ডল্লি, চিরিকভ আর অব্লোন্স্কি এগিয়ে গেলেন সাহায্যে। শুরু হল চাঞ্চল্য, ফিসফিসানি, হাসাহাসি, কিন্তু বর- কনের গুরুত্বপূর্ণ মর্মস্পর্শী মুখভাব বদলাল না; বরং আংটির ব্যাপারে গোলমাল করে ফেলার পর তাদের মুখভাব হয়ে দাঁড়াল আগের চেয়েও গুরুগম্ভীর আর যে হাসি নিয়ে অব্লোন্স্কি ফিসফিস করে বলছিলেন যে এবার প্রত্যেকেই নিজ নিজ আংটি পরুক, সেটা আপনা থেকে মিলিয়ে গেল তাঁর ঠোঁটে। তাঁর মনে হল, যে কোন হাসিতেই আহত বোধ করবে ওরা।
‘আদি হইতে তুমি নারী ও পুরুষ সৃষ্টি করিলেক’, অঙ্গুরী বিনিময়ের পর পড়তে লাগলেন যাজক, ‘সাহায্যের লাগি এবং মানবজাতির বংশরক্ষার লাগি তুমি স্বামীকে দাও স্ত্রী। তোমার উত্তরাধিকারের মধ্যে এবং তোমার প্রতিশ্রুতিতে সত্যকে যিনি প্রেরণ করেন, তোমার দাস, বংশে বংশে নির্বাচিত আমাদের পিতৃপুরুষদের নিকট, হে প্রভু পরমেশ্বর, তোমার দাস কনস্তান্তিন আর দাসী ইয়েকাতেরিনাকে অবলোকন করো এবং বিশ্বাসে, সমভাবনায়, সত্যে ও প্রেমে উহাদিগের পরিণয় সংগত করো…’
লেভিনের ক্রমেই মনে হতে লাগল যে বিবাহ সম্পর্কে তাঁর যা ধারণা ছিল, কিভাবে নিজের জীবন গড়ে তুলবেন তা নিয়ে তাঁর যা স্বপ্ন, সে সবই নেহাৎ ছেলেমানুষি, এটা এমন একটা জিনিস যা তিনি এতদিন পর্যন্ত বোঝেননি, এখন তো আরো কম বুঝছেন, যদিও ব্যাপারটা ঘটছে তাঁকে নিয়েই; বুকে তাঁর ক্রমেই বেশি করে একটা খামচি বোধ হতে থাকল, চোখ ফেটে বেরোল অবাধ্য অশ্রু।
আন্না কারেনিনা – ৫.৫
পাঁচ
গির্জায় ছিল গোটা মস্কো, আত্মীয় পরিচিত সবাই। বিবাহানুষ্ঠানের সময় আলো-ঝলমল গির্জায়, সুসজ্জিত নারী ও ললনা, সাদা টাই, ফ্রককোট, আর ফৌজী উর্দি পরা পুরুষদের ভিড়ে শালীনতা মেনে মৃদু কথোপকথনের আর বিরাম ছিল না। সেটা চালাচ্ছিল প্রধানত পুরুষেরাই, মেয়েরা ছিল অনুষ্ঠানের সমস্ত খুঁটিনাটি পর্যবেক্ষণে তন্ময়, সব সময়ই এগুলি তাদের পবিত্র অনুভূতিকে নাড়া দেয়।
কনের সবচেয়ে কাছের মহলটায় ছিলেন তার দুই বোন, ডল্লি এবং বিদেশ থেকে আগত ধীর-স্থির সুন্দরী বড় বোন লভা।
‘বিয়েতে মারি এ কি-একটা বেগুনি গাউন পরে এসেছে, প্রায় কালো বললেই চলে’, বললেন কর্সুনস্কায়া।
‘ওর গায়ের যা রঙ, তাতে এটাই একমাত্র উদ্ধার’, মন্তব্য করলেন দ্রুবেৎস্কায়া, ‘কিন্তু আমার অবাক লাগছে, বিয়ের অনুষ্ঠানটা করা হল সন্ধ্যায় কেন। এ যে বেনিয়াদের রেওয়াজ…’
‘সন্ধ্যায়ই আরও সুন্দর লাগে। আমারও বিয়ে হয়েছিল সন্ধ্যায়’, বলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কর্মনস্কায়া। তাঁর মনে পড়ল সে দিনটায় কি মধুর দেখিয়েছিল তাঁকে, স্বামী ছিল কি হাস্যকর রকমের প্রেমোন্মাদ আর এখন সবই কি অন্যরকম।
