‘এখনো ভালো বোধ করছে না?’ জিজ্ঞেস করলেন কারেনিন।
‘বড্ড অস্থির’, ফিসফিসিয়ে আয়া বলল।
‘মিস এডওয়ার্ড বলছেন যে স্তন্যদাত্রীর বুকে হয়ত দুধ নেই’, উনি বললেন।
‘আমার নিজেরও তাই মনে হয় কারেনিন।
‘তাহলে সেটা বলছেন না কেন?’
‘কাকে বলব? আন্না আর্কাদিয়েভনা এখনো অসুস্থ’, অসন্তোষের সাথে আয়া বলল।
আয়া বাড়ির পুরানো দাসী। তার এই সাদাসিধে কথায় কারেনিনের মনে হল তাঁর অবস্থার প্রতি একটা ইঙ্গিত রয়েছে যেন।
মেয়েটা চেঁচাতে লাগল আরো জোরে এবং ভাঙা গলায়। আয়া বিরক্তির ভঙ্গি করে এগিয়ে গেল এবং স্তন্যদাত্রীর কাছ থেকে তাকে নিয়ে দোলাতে দোলাতে পায়চারি করতে লাগল।
‘স্তন্যদাত্রীকে পরীক্ষা করে দেখার জন্যে ডাক্তারকে বলতে হয়’, কারেনিন বললেন দেখতে হৃষ্টপুষ্ট এবং সাজগোজ করা স্তন্যদাত্রী ভয় পেয়ে গেল যে তাকে ছাড়িয়ে দেওয়া হবে, আপনমনে বিড়বিড় করে তার বিপুল স্তন ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়ে যারা তার দুগ্ধ প্রাচুর্যে সন্দেহ করতে পারে তাদের উদ্দেশ্যে হাসল অবজ্ঞাভরে। সে হাসিতেও কারেনিন দেখলেন তাঁর অবস্থার প্রতি ইঙ্গিত।
‘বেচারা খুকি!’ কারেনিন, বিষণ্ণ যন্ত্রণার্ত মুখে তাকিয়ে রইলেন সামনে-পিছে পায়চারি করা আয়ার দিকে। শেষ পর্যন্ত শান্ত হয়ে আসা শিশুটিকে যখন তার গভীর শয্যায় শুইয়ে দিয়ে বালিশ ঠিকঠাক করে আয়া সরে গেল, কারেনিন উঠলেন এবং কষ্টে পা টিপে টিপে গেলেন তার কাছে। একই রকম বিষণ্ন মুখে তিনি মিনিটখানে চেয়ে দেখলেন শিশুটিকে, কিন্তু হঠাৎ তাঁর চুল আর কপালের চামড়া নড়িয়ে দিয়ে একটা হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে। একই রকম চুপচাপ তিনি বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।
ডাইনিং-রুমে গিয়ে তিনি ঘণ্টি দিলেন, চাকর ভেতরে আসতে আবার তাসে যেতে বললেন ডাক্তারের কাছে। সুন্দর এই শিশুটির জন্য স্ত্রীর কোন উদ্বেগ নেই বলে তিনি বিরক্তি বোধ করছিলেন স্ত্রীর উপর আর এই বিরক্তির মেজাজে তাঁর কাছে যাবার ইচ্ছে হচ্ছিল না, প্রিন্সেস বেত্সিকে দেখারও ইচ্ছে ছিল না তাঁর; কিন্তু সচরাচরের মেত যে তাঁর কাছে গেলেন না, এতে স্ত্রী অবাক হতে পারেন, তাই নিজের ওপর জোর খাটিয়ে তিনি গেলেন শোবার ঘরে। নরম গালিচার ওপর দিয়ে দরজার কাছে গিয়ে তিনি অজ্ঞাতসারে যে কথাবার্তাটা শুনলেন তা শোনার ইচ্ছে ছিল না তাঁর।
বেত্সি বললেন, ‘ও যদি না চলে যেত, আমি আপনার এবং ওরও আপত্তিটা বুঝতে পারতাম। কিন্তু আপনার স্বামীর থাকা উচিত এর ঊর্ধ্বে।
