‘আর বাইবেলোক্ত পতিতা?’
‘আহ চুপ কর তো! খ্রিস্ট যদি জানতেন কথাগুলোর কি অপব্যবহার হবে, তাহলে কখনোই তিনি তা বলতেন না। কেননা সারা খ্রিস্ট উপদেশামৃত থেকে লোকে মনে রেখেছে কেবল ঐটুকুই। তবে আমি বলছি যা ভাবি তা নয়, যা অনুভব করি। পতিতা নারীদের প্রতি আমার একটা বিতৃষ্ণা আছে। তুমি ভয় পাও মাকড়শায়, আমি এই কদর্য জীবগুলোকে। মাকড়শাদের নিয়ে তুমি নিশ্চয় অনুসন্ধান চালাওনি, তাদের ধরন-ধারন জানো না? আমিও সেইরকম।’
‘তোমার পক্ষে এ সব কথা বলতে আর কি; এ ঠিক ডিকেন্সের ওই ভদ্রলোকটির মত, যিনি বাঁ হাতে সমস্ত মুশকিলে প্রশ্নগুলোকে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলতেন ডান কাঁধের ওপর দিয়ে। কিন্তু বাস্তব সত্যকে অস্বীকার করা তার জবাব নয়। কি করা যাবে, তুমি বলো আমাকে, কি করি? বৌ বুড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ আমি জীবনে ভরপুর। দেখতে না দেখচে টের পেতে হয়, বৌকে যতই শ্রদ্ধা করি, সপ্রেম ভালোবাসা আর সম্ভব নয়। তারপর হঠাৎ দেখা দিল প্রেম, তুমিও ডুবলে, একেবারে ডুবলে!’ বিষন্তাশায় বললেন অবলোনস্কি।
লেভিন ঠোঁট কুঁচকে হাসলেন।
হ্যাঁ, ডুবেছি’, অবলোনস্কি বলে চললেন, কিন্তু কি করা যায়?
বন রুটি চুরি করতে যেও না।’
হেসে উঠলেন অবলোনস্কি।
‘আহা আমার নীতিবান! কিন্তু ভেবে দেখো। রয়েছে দুটো নারী। একজন দাবি করছে শুধু নিজের অধিকার, আর সে অধিকার হল ভালোবাসা যা তুমি দিতে অক্ষম; অন্যজন তোমার জন্য সব কিছু ত্যাগ করেছে, অথচ কিছুই দাবি করছে না। কি করা যাবে তখন, কি কর্তব্য? এ এক ভয়ংকর ট্রাজেডি।’
‘এ ব্যাপারে আমার উপদেশ যদি শুনতে চাও, তাহলে আমি বলব যে এক্ষেত্রে কোন ট্রাজেডি ঘটেছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। কেন, তা বলি। আমার মতে প্রেম… দু’ধরনের প্রেমই, মনে আছে তো? প্লেটো যার সংজ্ঞা দিয়েছেন তার সিম্পোজিয়ামে’, দু’ধরনের প্রেমই লোককে পরখ করার কষ্টিপাথর। একদল লোক শুধু এক ধরনের প্রেম বোঝে, অন্য দল অন্যটা। যারা অনিষ্কাম প্রেমই বোঝে, খামোকাই তারা ট্রাজেডির কথা বলছে। এরকম প্রেমে কোন ট্রাজেডিই হতে পারে না। সুখদানের জন্য বিনীত ধন্যবাদ’, ব্যাস, ফুরিয়ে গেল ট্রাজেডি। আর নিষ্কাম প্রেমে ট্রাজেডির কথাই ওঠে না, কেননা এরূপ প্রেমে সবই উজ্জ্বল আর নির্মল, কেননা…’
এই সময় লেভিনের মনে পড়ল তার নিজের পাপ আর তা নিয়ে আত্মগ্লানির কথা। তাই হঠাৎ তিনি যোগ করলেন : ‘তবে তুমিও হয়ত ঠিক, খুবই তা সম্ভব… কিন্তু আমি জানি না, সত্যিই জানি না।’
অবলোনস্কি বললেন, ‘কি জানো, তুমি খুবই লক্ষ্যনিষ্ঠ লোক। এটা তোমার গুণও বটে, দোষও বটে। তোমার নিজের চরিত্র লক্ষ্যনিষ্ঠ আর চাও যেন গোটা জীবন অন্বিত হয়ে ওঠে লক্ষ্যনিষ্ঠ ঘটনায়, অথচ এটা হয় না। এই যে তুমি প্রশাসনিক রাজপুরুষদের কার্যকলাপ ঘৃণা কর, কারণ তোমার ইচ্ছে যেন ব্যাপারটা চলে একটা লক্ষ্য মেনে, এটা হয় না। তুমি এও চাও, একজন ব্যক্তির ক্রিয়াকলাপের যেন সব সময়ই একটা লক্ষ্য থাকে, প্রেম আর পারিবারিক জীবন যেন সব সময় একসাথে মিলে যায়। অথচ সেটা হয় না। জীবনের সমস্ত বৈচিত্র্য, সমস্ত মাধুরী, সমস্ত সৌন্দর্য গড়ে ওঠে ছায়া আর আলো দিয়ে।
