ভেলভেটের কফে চুপিচুপি তিন রুবলের নোট পেয়ে ডিকন বললেন যে উনি ওঁর নাম লিখে নেবেন এবং শূন্য গির্জার পাটাতনে নতুন বুট জুতার তৎপর শব্দ তুলে গেলেন বেদীতে। মিনিট খানেক বাদে সেখান থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখলেন এবং লেভিনকে ইশারা করলেন আসতে। এতক্ষণ পর্যন্ত অবরুদ্ধ চিন্তা নড়েচড়ে উঠল লেভিনের মাথায়, কিন্তু তাড়াতাড়ি করে তাকে তাড়ালেন তিনি। ‘কোন রকমে ঠিকঠাক হয়ে যাবে’, ভেবে গেলেন পৈঠার কাছে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডান দিকে ফিরে তিনি দেখতে পেলেন যাজককে। আধপাকা পাতলা দাড়ি তাঁর, ক্লান্ত সহৃদয় চোখ, লেকটার্নের কাছে দাঁড়িয়ে প্রার্থনাগ্রন্থের পাতা ওলটাচ্ছিলেন বৃদ্ধ যাজক। লেভিনের উদ্দেশে সামান্য মাথা নুইয়ে উনি তখনই অভ্যস্ত গলায় প্রার্থনাপাঠ শুরু করলেন। সেটা শেষ হলে আভূমি নত হলেন তিনি, মুখ ফেরালেন লেভিনের দিকে।
ক্রসটা দেখিয়ে বললেন, ‘আপনার পাপস্বীকারোক্তি নেবার জন্য খ্রিস্ট এখানে অদৃশ্য থেকে উপস্থিত আছেন। আমাদের পবিত্র অ্যাপোস্ল গির্জা যা শিক্ষা দেয়, তা সবই আপনি বিশ্বাস করেন?’ লেভিনের মুখ থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে স্টোলের তলে হাত রেখে তিনি বলে গেলেন।
‘সব কিছুতে আমার সন্দেহ আছে এবং সন্দেহ করি’, নিজের কাছেই অপ্রীতিকর একটা কণ্ঠস্বরে লেভিন বললেন এবং চুপ করে রইলেন।
আরো কিছু যদি বলে, এই আশায় কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা করলেন যাজক তারপর চোখ বুজে ‘ও’ স্বরের ওপর দ্রুত জোর দিয়ে ভ্লাদিমির অঞ্চলের টানে বলে গেলেন : ‘সন্দেহ মানুষের দুর্বলতার লক্ষণ, কিন্তু করুণাময় প্রভু যাতে আমাদের শক্তি দেন তার জন্য প্রার্থনা করতে হবে আমাদের। বিশেষ পাপ কি করেছেন আপনি?’ এতটুকু ফাঁক না দিয়ে যোগ করলেন যেন সময় নষ্ট হতে পারে বলে ভয় হচ্ছিল তাঁর।
‘আমার প্রধান পাপ সন্দেহ। সব সময়ই সন্দেহ হয় আমার, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে থাকি সন্দেহের মধ্যে।’
‘সন্দেহ মানুষের দুর্বলতার লক্ষণ’, একই কথার পুনরাবৃত্তি করলেন যাজক, ‘প্রধানত কিসে আপনার সন্দেহ?’
‘সব কিছুতেই। মাঝে মাঝে এমন কি সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বেই সন্দেহ হয় আমার’, অজ্ঞাতসারেই বলে ফেললেন লেভিন আর যা বলেছেন তার অনৌচিতো আতংক হল তাঁর। কিন্তু লেভিনের কথায় মনে হল যেন কোন প্রতিক্রিয়া ঘটল না যাজকের।
সামান্য লক্ষগোচর একটু হাসি নিয়ে তিনি তাড়াতাড়ি বললেন, ‘সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে সন্দেহ আবার কি হতে পারে?’
