লেভিন এবার কিছুই বললেন না—সেটা এজন্য নয় যে যাজকের সাথে তর্কে নামতে চাইছিলেন না তিনি, এজন্য যে এমন প্রশ্ন তাঁকে কেউ আগে করেনি; আর তাঁর শিশু এসব প্রশ্ন করার আগে কি জবাব দেবেন ভাববার মত সময় থাকবে বেশ।
‘আপনি জীবনের এমন একটা পর্বে প্রবেশ করছেন’, যাজক বলে চললেন, ‘যখন পথ স্থির করে নিয়ে সেটা অনুসরণ করে যেতে হয়। সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করুন যেন তিনি তাঁর দয়ায় আপনাকে সাহায্য করেন, ক্ষমা করেন’, উপসংহার টানলেন তিনি, ‘প্রভু এবং আমাদের সৃষ্টিকর্তার যিশু খ্রিস্ট লকের মানবপ্রেমের উদারতায় শিশুকে ক্ষমা করেন…’, অনুমতির প্রার্থনা শেষ করে যাজক লেভিনকে আশীর্বাদ করে তাঁকে ছেড়ে দিলেন।
বাড়ি ফিরে লেভিনের এজন্য আনন্দ হল যে অস্বস্তিকর অবস্থাটার অবসান এবং এমনভাবে অবসান হল যে তাঁকে মিথ্যে বলতে হয়নি। তাছাড়া তাঁর এই একটা ঝাপসা স্মৃতি রয়ে গেল যে সহৃদয় মিষ্টস্বভাব বৃদ্ধটি যা বলছিলেন সেটা প্রথমে তাঁর যা মনে হয়েছিল, মোটেই তেমন নির্বোধ কিছু নয়, তাঁর কথায় এমন কিছু-একটা ছিল যেটা পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত।
লেভিন ভাবলেন, ‘এখনই অবশ্য নয়, তবে পরে কোন-এক সময়।’ আগের চেয়ে বেশি করে লেভিনের এখন মনে হতে লাগল যে তাঁর প্রাণের মধ্যে অস্পষ্ট ও দূষিত কিছু-একটা আছে এবং ধর্মের ব্যাপারে তিনি ঠিক সেই অবস্থায়ই রয়েছেন যা তিনি অন্যের ক্ষেত্রে পরিষ্কার দেখতেন এবং পছন্দ করতেন না, যার জন্য তিরস্কারও করেছেন বন্ধু সি্ভ্য়াজ্স্কিকে।
ভাবী বধূর সাথে লেভিন এ সন্ধ্যাটা কাটান ডল্লির ওখানে, খুবই ফুর্তি লাগছিল তাঁর, অব্লোন্স্কির কাছে তাঁর এই চাঙ্গা অবস্থাটার কারণ বোঝাতে গিয়ে তিনি বললেন যে হুপের মধ্যে দিয়ে লাফিয়ে যেতে শেখানো হচ্ছে যে কুকুরটাকে, তার কাছে কি চাওয়া হচ্ছে সেটা বুঝে যখন সে তা করে ফ্যালে আর ডাক ছেড়ে, লেজ নেড়ে উল্লাসে লাফিয়ে ওঠে টেবিলে আর জানালায়, তাঁরও ফুর্তি লাগছে ওই কুকুরটার মতই।
দুই
বিয়ের দিন রীতি অনুযায়ী (আর সমস্ত রীতি পালনের জন্য কঠোরভাবে জিদ করছিলেন প্রিন্স-মহিষী আর দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা) নিজের কনেকে লেভিন দেখতে পেলেন না। খাওয়া-দাওয়া সারলেন নিজের হোটেলে। হঠাৎ এসে জোটা তিনজন অবিবাহিতের সাথে : সের্গেই ইভানোভিচ কজ্নিশেভ, কাতাভাসোভ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সতীর্থ, এখন প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রফেসর, রাস্তায় তাঁকে দেখতে পেয়ে লেভিন ধরে নিয়ে আসেন নিজের ওখানে এবং