গ্রামে তরুণযুগলের জন্য সব ব্যবস্থাদি করে ফিরে এসে অলোনস্কি বললেন, ‘কিন্তু শোন, তুমি পাপ স্বীকার করেছ উপাসনায়, এমন সাক্ষ্য আছে তোমার?’
‘নেই। কিন্তু কেন?’
‘তা ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।’
‘ধুত্তোরি ছাই!’ চেঁচিয়ে উঠলেন লেভিন, ‘আমি বোধহয় বছর নয়েক উপবাস আর দীক্ষায় যোগ দিইনি।‘
‘বেশ!’ হেসে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘আর আমাকে বলো কিনা নিহিলিস্ট! তবে এটা ছাড়া চলবে না। তোমাকে যথারীতি উপবাস দিয়ে দীক্ষাশীর্বাদ নিতে হবে।’
‘কবে? বাকি আছে যে চারদিন।’
অব্লোন্স্কি এটারও ব্যবস্থা করলেন। উপোস দিতে লাগলেন লেভিন। নিজে নাস্তিক অথচ অন্যদের ধর্মবিশ্বাসের প্রতি সশ্রদ্ধ লোকদের মত লেভিনের পক্ষেও গির্জায় উপস্থিত থেকে তার বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে যোগ দেওয়াটা ছিল বড়ই কষ্টকর। এখন তাঁর প্রাণের যা অবস্থা, যাতে সব কিছুর প্রতি তিনি সংবেদনশীল ও নম্রীভূত, তাতে ভান করা লেভিনের পক্ষে শুধু কঠিন নয়, একেবারে অসম্ভব ঠেকল। এখন তাঁর যশ, তাঁর শ্রীবৃদ্ধি যে-রকম দাঁড়িয়েছে, তাতে তাঁকে হয় মিথ্যে বলতে হয়, নয় সৃষ্টিকর্তার নিন্দা করতে হয়। তিনি টের পাচ্ছিলেন যে, এর কোনটাই করার মত অবস্থায় তিনি নেই। অব্লোন্স্কিকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, উপবাস-দীক্ষাদি ছাড়াই সাক্ষ্য পাওয়া যায় কি না। অব্লোন্স্কি বললেন, সেটা অসম্ভব।
‘কি আর এমন হল—দুটো তো দিন? ওটি বেশ অমায়িক বুদ্ধিমান বৃদ্ধ। তোমার এই দাঁতটা এমনভাবে সে তুলে ফেলবে যে তুমিই টেরও পাবে না।’
ষোল-সতের বছর বয়সে তাঁর মনে যে প্রবল ধর্মভাব জেগেছিল, প্রথম দ্বিপ্রাহরিক উপাসনার সেই কৈশোর স্মৃতি সতেজ করে তোলার চেষ্টা করলেন লেভিন। কিন্তু সাথে সাথেই নিঃসন্দেহ হয়ে উঠলেন যে সেটা তাঁর পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। তিনি চেষ্টা করলেন এসব কিছুকে একটা তাৎপর্যহীন ফাঁকা রেওয়াজ হিসেবে দেখবার চেষ্টা করতে, যেরকম রেওয়াজ হল আনুষ্ঠানিক দেখা করার ব্যাপারটা; কিন্তু টের পেলেন যে এটাও তিনি করতে পারছেন না কিছুতেই। ধর্মের ব্যাপারে লেভিন তাঁর অধিকাংশ সমসাময়িকদের মতই ছিলেন অতি অনির্দিষ্ট এক অবস্থায়। সৃষ্টিকর্তার বিশ্বাস তাঁর ছিল না, কিন্তু সেইসাথে এ সবই অন্যায়—এমন একটা দৃঢ় বিশ্বাসও ছিল না তাঁর। তাই তিনি যা করছেন তার অর্থমাহাত্ম্যে বিশ্বাস রাখা অথবা ফাঁকা একটা আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে এটাকে নির্বিকারভাবে দেখা, এর কোনটাই করার মত অবস্থায় না থাকায় উপবাস-দীক্ষার এই গোটা সময়টা তাঁর অস্বস্তি ও লজ্জা বোধ হচ্ছিল, যা করছিলেন তা তাঁর নিজের কাছেই বোধগম্য ছিল না, তাই তাঁর অন্তর যা বলছিল, করছিলেন তা তাঁর নিজের কাছেই বোধগম্য ছিল না, তাই তাঁর অন্তর যা বলছিল, করছিলেন কিছু-একটা মিথ্যাচার ও অন্যায়।
