‘তুমি যে বললে, এটা নির্ভর করছে কারেনিনের ওপর’, সংশোধন করে দিলেন বেত্সি।
‘না, আমি তাঁর সাক্ষাৎ চাই না আর এটা…’ সহসা থেমে গিয়ে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তিনি তাকালেন স্বামীর দিকে (আন্নার দিকে তিনি চাইছিলেন না)। ‘মোট কথা, আমি চাই না…’
কারেনিন এগিয়ে এসে স্ত্রীর হাত ধরতে চাইছিলেন।
মোটা মোটা শিরায় ফোলা আর্দ্র যে হাতখানা যেখানে তাঁর হাত খুঁজতে চাইছিল প্রথমে সেখান থেকে আন্না হাত সরিয়ে নিয়েছিলেন; কিন্তু বোঝা গেল, নিজেরে ওপর জোর খাটিয়ে আন্না করমর্দন করলেন।
‘আমার ওপর আপনার আস্থার জন্যে আমি খুবই কৃতজ্ঞ, তবে…’ কারেনিন বললেন ব্রিত হয়ে, সখেদে এটা অনুভব করে যে তিনি নিজে যা একলা সহজে ও পরিষ্কার রূপে স্থির করতে পারেন, সেটা আলোচনা করতে পারেন না প্রিন্সেস ভেস্কায়ার সামনে, তাঁর কাছে তিনি সেই রূঢ় শক্তির প্রতিমূর্তি যা সমাজের সামনে তাঁর জীবনকে পরিচারিত করতে চায়, ব্যাঘাত ঘটায় ভালোবাসা ও ক্ষমায় তাঁর আত্মসমর্পণে। প্রিন্সেস ভেস্কয়ার দিকে তাকিয়ে তিনি থেমে গেলেন।
‘তাহলে চলি, আমার লক্ষ্ণীটি,-উঠে দাঁড়িয়ে বেত্সি বললেন আন্নাকে চুম, খেয়ে তিনি বেরিয়ে গেলেন, কারেনিন এগিয়ে দিলেন তাঁকে।
ছোট ড্রয়িং-রুমটায় থেমে আরো একবার সজোরে তাঁর করমর্দন করে বেত্সি বললেন, ‘কারেনিন! সত্যিকারের মহানুভব লোক বলে আমি আপনাকে জানি। আমি বাইরের লোক, কিন্তু আন্নাকে আমি ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি আপনাকে, তাই পরামর্শ দেবার স্পর্ধা করছি। ওকে গ্রহণ করুন। আলেক্সেই ভ্রন্স্কি সম্মান বোধের প্রতভূত্, তাশখন্দে চলে যাচ্ছে সে।’
‘আপনার সহানুভূতি আর পরামর্শের জন্যে ধন্যবাদ প্রিন্সেস। কিন্তু কাউকে গ্রহণ করা হবে কি হবে না, সেটা স্থির করবে স্ত্রী নিজে।’
এটা তিনি বললেন তাঁর অভ্যস্ত মর্যাদার ভাব নিয়ে, ভুরু ওপরে তুলে, কিন্তু তৎক্ষণাৎ মনে হল যে কথাই তিনি বলুন, তাঁর অবস্থার মর্যাদার কথাই উঠতে পারে না। এটা তিনি বুঝলেন তাঁর কথার পরে বেত্সির মুখে যে সংযত, ক্রুর, উপহাসের হাসি ফুটেছিল তা দেখা।
আন্না কারেনিনা – ৪.২০
বিশ
কারেনিন হল ঘরে বেত্সিকে অভিবাদন জানিয়ে স্ত্রীর কাছে ফিরে এলেন। আন্না শুয়ে ছিলেন, কিন্তু তাঁর পদশব্দ শুনে তাড়াতাড়ি উঠে বসলেন আগের ভঙ্গিতে, ভীত চোখে চাইলেন তাঁর দিকে। দেখতে পেলেন যে আন্না কাঁদছিলেন ‘আমার ওপর আস্থার জন্যে আমি তোমার প্রতি খুবই কৃতজ্ঞা’, গোবেচারার মত তিনি পুনরাবৃত্তি করলেন রুশীতে যা বেত্সির সামনে বলেছিলেন ফরাসিতে, বসলেন তাঁর কাছে। যখন তিনি রুশী ভাসায় বলেন এবং তাঁকে সম্বোধন করেন ‘তুমি’ বলে, তখন এই ‘তুমি’টা আন্নাকে অসহ্য জ্বালাতে। ‘আর তোমার সিদ্ধান্তের জন্যেও খুবই কৃতজ্ঞা। আমিও মনে করি, ও যখন চলেই যাচ্ছে, তখন কাউন্ট ভ্রন্স্কির এখানে আসার প্রয়োজন নেই কোন-ও। তবে…’
