তিনি বলতে চেয়েছিলেন মরণ, কিন্তু অব্লোন্স্কি সেটা বলতে দিলেন না। বললেন, ‘তুমি রুগ্ন, উত্ত্যক্ত। বিশ্বাস কর, তুমি সব কিছু ভয়ংকর বাড়িয়ে বলছ। কিছুই ভয়াবহ নেই এ ব্যাপারে।’
অব্লোন্স্কি হাসলেন। তাঁর জায়গায় এ রকম নৈরাশ্যজনক ব্যাপারে জড়িত অন্য কেউ হলে হয়ত হাসতে পারত না (হাসিটা মনে হতে পারত নিষ্ঠুর), কিন্তু তাঁর হাসিটায় ছিল এত সহৃদয়তা, প্রায় নারীসুলভ কোমলতা যে আন্না আহত বোধ করলেন না, বরং নরম হলেন, শান্ত বোধ করলেন। তাঁর মৃদ্যু সান্ত্বনাদায়ক কথা আর হাসিতে বাদাম তেলের চেয়েও উকপার হল। অচিরেই আন্না অনুভব করলেন সেটা। বললেন, ‘না স্তিভা, আমার সর্বনাশ হয়েছে, সর্বনাশ হয়েছে! সর্বনাশের চেয়েও বেশি। এখনো সর্বনাশ হয়নি, বলতে পারছি না যে সব শেষ, বরং টের পাচ্ছি যে শেষ হয়নি, আমি যেন টানটান এক তন্ত্রী, যা শিগগিরই ছিঁড়ে যাবে। কিন্তু এখনো শেষ হয়নি, আর শেষটা ভয়ংকর…’
‘ও কিছু নয়, তন্ত্রীটাকে আস্তে আস্তে আলগা করে দিলেই হল, এমন কোন অবস্থা নেই যা থেকে উদ্ধারের পথ মিলবে না।’
‘আমি অনেক ভেবেছি। শুধু একটা…’
তাঁর ত্রস্ত দৃষ্টিপাত থেকে তিনি আবার বুঝতে পারলেন যে আন্নার মতে এই একটা উপায় হল মৃত্যু। সেটা তিনি তাঁকে বলতে দিলেন না। বললেন, ‘মোটেই না। শোন বলি, আমি যেভাবে দেখছি, তুমি তোমার অবস্থাটা দেখতে পারছ না সেভাবে। আমার খোলাখুলি মত তোমাকে বলি, শোনা’, আবার তিনি সন্তর্পণে হাসলেন তাঁর মোলায়েম হাসি, ‘গোড়া থেকে শুরু করি। তুমি যে লোকটাকে বিয়ে করেছ, সে তোমার চেয়ে বিশ বছরের বড়। বিয়ে করেছে না ভালোবেসে, অথবা ভালোবাসার স্বাদ না জেনে। ধর যাক, এটা ভুল হয়েছিল।’
‘সাংঘাতিক ভুল!’ বললেন আন্না।
‘কিন্তু আবার বলি, এটা একটা বাস্তব ঘটনা। তারপর, বলা যাক, নিজের স্বামীকে নয় অন্য লোককে ভালোবাসার দুর্ভাগ্য হয়েছে তোমার। এটা দুর্ভাগ্য; কিন্তু একটা ঘটে যাওয়া ব্যাপার। তোমার স্বামী এটা মেনে নিযে ক্ষমা করেছে। প্রতিটি বাক্যের পর আন্না আপিত্ত করবে এই ভেবে তিনি থামছিলেন, কিন্তু আন্না কিছুই বললেন না, ‘এই হল ব্যাপার। এখন প্রশ্নটা এই : স্বামীর সাথে তুমি থাকতে পারবে কি? সেটা কি তুমি চাও? ও কি তা চায়?’
