বিলম্বটায় কোন গুরুত্ব না দিয়ে প্রথমে ভাবা হয়েছিল বর-কনে এই এল বলে। পরে শুরু হল ঘন ঘন দরজার দিকে চাওয়া, বলাবলি করলে কোন অঘটন ঘটল না তো। পরে বিলম্বটা হয়ে উঠল অস্বস্তিকর, আত্মীয়-স্বজন আর আমন্ত্রিতরা ভাব করার চেষ্টা করলে যেন তারা বরের কথা ভাবছে না, নিজেদের কথাবার্তাতেই তারা মশগুল।
প্রধান ডিকন তাঁর সময়ের মূল্য স্মরণ করিয়ে দেবার জন্যই যেন এমন অধৈর্যে কাশলেন যে জানালার শার্সি কেঁপে উঠল। কয়ের-লফ্ট থেকে শোনা যাচ্ছিল কখনো বেজার গায়কদের গলা সাধা, কখনো নাক ঝাড়া। যাজক অনবরত কখনো ডিকন, কখনো কোন স্তোত্রপাঠককে পাঠাচ্ছিলেন দেখতে বর এল কি না। আর নিজে নকশি বেল্টে আঁটা বেগুনি আলখাল্লায় ঘন ঘন যাচ্ছিলেন পাশের দরজায়, দেখছিলেন বর এল কি না। শেষ পর্যন্ত আমন্ত্রিত জনৈক মহিলা ঘড়ি দেখে বলে উঠলেন, ‘সত্যি, ভারি অদ্ভুত!’ এবং সমস্ত অতিথিরই তখন ভারি অস্বস্তি বোধ হতে লাগল, সরবে প্রকাশ করতে থাকলেন তাঁদের বিস্ময় অথবা বিরক্তি। কি ঘটেছে জানার জন্য বেরিয়ে গেলেন একজন শাফের। কিটি এ সময় তার সাদা গাউন, ফুল-তোলা দীর্ঘ অবগুণ্ঠনে তৈরি হয়ে মায়ের বদলি আর বড়দি লজ্জার সাথে বসেছিল শ্যেরবাৎস্কি ভবনের হলঘরে, আধঘণ্টা ধরে জানালা দিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল, বর গির্জায় পৌঁছেছে এ খবর আশা করছিল তার শাফেরের কাছ থেকে।
লেভিন ওদিকে ওয়েস্ট-কোট আর ফ্রক-কোট ছাড়া শুধু প্যান্টালুন পরে নিজের কামরায় ছটফট করে বেড়াচ্ছিলেন, অবিরাম দরজা খুলে দেখছিলেন করিডরে। কিন্তু যে ব্যক্তির তিনি আশা করছিলেন করিডরে তাকে দেখা যাচ্ছিল না। হতাশায় ফিরে এসে, হাত ঝাঁকিয়ে নিশ্চিন্তে ধূমপানরত অব্লোন্স্কিকে তিনি বলছিলেন : ‘এমন ভয়ংকর আহাম্মকি অবস্থায় কেউ পড়েছে কখনো?’
‘হ্যাঁ, বিদঘুটে’, নরম করে আনার হাসি হেসে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘তবে শান্ত হও, এখুনি আনবে।’
‘কিন্তু শান্ত হব কি করে!’ সংযত তিতিবিরক্তিতে বললেন লেভিন। ‘এই জাহান্নামী ওয়েস্ট-কোট! সামনেটা খোলা, পরা অসম্ভব!’ বললেন তিনি তাঁর দলামোচড়া কামিজের দিকে তাকিয়ে। ‘আমার জিনিসপত্র যদি এর মধ্যেই স্টেশনে পাঠিয়ে দিয়ে থাকে, তাহলে!’ হতাশায় চিৎকার করে উঠলেন তিনি।
‘তাহলে আমার শার্টটা পরবে।’
‘অনেক আগেই তা পরা উচিত ছিল।’
‘হাস্যাস্পদ হয়ে লাভ নেই… দাঁড়াও, দাঁড়াও, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
ব্যাপারটা হয়েছিল এই যে লেভিন যখন পোশাক দিতে বলেন, পুরাতন ভৃত্য কুজ্মা তখন ফ্রক-কোট, ওয়েস্ট- কোট এবং প্রয়োজনীয় সব কিছুই এনেছিল।
