স্ত্রীকে ক্ষমা করলেন তিনি, তাঁর কষ্ট আর অনুতাপের জন্য মায়া হচ্ছিল তাঁর। ভ্রন্স্কিকে তিনি ক্ষমা করলেন, তাঁর জন্যও কষ্ট হচ্ছিল, বিশেষ করে যখন তাঁর মরিয়া কাণ্ডটার খবর তাঁ কানে আসে, তার পর থেকে। আগের চেয়েও ছেলের জন্য তাঁর কষ্ট হচ্ছিল বেশি, তার দিকে বড় বেশি কম দৃষ্টি দিয়েছেন বলে এখন নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু নবজাত খুকিটির জন্য শুধু মায়া নয়, স্নেহেরও একটা বিশেষ অনুভূতি হত তাঁর। যে অবলা নবজাত খুকিটি তাঁ মেয়ে নয়, মায়ের অসুখের সময় যে পরিত্যক্ত হয়, তিনি যত্ন না নিলে যে সম্ভবত মারাই পড়ত, তার প্রতি কেবল একটা সমবেদনাবশেই প্রথমটা চালিত হয়েছিলেন, তারপর নিজেই খেয়াল করেননি কেমন তাকে ভালোবেসে ফেলেছেন তিনি। দিনে বারকয়েক করে তিনি যেতেন শিশুকক্ষে, অনেকক্ষণ ধরে বসে থাকতেন, তাঁর সামনে স্তন্যদাত্রী ও আয়া প্রথমদিকটা সংকোচ বোধ করলেও পরে অভ্যস্ত হয়ে যায়। কখনো কখনো তিনি আধঘণ্টা ধরে খুকিটির জাফরানী-রাঙা, ফুলোফুলো, কোঁকড়ানো ঘুমন্ত মুখখানা দেখতেন চেয়ে চেয়ে, লক্ষ্য করতেন কিভাবে সে কোঁচকাচ্ছে কপাল, আঙুল-গুটানো ফুলোফুলো হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে রগড়াচ্ছে চোখ আর নাক। বিশেষ করে এসব মুহূর্তে তিনি বড় একটা প্রশান্তি পেতেন, তুষ্ট বোধ করতেন নিজেকে নিয়ে, নিজের অবস্থায় অসাধারণ কিছু, যা বদলানো দরকার এমন কিছুই তিনি দেখতে পেতেন না।
কিন্তু যত দিন যেতে লাগল, ততই পরিষ্কার করে তিনি দেখতে পেলেন তাঁর কাছে তাঁর অবস্থাটা এখন যতই স্বাভাবিত লাগুক, তাতে টিকে যাওয়া তাঁর সম্ভব হবেনা। তিনি অনুভব করলেন যে তাঁর প্রাণকে চালাচ্ছে যে কল্যাণী আত্মিক শক্তি তা চাড়াও আছে আরো একটা রূঢ়, সমান অথবা বেশি আধিপত্যকারী শক্তি, যা চালাচ্ছে তাঁর জীবন আর যে নিরুপদ্রব প্রশান্তি তিনি, চান, এ শক্তিটা তা তাঁকে দেবে না। তিনি অনুভব করতেন যে সবাই তাঁর দিকে তাকাচ্ছে একটা সপ্রশ্ন বিস্ময় নিয়ে, তারা তাঁকে বুঝতে পারছে না, কি যেন আশা করছে তাঁর কাছ থেকে। বিশেষ করে স্ত্রীর সাথে তাঁর সম্পর্কের অস্থিতিশীলতা ও অস্বাভাবিকতা অনুভব করছিলেন তিনি।
মৃত্যুর সান্নিধ্যে আন্নার মধ্যে যে কোমলতা জেগেছিল, সেটা কেটে যেতে কারেনিনের নজরে পড়তে লাগল যে আন্না ভয় পায় তাঁকে, ক্লিষ্ট বোধ করে, সোজাসুজি তাকাতে পারেনা তাঁর দিকে। আন্না কি যেন একটা তাঁকে বলতে চাইছেন কিন্তু সাহস পাচ্ছেন না, তাঁদের সম্পর্ক যে এভাবে চলতে পারে না, তিনিও যেন সেটা অনুভব করে কি যেন আশা করছেন কারেনিনের কাছ থেকে।
আন্নার নবজাত কন্যারও নাম দেওয়া হয়েছিল আন্না। ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে সে অসুখে পড়ে। সকালে শিশুকক্ষে গিয়ে ডাক্তার ডাকার জন্য লোক পাঠাবার হুকুম দিয়ে কারেনিন চলে যান মন্ত্রীদপ্তরে। নিজের কাজকর্ম সেরে তিনি বাড়ি ফেরেন বেলা তিনটার পর। প্রবেশ-কক্ষে ঢুকে তিনি জুড়িদার পোশাক আর ভালুকের চামড়ার ক্যাপ পরিহিত একটি সুপুরুষ ভৃত্যকে দেখতে পেলেন, আমেরিকান কুকুরের সাদা ফারকোট হাতে সে দাঁড়িয়ে আছে
জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে এখানে?’
