ডল্লি দাঁড়িয়ে ছিলেন কাছেই, ওঁদের কথা শুনছিলেন, কিন্তু জবাব দিলেন না। ভারি ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন তিনি। চোখে তাঁর পানি এসে গিয়েছিল, না কেঁদে কিছু বলতে তিনি পারতেন না। কিটি আর লেভিনের জন্য আনন্দ হচ্ছিল তাঁর; মনে মনে নিজের বিয়ের দিনটায় ফিরে গিয়ে তিনি দেখছিলেন জ্বলজ্বলে-মুখ অব্লোন্স্কিকে, ভুলে গেলেন নিজের বর্তমান, মনে পড়ছিল কেবল তাঁর প্রথম নিষ্কলংক ভালোবাসার কথা। তিনি স্মরণ করলেন শুধু নিজেকে নয়, নিকট ও পরিচিত সমস্ত নারীদেরই; স্মরণ করলেন তাদের একমাত্র জয়জয়ন্তীর দিনটা যখন কিটির মতই বুকের মধ্যে ভালোবাসা, আশা আর ভয় নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মুকুটের তলে, অতীতকে বিদায় দিয়ে প্রবেশ করেছিল রহস্যময় ভবিষ্যতে। এই ধরনের যত নববধূর কথা তাঁর মনে হল, তার মধ্যে ছিলেন তাঁর মিষ্টি আন্নাও, যাঁর সম্ভাব্য বিবাহবিচ্ছেদের বৃত্তান্ত তিনি শুনেছেন সম্প্রতি। তিনিও এমনি কমলা রঙের ফুলে আর অবগুণ্ঠনে দাঁড়িয়ে ছিলেন নিষ্কলুষ মূর্তিতে। আর এখন?’
‘ভারি অদ্ভুত’, বললেন তিনি।
ক্রিয়াকর্মের সমস্ত খুঁটিনাটি লক্ষ করছিলেন শুধু বোনেরা, বান্ধবীরা এবং আত্মীয়-স্বজনেরাই নয়; বাইরের মেয়েরা, দর্শনার্থীরাও পাছে বরকনের কোন একটা ভঙ্গি, কোন একটা মুখভাব দৃষ্টিচ্যুত হয় এই ভয়ে উদ্বেল হৃদয়ে দম বন্ধ করে সব লক্ষ্য করছিলেন এবং নির্বিকার পুরুষদের রহস্য করে বলা অথবা অবান্তর উক্তির উত্তর দিচ্ছিলেন না, প্রায়শ শুনছিলেনই না।
‘অমন কাঁদো-কাঁদো মুখ কেন? নাকি বিয়ে করছে ইচ্ছার বিরুদ্ধে?’
‘অমন সুকুমার একজন বরকে বিয়ে করতে গেলে ইচ্ছার বিরুদ্ধে আবার কি আছে? প্রিন্স নাকি?’
‘সাদা রেশমের পোশাকেও কি ওর বোন? শোন শোন ডিকন এবার কেমন করে হেঁকে ওঠে : নারী ভয় করো তোমার পতিকে।’
‘চুদোভের ঐকতান দল?’
‘না, সিনোদের।’
‘চাপরাশিকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। বলছে যে বর এখুনি ওকে নিয়ে যাবে নিজের মহালে। বলছে, সাংঘাতিক বড়লোক। সেই জন্যই বিয়ে দিলে।’
‘না, দুটোতে মানিয়েছে বেশ।
‘আর আপনি মারিয়া ভ্লাসিয়েভনা আমাকে বলছিলেন যে কুনোলিন আজকাল কেউ আর ওরকম পরে না। আলতা রঙের পোশাকে ওই ওকে দেখুন, শুনছি নাকি রাষ্ট্রদূতের বৌ, কি মেখলা… একবার এদিকে, আবার ওদিক।’
‘আহা, বেচারি কনে, বধ করার আগে যেন সাজানো মেষটি! যতই বলো, করুণা হয় আমাদের বোনদের দেখলে।’
গির্জার দরজা দিয়ে যারা সেঁধতে পেরেছিল, এই ধরনের কথাবার্তা চলছিল সে সব দর্শনার্থীদের মধ্যে।
ছয়
আংটি-বদল অনুষ্ঠান হয়ে যাবার পর গির্জার একজন লোক গোলাপি রঙের এক টুকরো রেশমী বস্ত্র পেতে দিলে গির্জার মাঝখানে গ্রন্থপীঠটার সামনে, ঐকতান দল শুরু করল জটিল ও নিপুণ একটি স্তোত্র, যাতে তারা ও উদারা স্বরগ্রাম বাজছিল সংঘাতে। যাজক ঘুরে কনেকে। গালিচায় প্রথম যে পা দেবে পরিবারে তারই থাকবে প্রাধান্য, এই সুলক্ষণটা নিয়ে কতবার কত কথাই না তাঁরা শুনেছেন, কিন্তু গালিচার দিকে কয়েক পা তাঁরা যখন এগিয়ে গেলেন, তখন কিটি’বা লেভিন কারুর সে কথা মনে পড়ল না। এক দলের মতে লেভিন প্রথম পদক্ষেপ করেছেন, অন্য দলে দুজনে গেছে একসাথেই, এই নিয়ে তুমুল মন্তব্য ও বিতর্কও কানে গেল না তাদের।