‘স্বামীর জন্যে নয়, নিজের জন্যে আমি এটা চাই না। ও কথা থাক!’ শোনা গেল আন্নার উত্তেজিত গলা। ‘কিন্তু যে লোকটা আপনার জন্যে নিজেকে গুলি করল তার কাছ থেকে বিদায় নিতে আপত্তি করতে তো আপনি পারেন না…’
‘এই জন্যেই আমি চাই না।
ভীত ও দোষী দোষী ভাব নিয়ে আলেকসেই অলেক্সান্দ্রভিচের ইচ্ছে হয়েছিল অলক্ষ্যে চলে যাবেন। কিন্তু ভেবে দেখলেন সেটা অমর্যাদাকার হবে, তাই আবার ঘুরে এবং কেশে শোবার ঘরের কাছে এলেন। কণ্ঠস্বরগুলো থেমে যেতে তিনি ঢুকলেন ভেতরে
আন্নার পরনে ধূসর ড্রেসিং গাউন, গোল মাথা জুড়ে ঘন বুরুশের মত কালো ছাঁটা চুল, বসেছিলেন সোফায়। বরাবরের মত স্বামীকে দেখা মাত্র তাঁর সঞ্জীবিত মুখভাব হঠাৎ মিলিয়ে গেল; মাথা নিচু করে অস্বস্তিভরে তিনি চাইলেন বেত্সির দিকে। চূড়ান্তা রকমের হাল ফ্যাশনের সাজ বেত্সির, বাতির ওপর ঢাকনার মত মাথার ওপরে কোথায় যেন ভেসে আছে টুপিটা, ঘূঘূরঙা গাউনের ওপর তীক্ষ্ণ তীর্যক ডোরাগুলো এক প্রান্তে উঠে গেছে ব্লাউজে, অন্য প্রান্তে নেমেছে স্কার্টে, চ্যাপ্টা উঁচু দেহকাণ্ড খাড়া রেখে তিনি বসে ছিলেন আন্নার পাশে। মাথা হেলিয়ে তিনি কারেনিনকে স্বাগত করলেন ঈষৎ ঠাট্টার হাসি হেসে।
‘আরে!’ যেন অবাক হয়ে তিনি বললেন, ‘বড়ই খুশি হলাম আপনাকে বাড়িতে পেয়ে। কোথাও দর্শন দেন না আপনি, আন্নার অসুখের সময় থেকে আপনাকে আমি দেখি নি। সব শুনেছি আমি-আপনার যত্নের কথা। সত্যি, আপনি আশ্চর্য স্বামী!’ উনি বললেন একটা অর্থপূর্ণ স্নেহময় ভাব করে যেন স্ত্রীর সাথে তাঁর আচরণের জন্য মহানুভবতার অর্ডার অর্পণ করছেন।
কারেনিন নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে অভিবাদন করল, স্ত্রীর হাত চুম্বন করে জিজ্ঞেস করলেন কেমন আছেন তিনি। ‘মনে হয় ভালোর দিকে’, স্বামীর দৃষ্টি এড়িয়ে আন্না বললেন।
‘কিন্তু তোমার মুখের রঙটা জ্বরতপ্তের মত’, উনি বললেন ‘জ্বরতপ্ত’ শব্দটায় জোর দিয়ে।
‘ওঁর সাথে আমি কথা বলেছি বড় বেশি’, বেত্সি বললেন ‘বুঝতে পারছি এটা আমার পক্ষে একটা স্বার্থপরতা, তাই আমি চলি।’
উনি উঠে দাঁড়ালেন, কিন্তু আন্না লাল হয়ে তাঁর হাত টেনে ধরলেন।
‘না-না, দয়া করে থাকুন। আপনাকে আমার বলা দরকার …না, আপনাকে’, কারেনিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, গাল আর কপাল তাঁর লালিমায় ঢেকে গেল; ‘আপনার কাছ থেকে আমি কিছুই লুকিয়ে রাখতে চাই না, পারি না’, বললেন তিনি।
কারেনিন মাথা নিচু করে আঙুল মটকালেন।
‘বেত্সি বলছিলেন যে তাশখন্দে যাবার আগে বিদায় নেবার জন্যে কাউন্ট ভ্রন্স্কি আমাদের এখানে আসতে চান’, স্বামীর দিকে না তাকিয়ে তাঁর যা বলবার সেটা যত কষ্টকরই হোক তাড়াতাড়ি বলে ফেলতে চাইছিলেন তিনি, ‘আমি বলেছি যে তাঁকে আমি অভ্যর্থনা করতে পারব না।’
