাণিপীড়নের প্রত্যাশিত প্রস্তাব এবং তা গৃহীত হল। সবই চলেছিল অতি সহজে আর নির্বিঘ্নে। অন্তত প্রিন্স মহিষীর তাই মনে হয়েছিল। কিন্তু নিজের মেয়েদের বেলায় তাকে টের পেতে হয়েছিল যে এই বিয়ে দেওয়াটা মোটেই তেমন সহজ, সরল, আপাত-সাধারণ ব্যাপার নয়। তার বুড়ো দু’মেয়ে ডল্লি আর নাটালির বিয়েতে কতরকম ভয়ই-না তার করেছে, কত ভাবনা ফিরে ভাবতে হয়েছে, খরচ করেছেন কত টাকা, কত খিটিমিটি বেধেছে স্বামীর সাথে। এখন ছোট মেয়ের বেলায় তাঁকে সইতে হচ্ছে সেই একইরকম ভয়, একইরকম সন্দেহ, আর আগের চেয়ে স্বামীর সাথে আরো বেশি কলহ। বৃদ্ধ প্রিন্স সমস্ত পিতার মতই ছিলেন নিজের মেয়েদের সম্মান ও নিষ্পপতা নিয়ে অতিশয় খুঁতখুঁতে আর কড়া। তার মেয়েদের, বিশেষ করে তার আদরিণী কিটি সম্পর্কে তিনি ছিলেন অবিবেচকের মত স্নেহে ঈর্ষায় পীড়িত, মা মেয়ের নাম ডোবাচ্ছে বলে প্রতি পদে তিনি একটা তুলকালাম কাণ্ড বাধাতেন। প্রথম মেয়েদের সময় থেকেই স্ত্রী এতে অভ্যস্ত, কিন্তু এবার তিনি অনুভব করছিলেন যে প্রিন্সের খুঁতখুতানির ভিত্তি এখন আছে বেশি। তিনি দেখছিলেন যে সাময়িক কালে সমাজের রীতিনীতি অনেক বদলে গেছে, এতে মায়ের দায়িত্ব হয়ে উঠেছে অনেক কঠিন, তিনি দেখছেন যে কিটির সমবয়সীরা নানান সব সমিতি গড়ে তুলছে, কিসব কোর্সে যোগ দিচ্ছে, অবাধে আলাপ করছে পুরুষের সাথে, একা একা রাস্তায় বেরোচ্ছে গাড়ি করে, অনেকে উপবেশনের ভঙ্গিতে অভিবাদনও করছে না আর সবচেয়ে বড় কথা, সকলেরই দৃঢ় বিশ্বাস, স্বামী নির্বাচন তাদেরই ব্যাপার, পিতামাতার নয়। এসব তরুণী, এমন কি বৃদ্ধেরাও ভাবতো এবং বলত, এখন আর লোকে আগের মত মেয়ের বিয়ে দেয় না। কিন্তু কি করে এখন মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়, সেটা প্রিন্স-মহিষী জানতে পারেননি কারো কাছ থেকে। সন্তানের ভাগ্য স্থির করে দেবে মা-বাপে–এই ফরাসি রেওয়াজ এখন অগ্রহণীয়, ধিকৃত। মেয়েদের অবাধ স্বামীনতার ইংরেজ কেতাও অগ্রাহ্য এবং রুশ সমাজে অসম্ভাব্য। ঘটকালির রুশী রীতি বিকট, এবং সবাই, এমন কি প্রিন্স-মহিষীও হাসাহাসি করেছেন তা নিয়ে। কিন্তু মেয়ে কিভাবে বিয়ে করবে, তার বিয়ে দেওয়া হবে কেমন করে, সেটা কেউ জানে না। এ ব্যাপারে প্রিন্স-মহিষী যাদের সাথে কথা বলেছেন, তারা শুধু বলেছেন একটা কথাই? ও সব ছাড় ন, একালে ও সব সেকেলে প্রথা ঝেড়ে ফেলাই উচিত। বিয়ে তো করতে যাচ্ছে মা-বাপে নয়, তরুণ-তরুণীরা, তাই যা বোঝে সেইভাবে। ঠিকঠাক করে নিক। যার মেয়ে নেই, তার পক্ষে এ কথা বলা সহজ, অথচ প্রিন্স-মহিষী বুঝতেন যে মেলামেশায় মেয়ে এমন লোকের প্রেমে পড়তে পারে যে তাকে বিয়ে করতে অনিচ্ছুক অথবা এমন লোক, যে স্বামী হবার অযোগ্য। এবং তাকে যতই বোঝানো হোক যে আমাদের কালে নবীনদের উচিত নিজেরাই নিজেদের ভাগ্য স্থির করে নেওয়া, তিনি সেটা বিশ্বাস করতে পারেননি, যেমন তিনি বিশ্বাস করতে পারেন না যে কোন কালেই পাঁচ বছর বয়সী শিশুর সেরা খেলনা হওয়া উচিত গুলিভ পিস্তল। তাই বড় মেয়েদের চেয়ে কিটির জন্য তার দুশ্চিন্তা ছিল বেশি।
এখন তার ভয় হচ্ছিল যে ভ্রনস্কি আবার যেন তার মেয়ের প্রতি ওই সবিশেষ মনোযোগেই সীমিত না থাকেন। তিনি দেখতে পাচ্ছিলেন যে মেয়ে তার প্রেমে পড়েছে, কিন্তু এই বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন যে লোকটা সৎ ও কাজ তিনি করবেন না। কিন্তু সেইসাথে তার জানা ছিল যে বর্তমানের অবাধ মেলামেশায় একটা মেয়ের মাথা ঘুরিয়ে দেওয়া কত সহজ এবং সাধারণভাবে পুরুষেরা এই অন্যায়টাকে কত লঘু চোখে দেখে। গত সপ্তাহে কিটি মাকে বলেছিল মাজুরকা নাচের সময় ভুক্তির সাথে কি কথাবার্তা হয়েছিল তার। কথাবার্তাটি খানিকটা আশ্বস্ত করে প্রিন্স মহিষীকে; কিন্তু সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হতে তিনি পারেননি। কিটিকে ভ্রনস্কি বলেছিলেন যে তাঁরা, দু’ভাই-ই সব কিছু ব্যাপারেই মায়ের কথামত চলতে এত অভ্যস্ত যে তার পরামর্শ না নিয়ে গুরুতুপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত কখনো গৃহীত হয় না। এখন আমি পিটার্সবুর্গ থেকে মায়ের আগমনের অপেক্ষা করছি একটা বিশেষ সৌভাগ্য হিসেবে’, বলেছিলেন : ভ্রনস্কি।