লেভিন চুপ করে রইলেন।
‘সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে সন্দেহ আবার কি হতে পারে, যখন তাঁর সৃষ্টি আপনি দেখছেন?’ দ্রুত অভ্যস্ত টানে বলে গেলেন যাজক। ‘গগনমণ্ডলকে জ্যোতিষ্ক দিয়ে সাজাল কে? পৃথিবীকে কে সৌন্দর্যে মণ্ডিত করেছে? স্রষ্টা ছাড়া চলে কি?’ লেভিনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিনি বললেন।
লেভিন টের পাচ্ছিলেন যে যাজকের সাথে দার্শনিক বিতর্কে প্রবৃত্ত হওয়া অশোভন, তাই জবাবে শুধু সেটা বললেন যা প্রশ্নটার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
লেভিন বললেন, ‘আমি জানি না।’
‘জানেন না? তাহলে সৃষ্টিকর্তার যে এ সব সৃষ্টি করেছেন, তাতেও সন্দেহ করেন আপনি?’ আমুদে একটা বিহ্বলতায় বললেন যাজক।
‘আমি কিছুই বুঝি না’, লাল হয়ে উঠে লেভিন বললেন, অনুভব করছিলেন যে তাঁর কথা হবে বোকার মত, এ অবস্থায় বোকার মত না হয়ে পারে না।
‘সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করে তাঁর কাছে অনুরোধ জানান। এমন কি দেবোপম পাদ্রীদেরও সন্দেহ থাকত, তাঁদের বিশ্বাস দৃঢ় করার জন্য তাঁরা প্রার্থনা করেছিলেন সৃষ্টিকর্তার কাছে। শয়তানের শক্তি অনেক, কিন্তু তার কাছে আত্মসমর্পণ করা আমাদের উচিত নয়। সৃষ্টিকর্তার উপাসনা করুন, প্রার্থনা করুন তাঁর কাছে। উপাসনা করুন’, তাড়াতাড়ি পুনরুক্তি করলেন তিনি।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে যাজক যেন কিছু-একটা ভাবছিলেন।
‘আমি শুনেছি আপনি আমার প্যারিশভুক্ত ও আধ্যাত্মিক পুত্র প্রিন্স শ্যেরবাৎস্কির কন্যাকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন?’ হেসে যোগ করলেন তিনি, ‘চমৎকার মেয়ে।’
‘হ্যাঁ’, যাজকের বদলে লজ্জায় লাল হয়ে জবাব দিলেন লেভিন। ভাবলেন, ‘স্বীকারোক্তির ব্যাপারে ওটা তাঁর কি দরকার।’
এবং যেন তাঁর ভাবনার জবাব দিয়ে যাজক বললেন, ‘আপনি বিয়ে করতে যাচ্ছেন আর সৃষ্টিকর্তা হয়ত বংশধর দিয়ে পুরস্কৃত করবেন আপনাকে, তাই না? কিন্তু শয়তানের প্রলোভন যা আপনাকে অবিশ্বাসের দিকে আকর্ষণ করছে তা জয় করতে না পারলে কি শিক্ষা দেবেন আপনার শিশুদের?’ নিরীহ ভর্ৎসনায় উনি বললেন। ‘আপনার আত্মজনদের যদি আপনি ভালোবাসেন, তাহলে সন্তানদের জন্য আপনি শুধু ধন-সম্পদ, বিলাস, মানসম্মানই চাইবেন না; আপনি চাইবেন ওদের ত্রাণ, সত্যের আলোয় তাদের আত্মিক উদ্ভাসন। তাই না? কি আপনি জবাব দেবেন যখন আপনার নিষ্পাপ শিশুসন্তান আপনাকে জিজ্ঞেস করবে, ‘বাবা, এ দুনিয়ায় আমার যা-যা ভালো লাগে—পৃথিবী, পানি, সূর্য, ফুল, ঘাস—এ সব কে গড়ে দিল? তাকে কি আপনি বলবেন, ‘আমি জানি না?’ না জেনে আপনি পারেন না যখন প্রভু তাঁর পরম করুণায় আপনার জন্য এসব উন্মোচিত করে দিয়েছেন। কিংবা আপনার ছেলেমেয়েরা জিজ্ঞেস করবে, ‘পরলোকে কি হবে আমার?’ কি তাকে বলবেন যখন কিছুই আপনি জানেন না? কি করে জবাব দেবেন তাকে? তাকে দেবেন বিশ্ব আর শয়তানের মাধুর্য? এটা ভালো নয়!’ এই বলে মাথা একপাশে হেলিয়ে লেভিনের দিকে তাঁর সহৃদয় নিরীহ দৃষ্টি নিবন্ধ করে থামলেন তিনি।
