‘আ-শী-র্বাদ করো হে প্র-ভু!’ একের পর এক বায়ুতরঙ্গ তুলে ধীরে ধীরে উঠতে লাগল সুগম্ভীর ধ্বনি। ‘আমাদের প্রভু চিরকাল, এক্ষণে এবং আগামীতে, চিরযুগ ধরিয়া পুণ্যময়’, নম্র সুরেলা গলায় জবাব দিয়ে যাজক গ্রন্থপীঠে কি যেন ঠিকঠাক করা চালিয়ে যেতে থাকলেন। তারপর জানালা থেকে গম্বুজ পর্যন্ত গোটা গির্জা গমগম করে কখনো উদাত্তে, কখনো মুহূর্তের জন্য থেমে, আস্তে আস্তে স্তব্ধ হয়ে গিয়ে উঠতে লাগল অদৃশ্য ঐকতান দলের পরিপূর্ণ, উদার, সুরম্য সুরসঙ্গতি।
বরাবরের মত প্রার্থনা করা হল স্বর্গীয় শান্তি আর ত্রাণ, সিনোদ আর জারের জন্য; আজ যারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে সৃষ্টিকর্তার দাস সেই কনস্তান্তিন ও ইয়েকাতেরিনার জন্যও প্রার্থনা করা হল।
‘ওদের ওপর পরম প্রেম, শান্তি, সাহায্য বর্ষণের জন্য প্রার্থনা করি প্রভুর কাছে’, সারা গির্জা যেন শ্বসিত হয়ে উঠল প্রধান ডিকনের কণ্ঠস্বরে।
লেভিন কথাগুলো শুনলেন এবং তাতে অভিভূত হলেন। তিনি নিজের সাম্প্রতিক সমস্ত আতংক ও সন্দেহের কথা স্মরণ করে ভাবলেন, ‘সাহায্য, ঠিক সাহায্যই যে দরকার সেটা ওঁরা অনুমান করলেন কেমন করে? কি আমি জানি? এই ভয়ংকর ব্যাপারটায়’, মনে হল তাঁর, ‘কি আমি করতে পারি সাহায্য ছাড়া? ঠিক সাহায্যই আমার এখন দরকার।’
ডিকন যখন তাঁর প্রার্থনা শেষ করলেন, যাজক তখন বিবাহকৃত্যের গ্রন্থটি নিলেন : বিনীত সুরেলা বাক্যে তিনি পড়তে লাগলেন, ‘অনন্ত ঈশ্বর, যাহারা পৃথক রহিয়াছিল, তাহাদিগে প্রেমের অটুট মিলনে মিলিত ও আবদ্ধকারী : আইজাক ও রেবেকা, তাহাদিগের বংশধরদিগের বরাভয়দাতা এক্ষণে তোমার দাস এই কনস্তান্তিন ও ইয়েকাতেরিনাকে আশীর্বাদ করহ, উহাদিগে সমুদয় কল্যাণের পথে চালিত করহ। করুণাময় তুমি, মানবদরদী সৃষ্টিকর্তা, তোমার পিতা ও পুত্রের জয়গান করিতেছি, এবং পবিত্র প্রেতের, এক্ষণে এবং আগামীতে, চিরযুগ ধরিয়া।’—’তথাস্তু!’ আবার বাতাসে ঝরে পড়ল অদৃশ্য ঐকতান।
‘যাহারা পৃথক রহিয়াছিল, তাহাদিগে প্রেমের অটুট মিলনে মিলিত ও আবদ্ধকারী –কি গভীর এই কথাগুলি এবং মনের এখন যা অনুভূতি, তার সাথে কি-রকম মিলে যায়’, ভাবলেন লেভিন, ‘ও-ও কি ভাবছে আমার মতই?’
