‘আমার ভাবনাই হয়েছিল তুমি বুঝি পালাতে চাইছিলে’, লেভিনের দিকে চেয়ে কিটি বলল হেসে।
‘এমন হাঁদার মত কাণ্ড ঘটল যে বলতেও লজ্জা হয়’, লেভিন বললেন লাল হয়ে এবং তাঁর দিকে এগিয়ে আসা কজ্নিশেভের দিকে ফিরতে হল তাঁকে।
তিনি মাথা নেড়ে হেসে বললেন, ‘মন্দ নয় শার্ট নিয়ে তোর ঝামেলাটা!’
‘হ্যাঁ, সত্যি’, লেভিন বললেন কি কথা তাঁকে বলা হচ্ছে সেটা না বুঝেই।
‘তা কস্তিয়া, এবার একটা সিদ্ধান্ত নিতে হয়’, কপট ত্রাসের ভাব করে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘গুরুতর প্রশ্ন। ঠিক এখনই এর সমস্ত গুরুত্বটা বোঝার মত অবস্থায় আছ তুমি। আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, জ্বালানো মোমবাতি জ্বালানো হবে, নাকি না-জ্বালানো? দশ রুবলের পার্থক্য’, ঠোঁট দু’খানা হাসিতে আকুঞ্চিত করে যোগ দিলেন তিনি, ‘আমি স্থির করে ফেলেছি, তবে ভয় আছে হয় তো তোমার মত পাওয়া যাবে না।’
লেভিন বুঝলেন ওটা ঠাট্টা, কিন্তু হাসতে পারলেন না।
‘তাহলে কি? জ্বালানো, নাকি না-জ্বালানো।’
‘না-জ্বালানো, না-জ্বালানো।’
‘ভারি আনন্দ হল। কথা পাকা হয়ে গেল তাহলে!’ হেসে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘কিন্তু এ অবস্থায় কি রকম বোকা মেয়ে যায় লোকে’, লেভিন যখন বিহ্বল দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে সরে গেলেন কনের কাছে, তখন বিহ্বল দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে সরে গেলেন কনের কাছে, তখন চিরিকভকে বললেন অব্লোন্স্কি।
‘দেখিস কিটি, গালিচায় দাঁড়াবি প্রথম’, কাছে এসে বললেন কাউন্টেস নডর্স্টন, তারপর লেভিনের উদ্দেশে, ‘আরে, অবশেষে!’
‘কি ভয় করছে না?’ জিজ্ঞেস করলেন বৃদ্ধা ফুফু মারিয়া দমিত্রিয়েভনা।
‘তোর শীত করছে কি? ফ্যাকাশে লাগছে তোকে। দাঁড়াবে, মাথা নোওয়া’, বললেন কিটির বড় বোন লভা, নিজের গোলালো হাত বেড়ে দিয়ে হেসে কিটির মাথার ফুলগুলো ঠিক করে দিলেন তিনি।
ডল্লি এলেন, কি-একটা বলতে চাইছিলেন যেন, কিন্তু মুখ ফুটে তা আর বলতে পারলেন না, কেঁদে ফেললেন, তারপর হাসলেন অস্বাভাবিক একটা হাসি।
কিটি সবার দিকে চাইছিল লেভিনের মতই একটা আত্মবিস্মৃত দৃষ্টিতে। তাকে যা কিছু বলা হচ্ছিল, উত্তর দিতে পারছিল কেবল সুখের একটা অকৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে
ওদিকে গির্জার সেবকেরা তাঁদের আলখাল্লা পরে নিলেন, যাজক আর ডিকন গেলেন গির্জার পেছন দিকে অবস্থিত গ্রন্থপীঠের দিকে। লেভিনকে কি যেন বললেন যাজক, কিন্তু সেটা লেভিনের কানে গেল না।
শাফের বুঝিয়ে দিলেন, ‘কনের হাত ধরে নিয়ে যান।’
