‘অবিবাহিত জীবন থেকে বিদায় নেবার এই রীতিটা গড়ে উঠেছে খামোকা নয়’, বললেন কজ্নিশেভ, যতই সুখী হও, স্বাধীনতা বিসর্জন দুঃখের কথা।’
‘স্বীকার করুন, এরকম একটা জিনিস আছে যে গোগলের বইয়ের বরের মত ইচ্ছে হয় না কি জানালা দিয়ে লাফিয়ে পালাই?’
‘নিশ্চয় আছে, কিন্তু স্বীকার করছে না!’ বলে কাতাভাসোভ হেসে উঠলেন হো-হো করে।
‘তা জানালা তো খোলাই রয়েছে… এখনই যাওয়া যাক ভেতরে! একটা ভল্লুকী, গুহাতেই পাওয়া যাবে। সত্যি, যাওয়া যাক পাঁচটার ট্রেনে! আর এঁরা থাকুন যেমন খুশি’, হেসে বললেন চিরিকভ।
লেভিন হেসে বললেন, ‘কিন্তু হেই সৃষ্টিকর্তা, নিজের স্বাধীনতা নিয়ে প্রাণের ভেতর এরকম দুঃখ যে খুঁজে পাচ্ছি না!’
‘হ্যাঁ, আপনার প্রাণের ভেতর এখন এমনই বিশৃঙ্খলা যে কিছুই খুঁজে পাবেন না’, কাতাভাসোভ বললেন, ‘অপেক্ষা করুন, খানিকটা গুছিয়ে উঠতে পারলে তখন পাবেন!
‘না, আমার এই হৃদয়াবেগ (ভালোবাসা—কথাটা ওঁদের সামনে তিনি বলতে চাইলেন না) আর সুখ ছাড়াও স্বাধীনতা হারানোর জন্য অন্তত খানিকটা দুঃখও যদি বোধ করতে পারতাম… উল্টে, এই স্বাধীনতা হারানোতেই আমার আনন্দ।’
‘খুব খারাপ! কোন আশা নেই’, বললেন কাতাভাসোভ, ‘যাক গে, পান করা যাক ওঁর আরোগ্য লাভের জন্য অথবা শুধু কামনা করা যাক যেন ওঁর স্বপ্নের অন্তত একশতাংশও সফল হয়। সেটুকুই হবে এমন সুখ যা পৃথিবীতে হয় না।’
আহারের পর অতিথিরা তাড়াতাড়ি চলে গেলেন বিবাহোৎসব উপলক্ষে বেশভূষা করে নেবার জন্য।
একলা হয়ে, এই অবিবাহিতদের কথাবার্তা স্মরণ করে লেভিন পুনর্বার জিজ্ঞাসা করলেন নিজেকে : যে স্বাধীনতার কথা ওঁরা বলছিলেন তার জন্য তাঁর প্রাণের ভেতর কোন দুঃখবোধ আছে কি? এ প্রশ্নে হাসলেন তিনি। ‘স্বাধীনতা? কিসের জন্য স্বাধীনতা? সুখ শুধু ভালোবাসায়, তার যা কামনা তাই কামনা করায়, তার যা ভাবনা তাই ভাবায়, অর্থাৎ কোন স্বাধীনতা নয়—এই হল সুখ!’
