যদি বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে তাহলে ছেলেটার কি হবে? তাকে মায়ের কাছে রেখে দেওয়া চলে না। বিয়ে-ভাঙা মায়ের থাকবে নিজস্ব অবৈধ সংসার, সেখানে ছেলের অবস্থা এবং লালন-পালন নিশ্চয়ই হবে খারাপ। তাকে কি নিজের কাছে রাখবেন? উনি জানতেন যে সেটা হবে তাঁর পক্ষ থেকে একটা প্রতিহিংসা, এটা তিনি চাইছিলেন না। তাছাড়া বিবাহবিচ্ছেদ কারেনিনের কাছে সবচেয়ে অসম্ভব মনে হচ্ছিল। কারণ এতে সায় দিয়ে তিনি আন্নাকে মারবেন। মস্কোয় দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার এই কথাটা তাঁর মনে বিঁধেছিল যে, বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি শুধু নিজের কথাই ভাবছেন। ভাবছেন না যে, এতে করে আন্নাকে তিনি ঠেলে দিচ্ছেন অমোঘ ধ্বংসে। নিজের ক্ষমা, সন্তানদের প্রতি তাঁর স্নেহের সাথে এই কথাগুলো মিলিয়ে এখন তিনি নিজের মত তার একটা অর্থ খুঁজে পেয়েছেন। বিবাহবিচ্ছেদের রাজী হাওয়া, আন্নাকে মুক্তি দেওয়ার অর্থ, তাঁর ধারণায়, জীবনের শেষ অবলম্বন, যে সন্তানদের তিনি ভালোবাসেন তাদের হারানো, আর সাধুতার পথে আসার শেষ আশ্রয়স্থল কেড়ে নিয়ে আন্নাকে ধ্বংসে পাঠানো। আন্না যদি হন বিবাহবিচ্ছিন্ন নারী, তাহলে উনি জানতেন যে তিনি মিলিত হবেন ভ্রন্স্কির সাথে আর এ মিলন হবে অবৈধ, পাতক, কেননা গির্জার অনুশাসনে স্বামী জীবিত থাকতে দ্বিতীয় বিবহা হতে পারে না। ‘আন্না মিরিত হবে ওর সাথে আর বছর দুই বাদে হয় সে-ই তাকে ত্যাগ করবে, নয় আন্না নিজেই নতুন একটা সম্পর্ক পাতাবে, ভেবেছিলেন তিনি, ‘আর অবৈধ বিবাহবিচ্ছেদের রাজী হয়ে আমি তার ধ্বংসের জন্যে অপরাধী হব।’ তিনি শতেক বার এ নিয়ে ভেবেছেন এবং একেবারে নিশ্চিত হয়েছেন যে, শ্যালক যা বলেছেন বিবাহবিচ্ছেদটা মোটেই তেমন সহজ শুধু নয়, বরং একেবারে অসম্ভব। অব্লোন্স্কির একটা কথায়ও তাঁর বিশ্বাস ছিল না, সব কথায়ই তাঁর আপত্তি ছিল হাজারখানেক, কিন্তু কথাগুলো তিনি শুনলেন এটা অনুভব করে যে পরাক্রান্ত রূঢ় যে শক্তিটা তাঁর জীবনকে চালাচ্ছে, যার ইচ্ছা পালন করতে হতে হবে, তাঁকে, তাঁর কথায় সেই শক্তিই প্রতিফলিত হচ্ছে।
‘এখন শুধু প্রশ্ন হল : কিভাবে, কি শর্তে তুমি বিবাহবিচ্ছেদে সম্মত হবে। কিছুই সে চায় না, তোমাকে অনুরোধ করার সাহসও তার নেই। তোমার মহানুভবতার ওপর সবই সে ছেড়ে দিয়েছে।’
‘হায় আল্লাহ্! কিসের জন্যে?’ বিবাহবিচ্ছেদের যে আইন-কানুনে স্বামী দোষটা নিজের ঘাড়ে নেয় তা স্মরণ করে এবং ভ্রন্স্কি যেভাবে মুখ ঢেকেছিলেন, লজ্জায় সেই ভঙ্গিতে হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে মনে মনে ককিয়ে উঠলেন কারেনিন।
‘আমি বুঝতে পারছি, তুমি খুবই উতলা হয়ে আছ। কিন্তু যদি ভেবে দ্যাখো…’
