কারেনিন কোন উত্তর না দিয়ে পায়চারি থামালেন। কিন্তু তাঁর মুখে আত্মবলি মেনে নেবার একটা ভাব অভিভূত করল অব্লোন্স্কিকে।
তিনি তখনো তাঁর অনভ্যস্ত সংকোচের সাথে লড়তে লড়তে বললেন, ‘আমি চেয়েছিলাম, বোন সম্পর্কে, তোমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলব ভাবছিলাম।’
কারেনিন একটা বিষণ্ণ বাঁকা হাসি হাসলেন। তাকালেন শ্যালকের দিকে। কোন কথা না বলে তাঁকে টেবিলের কাছে শুরু করা একটা চিঠি টেনে নিয়ে দিলেন।
‘আমিও সব সময় সেই কথাই ভাবছি। এটা আমি লিখতে শুরু করেছিলাম এই কথা ভেবে যে বলার যা, সেটা লিখে বলাই ভালো, আমার উপস্থিতি ওকে উত্ত্যক্ত করে’, এই বলে তিনি দিলেন চিঠিটা।
চিঠিটা নিয়ে তাঁর প্রতি নিবদ্ধ নিষ্প্রভ চোখের দিকে হতবুদ্ধি বিস্ময়ে তাকিয়ে পড়তে শুরু করলেন অব্লোন্স্কি। ‘আমি দেখতে পাচ্ছি যে আমার উপস্থিতি আপনার কাছে পীড়াদায়ক। সেটা বিশ্বাস করা আমার পক্ষে যত কষ্টকরই হোক, ব্যাপারটা তা-ই, অন্য কিছু হতে পারবে না। আপনাকে কোন দোষ দিচ্ছি না আমি, সৃষ্টিকর্তা সাক্ষী যে আপনাকে রুগ্ন দেখে আমি সর্বান্তঃকরণে স্থির করেছিলাম আমাদের মধ্যে যা ঘটেছিল তা ভুলে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করব। যা আমি করেছি তার জন্য আক্ষেপ আমি করছি না, করবও না কখনও; শুধু একটাই আমার কামনা ছিল- আপনার কল্যাণ, আপনার অন্তরের কল্যাণ, এখন দেখছি সেটা সম্ভব হয়নি। আপনি নিজের বলুন কিসে আপনার সত্যিকারের সুখ, চিত্তের প্রশান্তি লাভ হতে পারে। আমি আপনার অভিলাষ, আপনার ন্যায়বোধের কাছে পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করছি।’
অব্লোন্স্কি চিঠিটা ফেরত দিয়ে একই রকম হতবুদ্ধিতায় তাকিয়ে রইলেন জাতামার দিকে, ভেবে পাচ্ছিলেন কি বলবেন। এই নীরবতা উভয়ের পক্ষেই এত অস্বস্তিকর হয়েছিল যে কারেনিনের দিক থেকে চোখ না সরিয়ে অব্লোন্স্কি যখন চুপ করে ছিলেন, তখন রুগ্নের মত ঠোঁট তাঁর কাঁপছিল।
কারেনিন মুখ ফিরিয়ে বললেন, ‘ওকে আমি এটাই বলতে চেয়েছিলাম।’
‘হুঁ. হুঁ…’, কান্নায় গলার মধ্যে একটা দলা পাকিয়ে ওঠায় কোন উত্তর দিতে পারলেন না অব্লোন্স্কি। অবশেষে বললেন, ‘হ্যাঁ, বুঝতে পারছি আপনাকে।’
কারেনিন বললেন, ‘আমি জানতে চাই, সে কি চায়!
‘আমার আংশকা, নিজের অবস্থাটা সে নিজেই বুঝতে পারছে না। বিচারক সে নয়’, সুস্থির হয়ে বললেন অলোক্কি, ‘অবদমিত সে, তোমার মহানুভবতায় সে অবদমিতই। এ চিঠি যদি সে পড়ে, কিছু বলার শক্তি থাকবে না তার, শুধু আরো নীচে মাথা নত করবে।’
‘তাহলে কি করা যায় এ অবস্থায়? কিভাবে বুঝিয়ে বলি…কি করে জানা যায় তার ইচ্ছে?’
