‘হ্যাঁ, যদি তুমি আমাকে না ভালোবাসো।’
‘মাথা খারাপ হয়েছে তোমার!’ সরোষে লাল হয়ে চেঁচিয়ে উঠল কিটি।
কিন্তু লেভিনের মুখখানা এত করুণ যে রোষ সংবরণ করলে সে, একটা চেয়ার থেকে ফ্রক ছুড়ে বসল ওঁর কাছাকাছি।
‘কি তুমি ভাবছ? বলো তো সব।’
‘ভাবছি যে আমাকে তুমি ভালোবাসতে পারো না। কিসের জন্য ভালোবাসবে আমাকে?’
‘উহ্ সৃষ্টিকর্তা! কি আমি করতে পারি?’ এই বলে কেঁদে ফেলল সে।
‘এহ্, কি আমি করলাম!’ চেঁচিয়ে উঠলেন লেভিন, কিটির সামনে নতজানু হয়ে চুমু খেতে লাগলেন তার হাতে।
পাঁচ মিনিট বাদে প্রিন্স-মহিষী যখন ঘরে ঢুকলেন, ওঁদের তখন মিটমাট হয়ে গেছে একেবারে। কিটি লেভিনকে নিঃসন্দেহ করে তোলে যে তাঁকে সে ভালোবাসে, এমন কি কেন সে ভালোবাসে তাঁর এ প্রশ্নেরও জবাব দেয়। কিটি তাঁকে বলে যে ভালোবাসে, কারণ তাঁর সবখানি সে বোঝে, কারণ সে জানে কি কি লেভিন ভালোবাসেন, কারণ উনি যা ভালোবাসেন তা সবই ভালো। এটা লেভিনের কাছে পানির মত পরিষ্কার লাগল। প্রিন্স-মহিষী যখন ঘরে ঢুকলেন, ওঁরা সিন্দুকের ওপর পাশাপাশি বসে পোশাক বাছছিলেন আর তর্ক করছিলেন : লেভিন যখন পাণিপ্রার্থনা করেন, তখন কিটির পরনে যে বাদামি গাউনটা ছিল, কিটি সেটা দিতে চাইছিল দুনিয়াশাকে আর লেভিন জেদ ধরেছিলেন যে ওটা কাউকে দেওয়া চলবে না, দুনিয়াশাকে দেওয়া হোক নীল রঙেরটা।
‘কেন তুমি বোঝো না? ওর চুল যে গাঢ় রঙের। এটা ওকে মানাবে না… সব ভেবে ঠিক করা আছে আমার! লেভিন কেন এসেছিলেন সেটা জানতে পেরে প্রিন্স-মহিষী আধা ঠাট্টায়, আধা গুরুত্ব দিয়ে রেগে তাঁকে বেশভূষা করার জন্য ফেরত পাঠালেন হোটেলে, কিটির কবরী বন্ধনে তিনি যেন ব্যাঘাত না ঘটান, কারণ শার্ল এই এসে পড়ল বলে।
‘এমনিতেই ও কয়েক দিন ধরে ভালো করে খাচ্ছে না, চেহারা খারাপ হয়ে গেছে, আর তুমি এসেছ কিনা তোমার যত পাগলামিতে ওর মন খারাপ করে দিতে’, লেভিনকে বললেন তিনি, ‘ভাগো তো, ভাগো তো বাছা।’
দোষ আর লজ্জার একটা বোধ থাকলেও স্বস্তি নিয়ে লেভিন তাঁর হোটেলে ফিরলেন। তাঁর বড় ভাই কজ্নিশেভ, দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা আর অব্লোন্স্কি, সবাই পরিপাটী সাজসজ্জা করে তাঁর অপেক্ষা করছিলেন দেবপট নিয়ে তাঁকে আশীর্বাদ করবেন বলে। হচ্ছে হবে করার সময় ছিল না। দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনাকে আবার বাড়ি যেতে হবে পমেড-চর্চিত চিকুরকুঞ্চিত ছেলেটিকে আনতে, কনের সাথে দেবপট নিয়ে যাবে সে। তারপর একটি গাড়ি পাঠাতে হবে শাফেরের ( শাফের গির্জায় বিবাহানুষ্ঠানে বর-কনের পেছনে যে মুকুট ধরে থাকে) জন্য, তারপর আরেকটি কজ্নিশেভকে যা নিয়ে যাবে, সেটিকে ফেরত আনতে হবে। মোটের ওপর, খুবই জটিল সব ভাবনা-চিন্তা ছিল অনেক। শুধু একটা ব্যাপার সন্দেহাতীত যে ঢিমে-তেতালা করা চলবে না, কেননা সাড়ে ছ’টা বেজে গেছে।
দেবপট নিয়ে আশীর্বাদটা থেকে দাঁড়াল না কিছুই। অব্লোন্স্কি স্ত্রীর পাশে একটা হাস্যকর-গুরুগম্ভীর ভাব করে দাঁড়ালেন, দেবপট হাতে নিয়ে লেভিনকে বললেন আভূমি নত হতে, তারপর একটা সহৃদয় ও সকৌতুক হাসি নিয়ে আশীর্বাদ করে লেভিনকে চুম্বন করলেন তিনবার; দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনাও তাই করলেন এবং তখনই ব্যস্ত হলেন যাবার জন্য আর পুনরায় গাড়িগুলোর গতিবিধির হিসাবে তালগোল পাকালেন।
‘তাহলে আমরা এই করব : আমাদের গাড়িটায় করে তুমি চলে যাও ওর জন্য, আর কজ্নিশেভও যদি দয়া করে আমাদের নিয়ে যেতে পারতেন, তারপর গাড়ি ফেরত পাঠিও।’
‘সে কি, সানন্দে যাব।’
অব্লোন্স্কি জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি এখনই ওকে নিয়ে আসছি, জিনিসপত্র পাঠানো হয়েছে?’