‘কিছুই কিছুই জানি না আমি।’
‘কিন্তু তুমি নিজেই তো বললে যে ওকে সইতে পারো না।’
‘সে কথা আমি বলিনি। আমি তা অস্বীকার করছি। কিছুই আমি জানি না, কিছুই বুঝছি না।’
‘তা বেশ, তবে শোনো…’
‘তুমি বুঝতে পারছ না। আমি টের পাচ্ছি যে মুখ থুবড়ে পড়ছি কোন-এক অতল গহ্বরে, কিন্তু নিজেকে বাঁচানো আমার উচিত নয়। তা আমি পারি না।’
‘ভাবনা নেই, তোশক বিছিয়ে দিয়ে আমরা তোমাকে ধরে ফেলব। আমি বুঝতে পারছি তোমাকে, বুঝতে পারছি যে তোমার যেটা ইচ্ছে, যেটা অনুভূতি সেটা বলার মত জোর তুমি পাচ্ছ না।’
‘কিছুই কিছুই আমি চাই না…শুধু সব শেষ হয়ে গেলে বাঁচি।’
‘কিন্তু সেটা তো স্বামী দেখতে পাচ্ছে এবং জানে। এতে তোমার চেয়ে তার কষ্ট কম হচ্ছে বলে ভাবো কি? তুমিও কষ্ট পাচ্ছ, সেও কষ্ট পাচ্ছে, এ থেকে কি দাঁড়াতে পারে? অথচ বিবাহবিচ্ছেদ সব জট খুলে দেবে’, তাঁর এই মুখ্য কথাটা বলে পেলতে কম বেগ পেতে হয়নি অব্লোন্স্কিকে, অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তিনি চাইলেন আন্নার দিকে।
কোন জবাব দিলেন না আন্না, শুধু নেতিবাচক ভঙ্গিতে নাড়ালেন চুল-ছাঁটা মাথা। কিন্তু আন্নার মুখে হঠাৎ অতীত লাবণ্যের উদ্ভাস থেকে তিনি বুঝতে পারলেন যে আন্না এটা চাইছেন না কেবল এজন্য যে এটা একটা সম্ভাবনাহীন সৌভাগ্য বলে মনে হচ্ছে তাঁও।
‘ভয়ানক কষ্ট হচ্ছে তোমাদের জন্যে। ব্যাপারটা ঠিকঠাক করতে পারলে কি সুখীই না হতাম!’ অব্লোন্স্কি বললেন আরো সাহস নিয়ে হেসে, ‘কিছু বলো না, কিছু না! শুধু আমি যেভাবে অনুভব করছি সেভাবে বলতে যদি আমাকে দিতেন সৃষ্টিকর্তা। আমি যাচ্ছি ওর কাছে।’
আন্না চিন্তামগ্ন উজ্জ্বল চোখে তাঁর দিকে তাকালেন, তবে কিছু বললেন না।
বাইশ
অব্লোন্স্কি তেমনি একটা ভাব নিয়ে কারেনিনের স্টাডিতে গেলেন—নিজের দপ্তরে কর্তার চেয়ারে বসে যেমন ভারিক্কী ভাব হত। তিনি পিঠের পেছনে হাত দিয়ে ঘরে পায়চারি করছিলেন, তাঁর স্ত্রীর সাথে অব্লোন্স্কি যা নিয়ে কথা বলেছেন, তিনি সেই বিষয়েই ভাবছিলেন।
অবলোন্স্কি হঠাৎ তাঁর কাছে অনভ্যস্ত একটা বিব্রত ভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ব্যাঘাত করলাম না তো?’ এই বিব্রত ভাবটা গোপন করার জন্য নতুন ধরনের ঢাকনা দেওয়া সদ্যক্রীত সিগারেট কেসের চামড়া ওঁকে তিনি একটা সিগারেট বের করলেন।
কারেনিন অনিচ্ছাসহকারে জবাব দিলেন, ‘না। তোমার দরকার আছে কিছুর
অব্লোন্স্কি নিজের অনভ্যস্ত সঙ্কোচে নিজেই অবাক হয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি চাইছিলাম… আমার দরকার কিছু… হ্যাঁ, আমার কথা বলা দরকার।’
অনুভূতিটা এমন অপ্রত্যাশিত আর অদ্ভূত যে তাঁর বিশ্বাস হল না এটা তাঁর বিবেকের কণ্ঠস্বর, সেটা তাঁকে বলছে যে তিনি যা স্থির করেছেন সেটা খারাপ। যে ভীরুতা তাঁকে পেয়ে বসেছিলেন, নিজের ওপর জোর খাটিয়ে সেটার সাথে লড়লেন তিনি।
তিনি লাল হয়ে কারেনিনকে বললেন, ‘আশা করি তুমি বিশ্বাস কর যে, বোনকে আমি ভালোবাসি। আর তোমার প্রতি আমার সত্যিকারের আকর্ষণ ও শ্রদ্ধা আছে।’