‘আমার অভিমত জানতে যদি আপত্তি না থাকে, তাহলে বলব যে আমি মনে করি, এ অবস্থাটা ঢুকিয়ে দেবার জন্যে যা যা ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে তুমি মনে কর, সেটা সোজাসুজি বলা নির্ভর করছে তোমার ওপরেই।’
কারেনিন তাঁর কথায় বাধা দিয়ে বললেন, ‘তার মানে তোমার ধারণা যে অবস্থাটা ঢুকিয়ে দেয়া দরকার। কিন্তু কিভাবে?’ চোখের সামনে হাতের একটা অনভ্যস্ত ভঙ্গি করে তিনি যোগ করলেন, ‘উদ্ধারের কোন উপায় দেখতে পাচ্ছি না।’
অব্লোন্স্কি উঠে দাঁড়িয়ে চাঙ্গা হয়ে বললেন, ‘যে কোন অবস্থা থেকেই উদ্ধারের উপায় থাকে। এক সময় তুমি সব কিছু চুলোয় দিতে চেয়েছিলে…এখন যদি তোমার এই বিশ্বাস দৃঢ় হয় যে, পরস্পরের সুখ সম্ভব নয়…
‘নানাভাবেই সুখ কথাটা বোঝা চলে। কিন্তু ধরা যাক আমি সব কিছুতে রাজী, নিজে কিছু চাই না। সেক্ষেত্রে আমাদের অবস্থা থেকে উদ্ধারের উপায়টা কি হবে?’
‘আমার মত যদি জানতে চাও’, অব্লোন্স্কি বললেন সেই ভিজিয়ে দেওয়া মোলায়েম হাসি নিয়ে, যে হাসিতে কথা বলেছিলেন আন্নার সাথে। সহৃদয় হাসিটা এতই প্রত্যয়জনক যে নিজের দুর্বলতা অনুভব করে কারেনিন অজ্ঞাতসারে তাতে আত্মসমর্পণ করলেন, অব্লোন্স্কি যা বলবেন তাতে বিশ্বাস করতে তৈরি হয়ে গেলেন তিনি। ‘এটা সে বলবে না কখনো। কিন্তু শুধু একটা জিনিসই সম্ভব, একটা জিনিসই সে চাইতে পারে’, বলে গেলেন অব্লোন্স্কি, ‘এটা হল সম্পর্ক এবং তার সাথে জড়িত সমস্ত স্মৃতির অবসান। আমার মতে, তোমাদের অবস্থায় নতুন সম্পর্কের বোঝাবুঝি হওয়া দরকার। শুধু উভয় পক্ষের স্বাধীনতায় সে সম্পর্ক স্থাপন সম্ভব।
কারেনিন বিতৃষ্ণায় বাধা দিলেন, ‘বিবাহবিচ্ছেদ!’
অব্লোন্স্কি পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘যে স্বামী-স্ত্রী তোমাদের মত অবস্থায় পড়েছে, তাদের পক্ষে সব দিক দিয়ে এটাই সর্বোত্তম উপায়। কি করা যাবে যদি স্বামী-স্ত্রী দেখে যে একত্রে জীবনযাপন সম্ভব নয়? সেটা তো ঘটতে পারে সব সময়ই।’ কারেনিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বুজলেন। অব্লোন্স্কি সংকোচ ক্রমেই কাটিয়ে উঠতে উঠতে বললেন, ‘এক্ষেত্রে শুধু একটা কথা ভাবার আছে, স্বামী-স্ত্রীর কেউ একজন অন্য কাউকে বিবাহ করতে চায় কিনা। যদি না চায়, তাহলে ব্যাপারটা খুবই সহজ।’
কারেনিন ব্যাকুলতায় মুখ কুঁচকে নিজের মনে কি বিড়বিড় করলেন, কোন উত্তর দিলেন না। অবলোন্স্কির কাছে যেটা খুবই সহজ মনে হয়েছে, কারেনিন তা নিয়ে হাজার হাজার বার ভেবেছেন। আর এটা তাঁর মনে হয়েছিল শুধু খুব সহজ নয়, একেবারে অসম্ভব। বিবাহবিচ্ছেদের খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো এখন তাঁর জানা থাকার সেটা তাঁর কাছে অসম্ভব মনে হচ্ছিল। কারণ নিজের আত্মমর্যাদা আর ধর্মবোধে ব্যভিচারের মথ্যিা অভিযোগ তিনি নিজের কাঁধে নিতে পারেন না, আর যে স্ত্রীকে তিনি ক্ষমা করেছেন, ভালোবাসেন, তাঁকে লোকসমক্ষে অনাবৃত করে দেখানো, কলঙ্কিত করা তো আরো কম অনুমোদনীয়। আরো অন্যান্য গুরুতর কারণেও বিবাহবিচ্ছেদ অসম্ভব ঠেকেছিল।
