ভারিয়া তাঁর এ কথার কোন উত্তর না দিয়ে তাঁর ওপর ঝুঁকে পড়ে তাঁর মুখের দিকে আনন্দের হাসি নিয়ে তাকালেন। চোখ দুটো উজ্জ্বল, জ্বরতপ্ত নয়, কিন্তু চাহনিটা একটু কঠোর
ভারিয়া বললেন, ‘যাক বাবা! ব্যথা করছে না?’
তিনি বুকটা দেখিয়ে বললেন, ‘এখানে সামান্য ব্যথা আছে।’
‘দাও তাহলে, নতুন করে ব্যান্ডেজটা করে দিই।’
যতক্ষণ পর্যন্ত ভারিয়া ব্যান্ডেজ করছিলেন, ভ্রন্স্কি ততক্ষণ তাঁর প্রশস্ত চিবুক চেপে নীরবে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ব্যান্ডেজ শেষ হলে উনি বললেন : ‘আমি ভুল বকছি না। আমি ইচ্ছে করেই নিজেকে গুলি করেছি—এমন কথাবার্তা যেন না হয়, তুমি দয়া করে সেই ব্যবস্থা কর।’
ভারিয়া একটা জিজ্ঞাসু হাসি হেসে বললেন, ‘সে কথা কেউ বলবে না। তবে আশা করি, তুমি আর আচমকা গুলি করে বসবে না!’
তিনি বিষণ্ণ হাসি হেসে বললেন, ‘না-করারই কথা। তবে ভালো হত…’
এ কথা এবং ভারিয়া যে হাসিতে ভয় পেয়েছিলেন তা সত্ত্বেও ব্যথা যখন কেটে গেল আর তিনি আরোগ্য লাভ করতে লাগলেন, তখন তিনি অনুভব করছিলেন যে তিনি তাঁর দুঃখের একাংশ থেকে একেবারে মুক্ত। যে লজ্জা আর হীনতা তিনি আগে বোধ করছিলেন, এই কাণ্ডটা করে তা যেন তিনি ধুয়ে-মুছে ফেলেছেন। কারেনিন সম্পর্কে এখন তিনি ভাবতে পারেন শান্তচিত্তে। তাঁর সমস্ত মহানুভবতা তিনি স্বীকার করলেন, নিজেকে আর হীন বোধ হচ্ছিল না। এটা ছাড়াও পুনরায় তিনি ফিরতে পারলেন পূর্বতন জীবনধারায়। অসংকোচে লোকের চোখে চোখে তাকানো যে সম্ভব সেটা দেখতে পেলেন তিনি, নিজের অভ্যাস অনুসারে দিন কাটাতে পারেন। যে একটা ভার তিনি বুক থেকে নামাতে পারছিলেন না, সেটা হল এই যে অনুভূতিটা দমন করার সংগ্রাম না থামালেও প্রায় হতাশার সীমানায় পৌঁছনো এই আক্ষেপটা তাঁকে রেহাই দিচ্ছিল না যে আন্নাকে তিনি হারিয়েছেন। স্বামীর কাছে নিজের অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার পর এখন আন্নাকে যে ছেড়ে যেতে হচ্ছে, অনুতপ্ত আন্না আর তাঁর স্বামীর মাঝখানে আর কখনো যে তাঁর দাঁড়ানো চলবে না, এই সিদ্ধান্তটা তিনি দৃঢ় করে নিয়েছিলেন, মনে মনে; কিন্তু আন্নার ভালোবাসা হারাবার আক্ষেপ তিনি দূর করতে পারছিলেন না প্রাণের ভেতর থেকে, তাঁর সাথে সুখের যে মুহূর্তগুলো তাঁর কেটেছে, তখন যার কদর তিনি করেছেন কম আর এখন যা তাদের সমস্ত মাধুর্য নিয়ে হানা দিচ্ছে তাঁকে, তা স্মৃতি থেকে তিনি মুছে ফেলতে পারছিলেন না।
তাশখন্দে তাঁর একটা কাজের ব্যবস্থা করেন সেপুখোভস্কয় আর ভ্রন্স্কি কোন রকম দ্বিধা না করে রাজি হয়ে যান। কিন্তু যাত্রার সময় যত কাছিয়ে আসতে লাগল, ততই যে আত্মত্যাগ তিনি উচিত বলে গণ্য করেছিলেন সেটা তাঁর কাছে দুঃসহ হয়ে উঠল।