কারেনিন মনে মনে ভাবলেন, ‘ডান গালে চপেটাঘাত খেলে বাঁ গাল পেতে দিয়ো; যে তোমার কাফতান দিয়েছে, তাকে কামিজটাও দিয়ে দাও।’
তাঁর খেঁকী গলায় উনি চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, আমি নিজেই কলংক নেব। ছেলেকে পর্যন্ত দিয়ে দেব, কিন্তু…বাদ দিলে হয় না এসব? তবে তুমি যা চাও, কর…’
তিনি ঘুরে গিয়ে জানালার কাছে একটা চেয়ারে বসলেন। যাতে শ্যালক তাঁর মুখ না দেখতে পান। তাঁর তিক্ত লাগছিল, তিনি লজ্জা পাচ্ছিলেন। কিন্তু এই তিক্ততা আর লজ্জার সাথে সাথে নিজের নতির মহত্ত্বে একটা আনন্দ আর কোমলতাও বোধ করছিলেন তিনি 1
বিচলিত হয়েছিলেন অবলোনস্কি। তিনি চুপ করে রইলেন।
তিনি বললেন, ‘আমাকে বিশ্বাস কর, কারেনিন। আন্না তোমার মহানুভবতার কদর করবে। তবে বোঝা যাচ্ছে, এটা সৃষ্টিকর্তারই ইচ্ছা!’ কথাটা বলেই টের পেলেন ওটা বোকামি হয়েছে। নিজের বোকামিতে অনেক কষ্টে হাসি চাপতে পারলেন।
কিছু-একটা জবাব দিতে যাচ্ছিলেন কারেনিন, কিন্তু চোখের পানিটা বাধা হয়ে দাঁড়াল।
অব্লোন্স্কি বললেন, ‘এটা একটা সর্বনাশা দুর্ভাগ্য, সেটা মেনে নিতে হবে। বাস্তব ঘটনা বলে এ দুর্ভাগ্যকে আমি মেনে নিচ্ছি এবং আমি চেষ্টা করছি তোমাকে আর ওকে সাহায্য করতে।’
তিনি যখন জামাতার ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন তখন ওঁর জন্য কষ্ট হচ্ছিল, কিন্তু কাজটা সাফল্যের সাথে করা গেছে বলে তুষ্টি লাভে তাতে তাঁর অসুবিধা হয়নি। কেননা তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, কারেনিন তাঁর কথা ফিরিয়ে নেবেন না। এই তুষ্টির সাথে মিশে ছিল তাঁর মনে উদিত আরো একটা চিন্তা; যথা : এ ব্যাপারটা চুকে গেলে তিনি স্ত্রী ও ঘনিষ্ঠদের এই প্রশ্ন করবেন : ‘আমার সাথে সম্রাটের পার্থক্য কি? সম্রাট বিবাহবিচ্ছেদ করে দেন, কিন্তু তাতে কারো কোন উপকার হয় না, আর আমি যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটালাম তাতে তিনজনেই স্বস্তি পেল…কিংবা : কিসে আমার আর সম্রাটের মধ্যে মিল? যখন…যাক গে, ভালো কিছু-একটা ভেবে দেখা যাবে’, তিনি হেসে নিজেকেই এসব কথা বললেন।
তেইশ
যদিও হৃৎপিণ্ডকে তা স্পর্শ করেনি তবুও ভ্রন্স্কির ক্ষতটা ছিল খুবই বিপজ্জনক। তিনি কয়েক দিন জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানে ছিলেন। তিনি যখন প্রথম কথা বলার মত অবস্থায় ফিরে আসেন, তখন ভ্রাতৃবধূ ভারিয়াই শুধু ঘরে ছিলেন। তিনি কঠোর দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘ভারিয়া! আমি আচমকাই নিজেকে গুলি করে ফেলেছিলাম। বড়ই বোকার মত কাজ করে ফেলেছি! দয়া করে আর এ নিয়ে কখনো কোন কথা বলো না, –এ কথাটা সবাইকেই বলে দেবে।’