পরিণয় বন্ধনে আবদ্ধ হতে তারা রাজি আছে কিনা, অন্য কাউকে বাগ্দান করেছে কিনা, এসব চলতি প্রশ্নের যেসব জবাব তাঁদের নিজেদের কানেই অদ্ভুত শোনাল, তারপর শুরু হল নতুন আচার। প্রার্থনার কথাগুলোর মানে বোঝার চেষ্টা করে তা শুনছিল কিটি, কিন্তু মনে ধরতে পারছিল না। অনুষ্ঠান যত এগোচ্ছিল, মন তার ততই ভরে উঠছিল একটা বিজয়বোধ আর সমুজ্জ্বল আনন্দে, মনোনিবেশের ক্ষমতা থাকছিল না তার।
প্রার্থনা করা হল : ‘উহাদিগে আরও দান করো শুচিতা ও গর্ভফল, উহাদিগে আহ্লাদিত করো পুত্র ও কন্যার মুখদর্শন করাইয়া।’ স্মরণ করিয়ে দেওয়া হল, সৃষ্টিকর্তা আদমের পঞ্চরাস্থি থেকে স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন এবং ‘তার জন্য মানুষ পিতা ও মাতাকে ত্যাগ করিয়া স্ত্রীতে আসক্ত হইবেক এবং দুই দেহ এক হইবেক, আর ইহা মহারহস্য’; প্রার্থনা করা হল, সৃষ্টিকর্তা আইজাক ও রেবেকাকে, জোসেফ মোজেস আর জিপ্পোরাকে যেমন দিয়েছেন, এদেরও তেমনি উর্বরতা আর আশীর্বাদ দিন, এরা যেন নিজেদের পুত্রের পুত্রদের দেখে যায়। এসব শুনতে শুনতে কিটি ভাবছিল, ‘সবই অপূর্ব, এছাড়া অন্য কিছু হতে পারত না’, তার দীপ্ত মুখে জ্বলজ্বল করছিল সুখের হাসি যা অজ্ঞাতসারে সঞ্চারিত হচ্ছিল অন্যদের মধ্যেও যারা তাকাচ্ছিল তার দিকে।
যাজক যখন ওদের মুকুট পরালেন আর শ্যেরবাৎস্কি তিন বোতাসের দস্তানা পরা কাঁপা-কাঁপা হাতে সে মুকুট কিটির মাথার অনেক ওপরে তুলে ধরে রাখলেন, তখন কেউ-কেউ যেন পরামর্শ দিল, ‘পুরোপুরি পরিয়ে দিন!
‘পরিয়ে দিন!’ হেসে ফিসফিস করল কিটি।
কিটির দিকে চাইলেন লেভিন, তার মুখের আনন্দ ঝলকে অভিভূত বোধ করলেন তিনি; অজ্ঞাতসারে সে আনন্দটা সঞ্চারিত হল তাঁর মধ্যেও। কিটির মতই তিনি উদ্ভাসিত আর খুশি হয়ে উঠলেন।
বাইবেল পাঠ এবং শেষ শ্লোকে ডিকনের যে কণ্ঠনির্ঘোষের জন্য বাইরের লোক অধীর হয়ে অপেক্ষা করছিল তা শুনতে ভালো লাগছিল তাঁদের। ভালো লাগছিল চ্যাপ্টা পাত্র থেকে পানি-মেশানো উষ্ণ সুরা পান করতে। আর সবচেয়ে বেশি ভালো লাগল যখন যাজক তাঁর আঙরাখা তুলে দু’হাতে ওঁদের নিয়ে গেলেন গ্রন্থপীঠ প্রদক্ষিণে আর জলদগম্ভীর গলায় একক গায়ক গেয়ে উঠল : ‘উল্লাস করো ইসায়া’। মুকুটবাহক শ্যেরবাৎস্কি আর চিরিকভও কনের কলাপে জড়িয়ে গিয়ে কেন জানি হাসছিল, আনন্দ হচ্ছিল তাদেরও, কখনো দাঁড়িয়ে যাচ্ছিল তারা আর যাজক থেমে গেলে হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল বর-কনের ওপর। আনন্দের যে ফুলকি জ্বলে উঠেছিল কিটির মধ্যে, মনে হল তা যেন গির্জায় উপস্থিত সকলের ভেতর ছড়িয়ে পড়েছে। আর তাঁর যা ইচ্ছা হচ্ছে, যাজক আর ডিকনও সেইভাবে হাসতে চাইছেন বলে মনে হল লেভিনের।