চিরিক, নিত্বর, মস্কোর সালিশী আদালতের জজ, ভালুক শিকারে লেভিনের সহচর। খাওয়া-দাওয়া চলল খুবই আনন্দ করে। কজ্নিশেভ ছিলেন খুবই শরিফ মেজাজে, কাতাভাসোভের মৌলিকতায় বেশ মজা লাগল তাঁর। তাঁর মৌলিকতার কদর হচ্ছে, লোকে তা ধরতে পাচ্ছে এটা অনুভব করে কাতাভাসোভ তা নিয়ে চাল মারতে লাগলেন। ফুর্তি করে ভালো মনে সব রকম আলাপেই মেতে উঠছিলেন চিরিকভ।
এক-একটা শব্দ আলাদা আলাদা করে বলার যে অভ্যাস তাঁর হয়েছিল ক্যাথেড্রায়, সেই ভঙ্গিতে কাতাভাসোভ বলছিলেন, ‘এই যে আমাদের বন্ধু কনস্তান্তিন দ্দ্মিত্রিচ, গুণী ছেলে ছিল। আমি অবর্তমানদের কথা বলছি, কেননা সে আর নেই। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরোবার সময় তখন বিজ্ঞানও ভালোবাসতো, মানবিক আগ্রহ-কৌতূহলও ছিল; এখন তার আধখানা গুণ যাচ্ছে আত্মপ্রতারণায়, বাকি আধখানা সে প্রতারণাকে ন্যায়সঙ্গত প্রতিপন্ন করতে।’
‘আপনার মত বিবাহের এত ঘোর শত্রু আমি আর দেখিনি’, বললেন কজ্নিশেভ।
‘না, শত্রু নই। আমি শ্রমবিভাগের বান্ধব। যারা কিছুই করতে পারে না, তারা লোক উৎপাদন করুক, বাকিরা তাদের আলোকপ্রাপ্তি আর সুখে সহায়তা করবে। আমি তো এই বুঝি। এই দুই বৃত্তিকে মিশিয়ে ফেলতে বহু লোকের ভালো লাগে। আমি ওদের দলে নই।’
‘আপনি প্রেমে পড়েছেন জানতে পারলে আমি কি সুখীই যে হব!’ লেভিন বললেন, ‘বিয়েতে আমাকে ডাকতে ভুলবেন না যেন।’
‘ইতিমধ্যেই প্রেমে পড়ে গেছি।’
‘হ্যাঁ, কাল্ মাছের সাথে’, লেভিন বড় ভাইয়ের দিকে ফিরলেন, ‘জান, মিখাইল সেমেনিচ নিবন্ধ লিখছেন পুষ্টি আর…’
‘থাক, গোলমাল করে ফেলতে হবে না! কি নিয়ে লিখছি তাতে এসে যায় না কিছু। আসল কথাটা হল, আমি সত্যিই কাতল মাছ ভালোবাসি।’
‘কিন্তু সে তো স্ত্রীকে ভালোবাসায় ব্যাঘাত ঘটায় না।’
‘সে তো ব্যাঘাত ঘটায় না, কিন্তু ব্যাঘাত ঘটায় স্ত্রী।
‘কেমন করে?’
‘নিজেই দেখবেন। এই তো, আপনি ভালোবাসেন বিষয়-আশয়, শিকার, দেখবেন পরে!’
‘আজ আর্খিপ এসেছিল, বলল প্রুদনোয়ের কাছে হরিণ আছে অনেক আর দুটো ভালুক’, বললেন চিরিকভ।
‘তা ওগুলোকে আপনি ধরাশায়ী করুন আমাকে বাদ দিয়েই।’
‘ঠিক কথা’, বললেন কজ্নিশেভ, ‘এর পর থেকে ভালুক শিকারে সেলাম, বৌ যেতে দেবে না!’
লেভিন হাসলেন। বৌ তাঁকে যেতে দেবে না, এ কল্পনাটা তাঁর কাছে এতই মনোরম ঠেকল যে ভালুক দর্শনের আনন্দ তিনি তখন চিরকালের জন্য ত্যাগ করতে রাজি।
‘কিন্তু এ দুটো ভালুককে অপরে ঘায়েল করবে, এ যে আফসোসের কথা। আর মনে আছে, শেষ বার সেই খাপিলভোতে? চমৎকার হত শিকারটা’, বললেন চিরিকভ
কিটিকে ছাড়া কোথাও কিছু চমৎকার হতে পারে, এ কথা বলে ওঁকে হতাশ করতে না চেয়ে লেভিন চুপ করে রইলেন।
