‘না, এভাবে চলতে পারে না’, স্ত্রীর কাছ থেকে চলে যেতে যেতে ভাবলেন কারেনিন।
সমাজের চোখে নিজের অবস্থার অসম্ভাবিতা, তাঁর প্রতি স্ত্রীর ঘৃণা এবং সাধারণভাবে যে রূঢ়, রহস্যময় শক্তি তাঁর আত্মিক প্রবণতা অগ্রাহ্য করে তাঁর জীবন চালাচ্ছে, তাঁর কাছ থেকে দাবি করছে আজ্ঞাপালন, স্ত্রীর সাথে তাঁর সম্পর্কের পরিবর্তন, সেটা আজকের মত এত স্পষ্টভাবে কখনো প্রতিভাত হয়নি তাঁর কাছে। তিনি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলেন যে গোটা জগৎ এবং স্ত্রী তাঁর কাছ থেকে কি যেন দাবি করছে, কিন্তু ঠিক কি সেটা বুঝতে পারছিলেন না তিনি। টের পাচ্ছিলেন যে এর ফলে প্রাণে তাঁর এমন একটা আক্রোশ জেগে উঠছে যা চুরমার করে দিচ্ছে তাঁর প্রশান্তি, তাঁর সব কিছু, মহত্ত্ব। তিনি ভেবেছিলেন ভ্রন্স্কির সাথে সম্পর্কচ্ছেদ ভালো হবে আন্নার পক্ষে, কিন্তু সবাই যদি সেটা অসম্ভব বলে গণ্য করে, তাহলে তিন সে সম্পর্কে নতুন করে অনুমোদনে রাজি, শুধু সন্তানদের কলঙ্কিত না করতে, তাদের না হারাতে, নিজের অবস্থা না বদরাতে পারলেই হল। এটা যতই বিছ্ছিরি হোক, যে বিচ্ছেদের আন্না একটা নিরুপায় অবস্থায় পড়বে এবং তিনি যা ভালোবাসেন তা সব কিছু হারাবেন, তার চেয়ে এটা যতই হোক ভালো। কিন্তু নিজেকে দুর্বল বোধ করছিলেন তিনি; আগে থেকেই তাঁর জানা ছিল যে সবাই তাঁর বিরুদ্ধে, এখন সেটা তাঁর কাছে স্বাভাবিক ও উত্তম মনে হচ্ছে, কেউ সেটা তাঁকে করতে দেবে না, তাঁকে বাধ্য করবে খারাপটা করতে যেটা তাদের মনে হচ্ছে কর্তব্য।
একুশ
বেত্সি হল ঘর থেকে বেরোতে-না-বেরোতেই দরজায় অব্লোন্স্কির সাথে দেখা। তিনি এলিসেয়েভ দোকান থেকে তাজা শামুক কিনে ফিরছেন। ‘ওহো, প্রিন্সেস! কি আনন্দ হল দেখা পেয়ে!’ তিনি বললেন, ‘আমি দিয়েছিলাম আপনাদের ওখানে।’
‘শুধু এক মিনিটের জন্যে’, দস্তানা পরতে পরতে হেসে বেত্সি বললেন, ‘কেননা আমি চলে যাচ্ছি।’
‘দস্তানা পরাটা রাখুন প্রিন্সেস, দিন আপনার করচুম্বন করতে। করচুম্বনের মত পুরানো আদব-কায়দার প্রত্যাবর্তনে আমি যতটা কৃতার্থ তা আর কিছুতে নয়।’ তিনি বেত্সির করচুম্বন করলেন, ‘কখন দেখা হবে?’