ওর দিকে চাইতেই দৃষ্টিবিনিময় হল ওঁদের।
আর সে দৃষ্টির ব্যঞ্জনা থেকে তিনি স্থির করলেন সেও তাঁরই মত ভাবছে। কিন্তু সেটা ঠিক নয়; বিবাহানুষ্ঠানের সময় যেসব গুরুগম্ভীর বাক্য উচ্চারিত হয়েছিল সেগুলি হৃদয়ঙ্গম হয়নি কিটির, এমন কি কানেও যায়নি। কথাগুলো শোনা আর তার অর্থ উপলব্ধি করা সম্ভব ছিল না তার পক্ষে : যে একটা অনুভূতি তার বুক ভরে তুলে ক্রমাগত বেড়ে উঠছিল, সেটা ছিল খুবই প্রবল। দেড় মাস আগে তার প্রাণের মধ্যে যা ঘটে গেছে আর এই ছয় সপ্তাহ ধরে তাকে পুলকিত করেছেন, কষ্ট দিয়েছে, অনুভূতিটা হল তার পূর্ণতাপ্রাপ্তির আনন্দ। তাদের আরবাৎ রাস্তার বাড়িতে কিটি যেদিন তার বাদামি পোশাকে লেভিনের কাছে গিয়ে আত্মনিবেদন করেছিল, সেই দিন ও সেই সময়টা থেকে আগেকার গোটা জীবনের সাথে একটা পরিপূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটে গিয়েছিল তার প্রাণের মধ্যে, শুরু হয় একেবারেই নতুন, তার কাছে একেবারেই অপরিজ্ঞাত অন্য একটা জীবন, যদিও আসলে পুরানো জীৱনই চলছিল। এই ছয় সপ্তাহ তার কাছে ছিল অতি সুখাবেশ, অতি যন্ত্রণার এক কাল। তার সমস্ত জীবন, সমস্ত কামনা, আশা কেন্দ্রীভূত হয়েছিল তার কাছে তখনো দুয়ে এই মানুষটাকে ঘিরে যার সাথে সে জড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কখনো ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে, ওদিকে দিন কেটে যেতে লাগল পুরানো জীবনের পরিস্থিতিতেই। পুরানো জীবন কাটাতে কাটাতে তার সমস্ত অতীত—বস্তু, অভ্যাস, যারা তাকে ভালোবাসতো আর ভালোবাসে, এমন সমস্ত লোক, এই উদাসীনতায় মায়ের দুঃখ, তার স্নেহশীল সুকোমল পিতা, আগে যাকে সে ভালোবাসতো দুনিয়ায় সবার চেয়ে বেশি—এই গোটা অতীতের প্রতি তার পরিপূর্ণ অপরাজেয় একটা ঔদাসীন্যে ভয় হত তার। কখনো তার ভয় হত এই ঔদাসীন্যে নিয়ে এসেছে। এই মানুষটার সাথে জীবন বাদ নিয়ে কিছু ভাবা, কিছু চাওয়া সম্ভব ছিল না তার পক্ষে; কিন্তু সে জীবন তখনো শুরু হয়নি, সেটা এমন কি পরিষ্কার করে কল্পনা করতেও পারছিল না কিটি। ছিল শুধু একটাই প্রত্যাশা : যা নতুন ও অজানা তার ভীতি ও আনন্দ। এখন সেই প্রত্যাশা, সেই অজানাটা, আগের জীবন পরিত্যাগের জন্য খেদ—সব কিছুর অবসান হয়ে নতুনের শুরু হল বলে। অজ্ঞেয়তার জন্য এই নতুনটা ভয়াবহ না হয়ে পারে না; তবে ভয়াবহ হোক বা না হোক, সেটা তার অন্তরের মধ্যে ঘটে গেছে ছয় সপ্তাহ আগে; বহু আগে যা ঘটেছে তার প্রাণের মধ্যে, এখন কেবল মন্ত্রপূত করা হচ্ছে তাকে।
আবার গ্রন্থপীঠের দিকে ফিরে অতি কষ্টে যাজক কিটির ছোট্ট আংটিখানা তুলে নিলেন এবং লেভিনের হাত চেয়ে নিয়ে তা পরালেন আঙুলের প্রথম গিঁটে। ‘সৃষ্টিকর্তার দাস কনস্তান্তিন সৃষ্টিকর্তার দাসী ইয়েকাতেরিনার দারপরিগ্রহ করছেন।’ আর বড় আংটিটা নিয়ে কিটির ছোট, গোলাপি, দুর্বলতায় করুণ আঙুলে পরিয়ে দিয়ে বললেন একই কথা। কি করতে হবে, বর-কনে সেটা অনুমান করার চেষ্টা করলে, আর প্রতিবারই ভুল হল তাদের, যাজক ফিসফিসিয়ে তাদের শুধরে দিলেন। অবশেষে যা করার ছিল করে আংটি দিয়ে তাদের ক্রস করে যাজক আবার কিটিকে দিলেন বড় আংটিটা, লেভিনকে ছোট; আবার গোলমাল হয়ে গেল ওদের, দু’বার হাতবদল হল আংটি দুটোর; তাহলেও যা দরকার ছিল, সেটা হল না।