অনেকক্ষণ লেভিন ধরতে পারছিলেন না কি চাওয়া হচ্ছে তাঁর কাছে। অনেকক্ষণ ধরে লোকে ঠিক করে দিচ্ছিল তাঁকে। সব আশা তারা প্রায় ছেড়েই দিতে বসেছিল, কেননা যা উচিত সে হাতটা তিনি বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন না, যা উচিত ধরছিলেন না সে হাতটাও। অবশেষে তিনি বুঝলেন যে জায়গা বদল না করে তাঁর ডান হাত দিয়ে ধরতে হবে কনের ডান বাহু। অবশেষে যেমনটা উচিত সেভাবে যখন বাহুলগ্না করলেন কনেকে, যাজক কয়েক পা সামনে এসে থামলেন গ্রন্থপীঠের কাছে। আত্মীয় ও পরিচিতদের ভিড়টা গুঞ্জন করে পোশাকের কলাপ খসখসিয়ে এগিয়ে গেল তাঁদের দিকে। কে একজন নুয়ে ঠিক করে দিলে কনের কলাপ। গির্জা এত চুপচাপ হয়ে গেল যে মোম গলে পড়ার শব্দটা পর্যন্ত শোনা যাচ্ছিল।
বৃদ্ধ যাজকের মাথায় উঁচু শিরোভূষণ, ঝক্ঝকে সাদা চুল দু’পাশে কানের পেছনে গোটানো। পিঠে এম্ব্রয়ডারি করা সোনালি ক্রস দেওয়া ভারি রূপালি জরির আলখাল্লাটা থেকে তিনি ছোট ছোট বুড়োটে হাত বার করে গ্রন্থপীঠে কি যেন ঠিকঠাক করে নিলেন।
অব্লোন্স্কি সন্তর্পণে তাঁর কাছে কি যেন বললেন ফিসফিস করে তারপর লেভিনের দিকে চোখ মটকে আবার ফিরে এলেন তাঁর জায়গায়।
যাজক পুষ্পালংকৃত দুটো বাতি জ্বালিয়ে বাঁ হাতে তা ধরে রাখলেন কাত করে যাতে তা থেকে মোমের ফোঁটা গড়ায় ধীরে ধীরে, তারপর মুখ ফেরালেন বর-কনের দিকে। ইনি সেই যাজকই যাঁর কাছে পাপস্বীকার করেছিলেন লেভিন। ক্লান্ত বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তিনি বর-কনের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, আলখাল্লার তল থেকে ডান হাত বার করে আশীর্বাদ করলেন বরকে, তারপর একইভাবে, কিন্তু কিছুটা সাবধানী একটা কোমলতা নিয়ে তাঁর গিঁটগিট আঙুল রাখলেন কিটির অবনত মাথার ওপরে। ওঁদের বাতি দুটো দিয়ে ধূপ নিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেলেন তিনি।
‘এ সব কি সত্যি?’ লেভিন ভাবলেন, তাকালেন কনের দিকে। খানিকটা উঁচু থেকে তিনি দেখছিলেন কিটির মুখাবয়ব, তার ঠোঁট আর আখিপল্লবের চাঞ্চল্য থেকে বুঝতে পারছিলেন যে তাঁর দৃষ্টিপাত সে অনুভব করছে। কিটি মুখ তুলে চাইল না, কিন্তু তার কুঁচি দেওয়া খাড়া কলার কেঁপে কেঁপে উঁচু হয়ে ঠেকল তার ছোট্ট গোলাপি কানে। লেভিন দেখলেন যে একটা নিঃশ্বাস অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল তার বুকে, মোমবাতি ধরা লম্বা দস্তানা পরা ছোট্ট হাতখানা কাঁপছে।
শার্ট নিয়ে গোটা ঝামেলাটা, বিলম্ব, পরিচিতদের, আত্মীয়দের সাথে কথাবার্তা, তাঁদের অসন্তোষ, নিজের হাস্যকর অবস্থা—সব হঠাৎ মিলিয়ে গেল, একাধারে ভয় আর আনন্দ হল তাঁর।
দু’পাশে চাঁচর চিকুর নিয়ে রুপালি আলখাল্লা পরা সুকুমার দীর্ঘাঙ্গ প্রধান ডিকন অভ্যস্ত ভঙ্গিতে দুই আঙুলে উত্তরীয় সামান্য তুলে ক্ষিপ্রবেগে গিয়ে থামলেন পুরোহিতের সামনে।