‘কিন্তু ওর ভাবনা, কামনা, ভাবাবেগ আমি জানি কি?’ হঠাৎ কার যেন কণ্ঠস্বর তাঁকে বলল ফিসফিস করে। মুখের হাসি মিলিয়ে গেল, চিন্তাচ্ছন্ন হয়ে পড়লেন তিনি। সহসা অদ্ভুত একটা অনুভূতি পেয়ে বসল তাঁকে। ভয় আর সন্দেহ হল তাঁর, সব কিছুতে সন্দেহ।
‘আমাকে যদি সে ভালো না বেসে থাকে? আমাকে যদি সে বিয়ে করতে যাচ্ছে শুধু বিয়ে করতে হয় বলে? কি করছে সেটা যদি তার নিজেরই জানা না থাকে?’ নিজেকে প্রশ্ন করলেন তিনি, ‘ওর চৈতন্য হতে পারে কেবল বিয়ে করার পর। বুঝবে যে আমাকে সে ভালোবাসে না, ভালোবাসতে পারে না।’ মনে আসতে লাগল অদ্ভুত, অতি বিশ্ৰী সব চিন্তা। এক বছর আগের মত ভ্রন্স্কির প্রতি কিটির মনোভাবে ঈর্ষা হল, ভ্রন্স্কির সাথে কিটিকে তিনি যে সন্ধ্যায় দেখেছিলেন, সেটা যেন গতকালের ঘটনা। তাঁর সন্দেহ হল কিটি তাঁকে সব কিছু বলেনি।
দ্রুত লাফিয়ে উঠলেন তিনি। হতাশায় মনে মনে বললেন, ‘না, এ চলতে পারে না! যাব ওর কাছে, জিজ্ঞেস করব, শেষবারের মত বলব : আমরা বন্ধনহীন, ক্ষান্ত হওয়াই ভালো হবে নাকি? চিরকাল অসুখী হয়ে থাকা, কলংক, বিশ্বাসহানির চেয়ে সেটাই ভালো!’ বুকের মধ্যে হতাশা আর সমস্ত লোকের ওপর, নিজের ওপর, কিটির ওপর আক্রাশ নিয়ে হোটেল থেকে বেরিয়ে তিনি গেলেন তার কাছে।
বাড়ির পেছনদিককার ঘরে কিটির সাথে তাঁর দেখা হল। সিন্দুকের ওপর বসে চেয়ারের পিঠে আর মেঝেয় রাখা একরাশ নানা রঙের পোশাক বাছাবাছি করে দাসীকে কি যেন হুকুম দিচ্ছিল সে।
‘আরে!’ ওঁকে দেখে আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল কিটি, ‘কেমন করে তুমি, কেমন করে আপনি?’ (এই শেষ দিনটা পর্যন্ত কিটি তাঁকে বলতো কখনো ‘তুমি’, কখনো ‘আপনি’।) ‘আশা করিনি! আর আমি আমার কুমারী দিনগুলোর পোশাক বেছে ঠিক করছি কোটা কাকে দেব…’
‘ও! তা ভালো কথা!’ দাসীর দিকে নিরানন্দ দৃষ্টিতে চেয়ে তিনি বললেন।
কিটি বলল, ‘এখন যাও দুনিয়াশা। আমি ডেকে পাঠাব পরে। কি হল তোমার?’ দাসী চলে যেতেই স্থির সংকল্পে ‘তুমি’ সম্ভোধন করে জিজ্ঞেস করল কিটি। লেভিনের বিচলিত, বিমর্ষ, অদ্ভুত মুখ লক্ষ্য করে ভয় হল তার।
‘কিটি! কষ্ট হচ্ছে আমার। একলা আমি কষ্ট সইতে চাই না’, কিটির সামনাসামনি দাঁড়িয়ে সানুনয় দৃষ্টিতে তার চোখের দিকে হতাশাদীর্ণ কণ্ঠে বলে উঠলেন তিনি। কিটির প্রেমে ঢলঢল সরল মুখখানা দেখে তিনি ইতিমধ্যেই বুঝেছিলেন যে তাকে যা বলবেন ঠিক করেছিলেন তা থেকে কোন ফল হবে না, তাহলেও তাঁর দরকার ছিল যে কিটি নিজেই তাঁকে আশ্বস্ত করুক। ‘আমি বলতে এলাম যে সময় এখনো পেরিয়ে যায়নি। এ সবই ঘুচিয়ে দিয়ে ঠিকঠাক করে নেওয়া যায়।’
‘কি? কিছুই আমি বুঝতে পারছি না। কি হল তোমার?’
‘তোমাকে আমি হাজার বার যা বলেছি এবং না ভেবে পারছি না… যে আমি তোমার যোগ্য নই। আমাকে বিয়ে করতে রাজি হওয়া সম্ভব নয় দেখো। আমাকে ভালোবাসতে তুমি পারো না… যদি তাই… বরং সেটা বলো’, কিটির দিকে না তাকিয়ে বললেন তিনি। ‘আমি অসুখী হব। বলুক সবাই যা খুশি; অসুখী হওয়ার চেয়ে সেটাই ভালো…. এখনো যখন সময় আছে, সেটাই ভালো…’
‘আমি কিছুই বুঝতে পারছি না’, সভয়ে বলল কিটি, ‘মানে তুমি চাইছ ভেঙে দিতে… দরকার নেই?
