আন্না এবার আর হাসিতে জবাব না দিয়ে পারলেন না। সেটা অবশ্য ভ্রন্স্কির কথার উদ্দেশে নয়, তাঁর প্রেমাকুল চোখটার উদ্দেশে। আন্না তাঁর হাত নিয়ে নিজের ঠাণ্ডা গাল আর ছাঁটা চুলে বুলাতে লাগলেন।
‘এই ছেঁটে ফেলা চুলে তোমাকে চেনাই মুশকিল। তোমাকে খুবই সুন্দর দেখাচ্ছে। যেন খোকা। কিন্তু কি ফ্যাকাশে হয়ে গেছ তুমি।’
আন্না হেসে বললেন, ‘হ্যাঁ, ভীষণ দুর্বল’, আবার কাঁপতে লাগল তাঁর ঠোঁট।
ভ্রন্স্কি বললেন, ‘আমরা ইতালিতে যাব। সেখানে গিয়ে তুমি ভালো হয়ে উঠবে।’
ভ্রন্স্কির চোখের দিকে তাকিয়ে কাছ থেকে আন্না বললেন, ‘আমরা স্বামী-স্ত্রী হব—এটা কি সত্যিই সম্ভব! নিজেদের পরিবার নিয়ে তোমার সাথে একা থাকব?
‘এটা ভেবেই শুধু আমার ভেবে অবাক লাগে যে, ব্যাপারটা কেমন করে কখনো অন্য কিছু হতে পারত।’
ভ্রন্স্কির মুখ এড়িয়ে চিন্তিতভাবে আন্না বললেন, ‘স্তিভা বলছে, উনি সব কিছুতে রাজি। কিন্তু ওঁর মহানুভবতা আমি গ্রহণ করতে পারি না। আমি বিবাহবিচ্ছেদ চাই না, এখন আমার আর কোন কিছুতেই কিছু এসে যায় না। শুধু জানি না উনি সেরিওজা সম্পর্কে কি সিদ্ধান্ত নেবেন।’
কিছুতেই ভ্রন্স্কি বুঝতে পারলেন না যে, মিলনের এই মুহূর্তে উনি ছেলের কথা, বিবাহবিচ্ছেদের কথা ভাবতে পারলেন, স্মরণ করতে পারলেন কি করে? এতে কি কিছু এসে যায়?
অনুস্কি নিজের হাতে আন্নার হাতটা নিয়ে ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, ‘ও কথা তুলো না। ও সব ভেবো না’, একথা বলে নিজের প্রতি তাঁর মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেন; তাতেও আন্না তাঁর দিকে তাকাচ্ছিলেন না।
আন্না বললেন, ‘হায় সৃষ্টিকর্তা! আমি কেন যে মরলাম না! মরলেই সবচেয়ে ভালো হত’, এবং নিঃশব্দ কান্নায় দু’গাল বেয়ে সমানে চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে লাগল; কিন্তু ভ্রন্স্কির মনে ব্যথা না দেবার জন্য মুখটায় হাসি-হাসি ভাব ধরে রাখতে চেষ্টা করলেন।
এক সময় ভ্রন্স্কির ধারণা ছিল, তাশখন্দের প্রশংসার্হ ও বিপজ্জনক চাকরিটা প্রত্যাখ্যান করা হত একটা অপমানজনক ও অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু তিনি এখন একটুও না ভেবে সেটা প্রত্যাখ্যান করলেন আর তাঁর আচরণে ওপরওয়ালাদের অননুমোদন লক্ষ্য করে এক মুহূর্ত দেরি না করে সাথে সাথেই সামরিক বাহিনীর চাকরিটা ছেড়ে দিলেন।
কারেনিন এক মাস পরে পিটার্সবুর্গের নিজের বাড়িতে ছেলেকে নিয়ে একা পড়ে রইলেন এবং বিবাহবিচ্ছেদ না করে, বিবাহবিচ্ছেদের প্রস্তাব দৃঢ়তার সাথে অগ্রাহ্য করে, আন্না ভ্রন্স্কির সাথে বিদেশে চলে গেলেন।