লেভিন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, কোন জবাব দিলেন না তিনি। মগ্ন ছিলেন নিজের চিন্তায়, অবলোনস্কির কথা কানে যাচ্ছিল না।
হঠাৎ দুজনেই টের পেলেন যে তাঁরা যদিও বন্ধু এবং একসাথে খানাপিনা করেছেন, যাতে তাদের আরো কাছাকাছি আসার কথা, তাহলেও প্রত্যেকে ভাবছেন শুধু নিজের ব্যাপার নিয়ে, অপরের জন্য কারোর মাথাব্যথা নেই। আহারের পর নৈকট্যের পরিবর্তে এই চূড়ান্ত বিযুক্তির অভিজ্ঞতা অবলোনস্কির হয়েছে একাধিক বার এবং জানতেন এ সব ক্ষেত্রে কি করা উচিত।
‘বিল!’ বলে চিৎকার করে তিনি গেলেন পাশের কক্ষে এবং তৎক্ষণাৎ পরিচিত একজন অ্যাডজুট্যান্টের দেখা পেলেন, তার সাথে শুরু করে দিলেন জনৈকা অভিনেত্রী আর তার পৃষ্ঠাপোষককে নিয়ে আলাপ। অ্যাডজুট্যান্টের সাথে কথা কয়ে অবলোনস্কি তৎক্ষণাৎ লেভিনের সাথে কথাবার্তা থেকে হাঁপ ছেড়ে হালকা হবার আমেজ পেলেন। লেভিন সব সময়ই তাকে আহ্বান করতেন বড় বেশি মানসিক ও আত্মিক প্রয়াসে।
তাতার যখন ছাব্বিশ রুবল আর কিছু কোপেক, সেই সাথে ভোদুকার জন্য বখশিসের বিল নিয়ে এল, গ্রামবাসী যে লেভিন অন্য সময়ে তার ভাগের এই চৌদ্দ রুবল বিল দেখে আঁতকে উঠতেন, এবার তিনি ভ্রূক্ষেপও করলেন না, হিসাব মিটিয়ে দিলেন এবং বাড়ি ফিরলেন পোশাক বদলিয়ে শ্যেরবাৎস্কিদের ওখানে রওনা দেবার জন্য, যেখানে তাঁর ভাগ্য স্থির হয়ে যাবে।
বারো
এখন প্রিন্সেস কিটি শ্যেরবাঙ্কায়ার বয়স আঠারো বছর। সমাজে সে বেরোচ্ছে এই প্রথম শীত। এখানে তার সাফল্য তার দু’বোনের চেয়ে বেশি, এমন কি প্রিন্স-মহিষীর প্রত্যাশাকেও তা ছাড়িয়ে গেছে। মস্কোর বলনাচগুলোতে যেসব তরুণ যোগ দিত, তাদের প্রায় সবাই যে কিটির প্রেমে পড়েছিল শুধু তাই নয়, সেই প্রথম শীতেই দেখা দিল। গুরুত্বের সাথে বিবেচনার যোগ্য দুজন পাত্র ও লেভিন, এবং তিনি চলে যাওয়ার পরেই আবির্ভূত হন কাউন্ট ভ্রনস্কি।
শীতের গোড়ায় লেভিনের আগমন, তার ঘন ঘন যাতায়াত, কিটির প্রতি তার সুস্পষ্ট অনুরাগ প্রিন্স ও প্রিন্স মহিষীর মধ্যে কিটির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর আলোচনা ও তাঁদের মধ্যে কলহের উপলক্ষ হয়ে উঠেছিল। প্রিন্স ছিলেন লেভিনের পক্ষে, বলতেন যে কিটির জন্য এর চেয়ে ভালো কিছু তিনি কামনা করেন না। আর নারীদের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার স্বভাবসিদ্ধ অভ্যাসে তার স্ত্রী বলতেন যে কিটির বয়স বড় কম, লেভিনের যে একটা গুরুত্বপূর্ণ সংকল্প আছে, সেটা কোন কিছুতেই তিনি প্রকাশ করেননি, ওঁর জন্য কিটির টান নেই ইত্যাদি নানা যুক্তি দিতেন; কিন্তু প্রধান কথাটা তিনি বলেননি যে মেয়ের জন্য তিনি যোগ্যতর পাত্রের অপেক্ষায় আছেন, লেভিনকে তাঁর ভালো লাগে না, তাঁকে বোঝেন না তিনি। লেভিন যখন অকস্মাৎ চলে গেলেন, প্রিন্স-মহিষী খুশিই হলেন, সগৌরবে স্বামীকে বললেন, ‘দেখছ তো, আমার কথাই ঠিক।’ আর যখন উদয় হল ভ্রনস্কির, তখন তিনি আরো খুশি হলেন তার এই অভিমতে নিশ্চিত হয়ে যে কিটির হওয়া উচিত নেহাৎ ভালো রকম নয়, চমৎকার একটা বিয়ে।