তাঁর ক্ষতটা সেরে গেল। তাশখন্দে যাবার তোড়জোড়ের জন্য বাইরে বেরোতে লাগলেন তিনি 1
তিনি ভাবছিলেন, ‘তাকে শুধু একবার দেখে তারপর কবরে যাওয়া যায়, নিশ্চিন্তে মরা যায়।’ বিদায় নিতে গিয়ে বেত্সিকে সে কথা তিনি বলেন। বেত্সি তাঁরই দূতী হয়ে আন্নার কাছে গিয়েছিলেন এবং তাঁকে নেতিবাচক উত্তর
এনে দেন।
ভ্রন্স্কি খবরটা পেয়ে ভাবলেন, ‘এটাই বরং ভালো। ওটা দুর্বলতা, তাতে আমার শেষ শক্তিও ফুরিয়ে যেত।’ বেত্সি নিজেই পরের দিন তাঁর কাছে এলেন এবং বললেন যে, কারেনিন বিবাহবিচ্ছেদ রাজি, – অব্লোন্স্কির কাছ থেকে তিনি এ খবরটা পেয়েছেন। সুতরাং তাঁর সাথে ভ্রন্স্কি দেখা করতে পারেন।
বেত্সিকে বিদায় দেবেন—এ সময়টাও তর সইল না, নিজের সমস্ত সিদ্ধান্ত ভুলে গিয়ে, কখন দেখা করা যায়, স্বামী কোথায়—এসব কিছুই জিজ্ঞেস না করে ভ্রন্স্কি তৎক্ষণাৎ কারেনিনদের ওখানে রওনা দিলেন। কাউকে এবং কোন কিছুর প্রতি দৃষ্টিপাত না করে দ্রুত পদক্ষেপে সিঁড়ি দিয়ে ছুটে উঠে গেলেন। প্রায় ছুটে গিয়ে আন্নার ঘরে ঢুকলেন। ঘরে কেউ আছে কি নেই, সে কথা না ভেবে, না লক্ষ্য করে আন্নাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চুমোয় চুমোয় তাঁর মুখ, বাহু, গাল—সব কিছু ভরিয়ে দিলেন
এ সাক্ষাৎটার জন্য আন্না তৈরি হয়েই ছিলেন। কি বলবেন—তাও ভেবে রেখেছিলেন। কিন্তু এর ফলে কিছুই বলে উঠতে পারলেন না; তাঁকেও ভ্রন্স্কির প্রেমাবেগ আচ্ছন্ন করল। আন্না ওঁকে, নিজেকে শান্ত করতে চাইছিলেন, কিন্তু ততক্ষণে বড় দেরি হয়ে গেছে। তাঁর মধ্যে ভ্রন্স্কির আবেগ সঞ্চারিত হল। তাঁর ঠোঁট এমনভাবে থরথর করে কাঁপছিল যে, তিনি অনেকক্ষণ কোন কথাই বলতে পারলেন না।
ভ্রন্স্কির হাত নিজের বুকে চেপে ধরে আন্না অবশেষে বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমি আমাকে জিনে নিয়েছ। আমি তোমার, শুধুই তোমার। ‘
ভ্রন্স্কি বললেন, ‘হ্যাঁ, তাই হওয়া উচিত! আমরা যতক্ষণ বেঁচে আছি, এই-ই হতে হবে। এখন তা আমি জেনেছি।’
আন্না ক্রমাগত বিবর্ণ হয়ে ভ্রন্স্কির মাথা জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘তা ঠিক। তাহলেও যা সব ঘটে গেল, তার পরে এর মধ্যে ভয়াবহ কি-একটা যেন আছে।’
তিনি মাথা তুলে হাসিতে নিজের সবল দাঁত বিকশিত করে বললেন, ‘সবই কেটে যাবে! সবই কেটে যাবে! আমরা মহা সুখী হব! এর মধ্যে ভয়াবহ ধরনের কিছু-একটা আছে বলেই আমাদের ভালোবাসা আরো প্রবল হয়ে উঠব। অবশ্য আরো প্রবল হওয়া যদি সম্ভব হয়।’