‘পাঠানো হয়েছে’, বলে লেভিন পোশাক দিতে হুকুম করলেন কুজ্মাকে।
তিন
বিয়ের জন্য গির্জা ঘিরে জুটেছিল একদল লোক, বেশির ভাগই নারী। যারা ভেতরে ঢোকার সুযোগ পায়নি, তারা ভিড় করেছিল জানালার কাছে, ঠেলাঠেলি করছিল, ঝগড়া বাঁধাচ্ছিল, উঁকি দিচ্ছিল জানালার গরাদে দিয়ে।
ইতিমধ্যে বিশটির বেশি গাড়িকে সেপাইরা রাস্তা বরাবর সারি বাঁধিয়ে রেখেছে। হিমেল আবহাওয়া উপেক্ষা করে প্রবেশমুখে দাঁড়িয়ে নিজের উর্দিতে ঝলমল করছিল জনৈক পুলিশ অফিসার। অবিরাম আসছিল আরও গাড়ি, ফুলে শোভিত মহিলারা কখনো তাঁদের বসনের কলাপ তুলে ধরে, কখনো পুরুষেরা তাঁদের খাটো টুপি অথবা লম্বা কালো হ্যাট খুলে ঢুকছিলেন গির্জার ভেতর। গির্জার ভেতরে ইতিমধ্যেই জ্বালানো হয়েছে দুটো ঝাড়লণ্ঠন আর দেবপটগুলোর সামনেকার সমস্ত বাতি। পটপ্রাচীরের রক্তিম গাত্রে স্বর্ণাভা, দেবপটগুলির গিল্টি-করা খোদাই-কাজ, কান্ডেলাব্রাস আর মোমবাতিদানগুলির রুপো, মেঝের টালি আর গালিচাগুলি, কয়ের-লটের ওপরে পবিত্র নিশানগুলি, বেদীর সোপান, কালো হয়ে আসা প্রাচীন নিত্যকর্মপদ্ধতির পুস্তকগুলি, আলখাল্লা আর জমকালো কৌশিক—সবই আলোয় প্লাবিত। উষ্ণ গির্জার ডান দিকে, ফ্ৰক-কোট আর সাদা টাই, উর্দি আর জামদানি, মখমল, চিকন রেশম, কেশ, কুসুম, অনাবৃত স্কন্ধ ও বাহু, লম্বা দস্তানার ভিড়টা থেকে উঠছিল সংযত ও সজীব আলাপের কূজন যা একটা বিচিত্র প্রতিধ্বনি তুলছিল উঁচু গম্বুজে। দরজা খোলার ক্যাঁচ শব্দ হতেই প্রতিবার আলাপ থেমে আসছিল, বর-কনেকে আসতে দেখবার আশায় সবাই তাকাচ্ছিল সেদিকে। কিন্তু দরজা ইতিমধ্যে খুলেছে দশ বারেরও বেশি, কিন্তু প্রতিবার ঢুকেছে বিলম্বিত অতিথি যারা যোগ দিয়েছে ডানের আমন্ত্রিতদের কিংবা পুলিশ অফিসারকে ফাঁকি দিয়ে অথবা মিনতি করে কোন দর্শনার্থিনী, যে যোগ দিয়েছে বাঁ দিকের অনাহূতদের দলে। আত্মীয়-স্বজন আর বাইরের লোক, সবারই প্রত্যাশার সব ক’টা পর্যায় কেটে গেল।