‘লোকে বলে, দশ বারের বেশি যে শাফের হয়, তার বিয়ে হয় না। আত্মরক্ষার জন্য আমি দশম বার শাফের হব ভাবছিলাম, কিন্তু বেদখল হয়ে গেছে আমার জায়গাটা’, সুন্দরী প্রিন্সেস চার্স্কায়াকে বলছিলেন কাউন্ট সিনিয়াভিন। তাঁর ওপর সুন্দরীর নজর ছিল।
চার্কায়া জবাবে শুধু হাসলেন। কিটিকে দেখছিলেন তিনি আর ভাবছিলেন কবে আর কিভাবে তিনি কাউন্ট সিনিয়াভিনের সাথে দাঁড়াবেন কিটির অবস্থায় এবং কেমন করে তিনি ওঁকে মনে করিয়ে দেবেন আজকের এই রসিকতার কথাটা।
বর্ষীয়সী রানী-সহচরী নিকোলায়েভাকে শ্যেরবাৎস্কি বলছিলেন যে তিনি কিটির কুন্তলের ওপর মুকুট তুলে ধরবেন বলে ঠিক করেছেন যাতে সে সুখী হয়।
‘পরচুলা পরতে হত না’, বললেন নিকোলায়েভা। অনেক আগেই তিনি স্থির করে রেখেছেন, যে বৃদ্ধ বিপত্নীকটির জন্য তিনি টোপ ফেলছেন, তার সাথে বিয়ে হলে সেটা হবে নিতান্ত সাদামাটা, ‘এসব রঙচঙ আমার ভালো লাগে না। ‘ দারিয়া দমিত্রিয়েভনাকে কজ্নিশেভ রসিকতা করে বোঝাচ্ছিলেন যে বিয়ের পরই চলে যাওয়ার রেওয়াজটা ছড়াচ্ছে কারণ নববিবাহিতরা সব সময়ই খানিকটা লজ্জা পায়।
‘আপনার ভাইয়ের গর্ব হওয়ার কথা। আশ্চর্য মিষ্টি মেয়ে কিটি। মনে হয় আপনার ঈর্ষা হচ্ছে, তাই না?’
‘আমি ওটা কাটিয়ে উঠেছি দারিয়া দ্মিত্রিয়েভনা’, জবাব দিলেন তিনি আর মুখখানা তাঁর হঠাৎ হয়ে উঠল বিমর্ষ, গুরুগম্ভীর
অব্লোন্স্কি শ্যালিকাকে বলছিলেন বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে তাঁর কৌতুকের কথা।
‘ফুলের মুকুটটা ঠিক করে দিতে হয়’, ওঁর কথা না শুনে জবাব দিলেন শ্যালিকা।
‘ওর চেহারাটা এত খারাপ হয়ে গেছে, কি দুঃখের কথা’, লজ্জাকে বলছিলেন কাউন্টেস নস্টন, ‘যাই বলুন, 3 কিটির কড়ে আঙুলেরও যোগ্য নয়। তাই না?’
‘তা কেন, ওকে আমার খুবই ভালো লাগে। আর সেটা আমার ভাবী জামাতা বলে নয়’, জবাব দিলেন লভা, ‘আর কি সুন্দর চালিয়ে যাচ্ছে! এ অবস্থায় অমন থাকতে পারা—হাস্যকর না দেখানো সহজ নয়। ওকে কিন্তু হাস্যকরও লাগছে না, কাঠখোট্টাও নয়। বোঝা যায় যে বিচলিত।’
‘মনে হচ্ছে আপনি এটা চাইছিলেন?’
‘প্রায়। কিটি বরাবরই ভালোবেসেছে ওকে।’
‘তা বেশ, দেখা যাক ওদের মধ্যে কে আগে দাঁড়াবে গালিচায়; আমি কিটিকে বলে রেখেছি।’
‘ওতে কিছু এসে যায় না’, উত্তর দিলেন লভা, ‘আমরা সব সময়ই বাধ্য স্ত্রী। ওটা আমাদের ধাত।’
‘আর আমি ইচ্ছে করেই ভাসিলির আগে গিয়ে দাঁড়াই আর আপনি, ডল্লি ‘