‘আপনি তার যোগ্য নন’, হেসে বললেন বেত্সি।
‘উঁহু, খুবই যোগ্য। কেননা আমি খুব গুরুত্বমনা লোক হয়ে উঠেছি। কেননা নিজের ব্যাপার-স্যাপার আমি গুছিয়ে আনছি শুধু তাই নয়, অন্যের পারিবারিক ব্যাপারও’, বললেন তিনি একটা অর্থপূর্ণ মুখভাব করে।
‘আহ্, খুবই আনন্দের কথা!’ উনি যে আন্নার কথা বলছেন সেটা তৎক্ষণাৎ অনুমান করে বেত্সি বললেন। হল ঘরে ফিরে এসে তাঁরা দাঁড়ালেন একটা কোণে। অর্থপূর্ণ ফিসফিসানিতে বেত্সি বললেন, ‘উনি ওকে মারছেন, মারছেন। এ ভাবা যয় না।…’
‘আমার খুবই ভালো লাগছে যে আপনিও তাই ভাবেন’, মুখে একটা গুরুতর মর্মবেদনা নিয়ে মাথা নেড়ে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘এই জন্যেই আমি এলাম পিটার্সবুর্গে।
বেত্সি বললেন, ‘সারা শহর এই নিয়ে বলাবলি করছে। এ অবস্থা কম্পনীয় নয়। আন্না কেবলই চেপে থাকছে। উনি বোঝেন না যে নিজের হৃদয়াবেগ নিয়ে যারা তামাশা করতে পারে না, আন্না তাদেরই একজন। দুয়ের একটা : হয় উনি ওকে সরিয়ে নিয়ে যান, দৃঢ়তা দেখান, নয় বিবাহবিচ্ছেদ। না হলে এটা তাকে গুমরে মারছে।’
‘ঠিক, ঠিক…’, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘সেজন্যেই আমি এসেছি। মানে ঠিক সে জন্যেই নয়…আমাকে দরবারের ওমরাহ করা হয়েছে, কৃতজ্ঞতা জানাতে হয় তো। কিন্তু বড় কথা, এ ব্যাপারটার বিধি-ব্যবস্থা করতে হয়।’
‘তা সৃষ্টিকর্তা আপনাকে সাহায্য করুন’, বললেন বেত্সি।
প্রিন্সেস বেত্সিকে অলিন্দ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে, দস্তানার ওপরে যেখানে স্পন্দিত হচ্ছিল নাড়ি সেখানে চুমু খেয়ে আর এমন একটা অশোভন মিছে কথা বলে যাতে বেত্সি ভেবে পাচ্ছিলেন না রাগ করবেন নাকি হাসবে, অবলোন্স্কি গেলেন বোনের কাছে। দেখলেন তাঁর চোখে পানি।
যে ফুর্তির মেজাজ নিয়ে অব্লোন্স্কি এসেছিলেন, তা সত্ত্বেও তখনই তিনি দরদী অনুবেদনার মত কাব্যিক একটা সুরে পৌঁছে গেলেন যা আন্নার মনোভাবের সাথে মেলে। জিজ্ঞেস করলেন কেমন সে আছে, কেমন কেটেছে সকালটা।
‘খুব, খুবই খারাপ। সারা দিনটা, সকালটাও, যত দিন গেছে, যা আসবে, সবই’, বললেন তিনি।
‘আমার মনে হচ্ছে তুমি বিষাদে গা ভাসাচ্ছ, গা ঝাড়া দিয়ে ওঠা দরকার। জীবনকে দেখা দরকার সোজাসুজি, সেটা কঠিন, কিন্তু…’
আমি শুনেছি মেয়েরা নাকি লোককে ভালোবাসা এমন কি তাদের পাপের জন্যেও’, হঠাৎ শুরু করলেন আন্না, ‘কিন্তু আমি তাকে দেখতে পারি না তার ধর্মাত্মাতার জন্যে। আমি থাকতে পারি না ওর সাথে। বুঝে দ্যাখো, ওর চেহারাটাই আমার একটা শারীরিক প্রতিক্রিয়া ঘটায়। পাগল করে দেয় আমাকে, ওর সাথে থাকতে আমি পারি না, পারি না। কি আমি করব? আমি ছিলাম অসুখী, ভাবতাম এর চেয়ে বেশি অসুখী হওয়া অসম্ভব, কিন্তু যে ভয়াবহ অবস্থায় আমি নিজেকে এখন দেখছি, সেটা কল্পনা করিনি। বিশ্বাস করবে কি, সহৃদয় চমৎকার মানুষ, আমি ওর কড়ে আঙুলেরও যোগ্য নেই তা জেনেও, আমি তাকে সইতে পারি না। তার মহানুভবতার জন্যেই আমি ঘৃণা করি তাকে আমার কিছুই বাকি নেই একটা জিনিস ছাড়া…’