‘কিন্তু কামিজ?’ চেঁচিয়ে উঠেছিলেন লেভিন। ‘কামিজ তো আপনার পরনেই’, শান্ত হেসে বলেছিল কুজ্মা। পরিষ্কার একটা কামিজ রাখার খেয়াল হয়নি কুমার। সব জিনিসপত্র বাঁধাছাদা করে শ্যেরবাৎস্কিদের পৌঁছে দিতে হবে, যেখানে থেকে সেই সন্ধ্যাতেই নবদম্পতি রওনা দেবে—এই আদেশ পেয়ে কুজ্মা ঠিক তাই করেছে। সে লেভিনের ড্রেস-স্যুটটা ছাড়া সবই বাক্সবন্দী করে নিয়ে গেছে। সকাল থেকে লেভিন যে শার্টটা পরে ছিলেন, সেটা দলামোচড়া হয়ে গিয়েছিল, ফ্যাশনদুরস্ত খোলা ওয়েস্ট-কোটের সাথে তা একেবারেই মানায় না। শ্যেরবাৎস্কিদের বাড়ি বহু দূরে, লোক পাঠিয়ে ফল হবে না। নতুন একটা শার্ট কেনার জন্য পাঠানো হল খানসামাকে। সে ফিরে এসে বলল সব দোকান বন্ধ, রবিবার। লোক পাঠানো হল অব্লোন্স্কির ওখানে শার্ট আনার জন্য : দেখা গেল সেটা অসম্ভব চওড়া আর খাটো। শেষ পর্যন্ত শ্যেরবাৎস্কিদের ওখানে লোক পাঠিয়ে মাল খুলতে বলা হল। গির্জায় বরের অপেক্ষা করছে লোকে আর লেভিন এদিকে খাঁচায় বন্ধ পশুর মত ছটফট করছেন ঘরটায়, তাকাচ্ছেন করিডরে, আতংকে আর হতাশায় তাঁর মনে পড়ছিল কি কথা আছে তিনি বলেছেন কিটিকে, এরপর কি ভাববে সে।
অবশেষ অপরাধী কুজ্মা প্রচণ্ড হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকল শার্ট নিয়ে।
‘কোনরকমে ধরলাম। গাড়িতে মাল চাপানো শুরু হয়ে গিয়েছিল’, কুজ্মা বলল।
তিন মিনিট বাদে পোড়া ঘায়ে লবণের ছিটে এড়াবার জন্য ঘড়ির দিকে দৃপাত না করেই লেভিন ছুটলেন করিডোর দিয়ে।
লেভিনের পিছু পিছু বিনা ব্যস্ততায় তাঁর সঙ্গ ধরে অব্লোন্স্কি হেসে বললেন, ‘ওতে কোন লাভ হবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে… বলছি তোমাকে, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
চার
‘এসে গেছে!…’ ‘ওই যে!…’ ‘কোন লোকটি?…’ ‘অল্পবয়সীটি কি?…’ ‘আর কনে, মা গো, একেবারে জীবনমৃত!’ দেউড়িতে কনেকে সাথে নিয়ে লেভিন যখন গির্জায় ঢুকলেন, ভিড়ের মধ্যে তখন এসব কথা।
স্ত্রীকে বিলম্বের কারণ জানালেন অব্লোন্স্কি। অতিথিরা হেসে ফিসফাস করতে লাগলেন নিজেদের মধ্যে। কিছুই এবং কাউকেও দেখছিলেন না লেভিন; তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল তাঁর কনের উপর।
সবাই বলেছিল যে এই কয়েক দিনে কিটির চেহারা খারাপ হয়ে গেছে, আগে তাকে যেমন সুন্দর দেখাতো, বিবাহানুষ্ঠানে তেমনটি আর নেই, কিন্তু লেভিনের তা মনে হচ্ছিল না। তার উঁচু কবরী, আলুলায়িত সাদা অবগুণ্ঠন, সাদা ফুল, কুঁচি দেওয়া খাড়া কলার যা তার দীর্ঘ গ্রীবাকে ঘিরে বিশেষ একটা শূচিতায় ঢেকে রেখেছে দু’দিক থেকে, খোলা শুধু সামনের দিকটা, আশ্চর্য সুতনু তার কটির দিকে চেয়ে দেখলেন লেভিন আর তাঁর মনে হল এত সুন্দর কিটিকে তিনি আর কখনো দেখেননি। সেটা এই জন্য নয় যে ঐ ফুলগুলো, ঐ অবগুণ্ঠন; প্যারিস থেকে আনানো এই গাউনটা তার রূপ বুঝি বাড়িয়ে তুলেছে কিছু, না, সেটা এই জন্য যে সাজের এই ঘটা সত্ত্বেও তার সুমধুর মুখভাব, তার দৃষ্টি, তার অধরে ছিল অপাপবিদ্ধ সততার সেই একই লাবণ্য।