উপাসনার সময় তিনি প্রার্থনা কখনো শুনছিলেন এবং তাতে এমন অর্থ আরোপ করার চেষ্টা করছিলেন যা তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে নয়, আবার ওসব তিনি বুঝবেন না কিন্তু তার নিন্দাও করতে হয় এটা অনুভব করে চেষ্টা করছিলেন প্রার্থনা না শুনতে, নিজের ভাবনা, পর্যবেক্ষণ আর স্মৃতিচারণে নিমগ্ন থাকতে চাইছিলেন, যা গির্জায় এই পরবে দাঁড়িয়ে থাকার সময় অসাধারণ জীবন্ত হয়ে তাঁর মাথায় ঘুরঘুর করছিল।
প্রভাতী দ্বিপ্রাহরিক ও সান্ধ্য উপাসনা তিনি সয়ে গেলেন আর পরের দিন উঠলেন সচরাচরের চেয়ে আগে, চা না খেয়ে সকাল আটটায় প্রভাতী উপাসনা ও বচনামৃত শোনার জন্য।
একজন কাঙাল সৈনিক, দুজন বৃদ্ধা আর গির্জার সেবকরা ছাড়া সেখানে কেউ ছিল না।
পাতলা আলখাল্লার নিচে তরুণ ডিকনের লম্বা পিঠের দুই অর্ধাংশ প্রকট হয়ে ফুটে উঠেছে। লেভিনকে স্বাগত করে তিনি তৎক্ষণাৎ দেয়ালের কাছে ছোট একটা টেবিলের সামনে গিয়ে নীতিমালা পাঠ করতে শুরু করলেন। পাঠ যত এগোতে লাগল ততই, বিশেষ করে ‘প্রভু কৃপা করো’ কথাটার ঘনঘন ও দ্রুত পুনরুক্তিতে যা শোনাচ্ছিল ‘কৃপক, কৃপক’-এর মতই, লেভিন টের পাচ্ছিলেন যে তাঁর চিন্তা অবরুদ্ধ ও সীলমোহরাঙ্কিত হয়ে পড়ছে, এখন তাতে ছোঁয়া বা নাড়া দেওয়া অনুচিত, নইলে গোলমাল বেঁধে যাবে, তাই ডিকনের পেছনে দাঁড়িয়ে তিনি পাঠ না শুনে, তার ভেতরে প্রবেশ না করে নিজের ভাবনা ভেবে চললেন। কাল সন্ধ্যায় কোণের টেবিলটায় বসে থাকার কথা মনে করে তিনি ভাবছিলেন, ‘আশ্চর্য ভাবব্যঞ্জক কিটির হাত।’ বরাবরের মত প্রায় এই সময়টায় তাঁদের বলার কিছু ছিল না, আর কিটি টেবিলে হাত রেখে তা মুঠো করছিল আর খুলছিল আর তার নড়ন-চড়ন দেখে হেসে উঠছিল নিজেই। তাঁর মনে পড়ল যে সে হাতে তিনি চুমু খেয়েছিলেন, তারপর লক্ষ্য করছিলেন গোলাপি তালুতে মিলে যাওয়া রেখাগুলো। ‘আবার কৃপক…’ শরীর নুইয়ে এবং ডিকনের স্থিতিস্থাপক অবনত পিঠটা লক্ষ্য করতে করতে ভাবলেন লেভিন, ‘কিটি তারপর আমার হাতটা টেনে নিয়ে কররেখা দেখতে থাকে। বলেছিল, ‘তোমার চমৎকার হাত।’ নিজের হাতটা আর ডিকনের বেঁটে হাতটা লক্ষ করেন তিনি। ‘এবার বোধহয় শিগগিরই শেষ হচ্ছে’, ভাবলেন তিনি। ‘উঁহু, আবার মনে হচ্ছে গোড়া থেকে শুরু হল’, প্রার্থনা শুনতে শুনতে তিনি ভাবলেন, ‘না, শেষই হচ্ছে। ঐ তো উনি আভূমি নত হচ্ছেন। শেষ হবার আগে সব সময়ই এই করা হয়।’