‘আমি যখন বলেছি, তখন কি দরকার তা আবার আওড়ে?’ এমন বিরক্তিতে আন্না তাঁকে থামিয়ে দিলেন যা তিনি দমন করে উঠতে পারেননি। ‘প্রয়োজন নেই কোন-ও’, আন্না ভাবলেন, ‘যে নারীকে সে ভালোবাসে, যার জন্যে সে মরণ চেয়েছিল, আত্মহত্যা করতে, যে নারী তাকে ছাড়া বাঁচতে পারে না, তার কাছে থেকে বিদায় নেবার কোনও- ও প্রয়োজন নেই!’ ঠোঁট চেপে আন্না তাঁর জ্বলজ্বলে চোখে তাকালেন তাঁর ফুলো ফুলো শিরায় ভরা হাতের দিকে, যা তিনি এক হাত দিয়ে অন্যটাকে ঘষছিলেন।
‘ও নিয়ে আর কোন কথা নয়’, আন্না যোগ করলেন খানিকটা শান্ত হয়ে।
‘প্রশ্নটায় সিদ্ধান্তের ভার আমি তোমাকে দিয়েছিলাম আর দেখে খুবই আনন্দ হচ্ছে যে…’ কারেনিন বলতে শুরু করেছিলেন।
‘আমার ইচ্ছা আপনার সাথে মিলে গেছে’, কথাটাকে দ্রুত শেষ করে দিলেন আন্না এই বিরক্তিতে যে উনি ধীরে ধীরে তাই বলছেন যা তিনি আগেই জানেন কি বললেন।
‘হ্যাঁ’, সমর্থন করলেন তিনি, ‘আর অতি কঠিন পারিবারিক ব্যাপারে নাক গলানো প্রিন্সেস ভেস্কায়ার পক্ষে একেবারেই অনুচিত। বিশেষ করে উনি…’
‘লোকে ওঁর সম্পর্কে যা বলে থাকে, তা কিছুই বিশ্বাস করি না আমি’, ঝট করে বললেন আন্না, ‘আমি জানি যে উনি আমাকে সত্যি করেই ভালোবাসেন।’
দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইলেন কারেনিন। উদ্বিগ্ন হয়ে আন্না নাড়াচাড়া করতে লাগলেন তাঁর ড্রেসিং গাউনের গুছি, তাঁর দিকে চাইছিলেন শারীরিক বিতৃষ্ণার একটা যন্ত্রণাকর অনুভূতি নিয়ে, যার জন্য নিজেকে তিনি তিরস্কৃত করলেও সেটা দমন করতে তিনি অক্ষম। এখন তাঁর শুধু একটাই কামনা-তাঁর বিরক্তিকর উপস্থিতি থেকে উদ্ধার পাওয়া।
‘আমি ডাক্তার ডাকতে পাঠিয়েছি’, বললেন কারেনিন।
‘আমি তো সুস্থ; ডাক্তার আমার কি দরকার?’
‘না, তোমার জন্যে নয়, বাচ্চাটা কাঁদছে। শুনছি স্তন্যদাত্রীর দুধ নাকি কম।’
‘যখন এ নিয়ে মিনতি করেছিলাম, তখন কেন খাওয়াতে দাওনি আমাকে? যাক-গে’ (কারেনিন বুঝলেন এই ‘যাক-গে’ কথাটার মানে কি) ‘বাচ্চাটাকে মারা হচ্ছে’ ঘণ্টি দিয়ে আন্না শিশুটিকে আনতে বললেন। ‘আমি ওকে খাওয়াতে চেয়েছিলাম, দেওয়া হল না। এখন দোষী বলে ধরা ধরছি না। … ‘
‘না, ধরছেন! সৃষ্টিকর্তা, কেন মরলাম না!’ ডুকরে কেঁদে উঠলেন তিনি, ‘মাপ করো আমাকে, স্নায়ু আমার বিকল, অন্যায় করেছি’, সংযত হয়ে বললেন তিনি, ‘কিন্তু চলে যাও… ‘