‘প্রিন্সেস এলিজাভেতা ফিওদরোভনা ভেস্কায়া’, কারেনিনের মনে হল, জবাবটা সে দিল হেসে।
কারেনিন লক্ষ্য করেছিলেন যে, দুঃসময়ের এই গোটা কালটা উচ্চ সমাজে তাঁর পরিচিতরা, বিশেষ করে মহিলারা তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর প্রতি একটা বিশেষ রকমের সহানুভূতি পোষণ করে এসেছেন। এই পরিচিতদের সবার মধ্যে তিনি দেখেছেন প্রায় অগোপন কি-একটা আনন্দ, ঠিক সেইরকম একটা আনন্দ যা তিনি দেখেছিলেন অ্যাডভোকেটের চোখে আর এখন দেখলেন ভৃত্যটির চোখেও। সবাই যেন উল্লসিত, যেন বিয়ে দেওয়া হচ্ছে কারো। দেখা হলে তারা তাঁর স্ত্রীর কুশল সংবাদ জিজ্ঞেস করত এমন একটা পুলকে যা বড় একটা চাপা থাকত না।
প্রিন্সেস সেস্কয়ার সাথে যে স্মৃতি জড়িত এবং সাধারণভাবেই তিনি যে তাঁকে পছন্দ করতেন না, এই উভয় কারণেই তাঁর উপস্থিতিতে অসন্তুষ্ট বোধ করে কারেনিন সোজা চলে গেলেন শিশুকক্ষে প্রথম কক্ষটায় সেরিওজা টেবিলে বুক পেতে চেয়ারে পা তুলে দিয়ে কি-একটা আঁকছিল আর ফুর্তিতে বকবক করছিল। আন্নার অসুখের সময় ফরাসিনীর বদলে যে ইংরেজ গৃহশিক্ষিকাকে নেওয়া হয়েছিল, সে উল বুনছিল ছেলেটির কাছে বসে। কারেনিনকে দেখে সে উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন করে সেরিওজার আস্তিনে টান দিল।
ছেলের চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন কারেনিন, স্ত্রী কেমন আছেন, গৃহশিক্ষিকার এই প্রশ্নের জবাব দিয়ে নিজে জিজ্ঞেস করলেন খুকিটি সম্পর্কে কি বললেন ডাক্তার।
‘ডাক্তার বলেছেন, ভয়ের কিছু নেই স্যার, গোসলের ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন ‘
‘কিন্তু এখনো তো কষ্ট পাচ্ছে’, পাশের ঘরে বাচ্চাটার কান্না শুনে কারেনিন বললেন।
‘আমার মনে হয় স্তন্যদ্যত্রীটিকে দিয়ে চলবে না স্যার’, দৃঢ়ভাবে বলল ইংরেজ গৃহশিক্ষিকা
‘তা কেন ভাবছেন?’ থেমে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন উনি।
‘কাউন্টেস পলের ওখানেও এরকম হয়েছিল স্যার। শিশুটির চিকিৎসা চলল অথচ দেখা গেল সে নেহাৎ উপোস; স্তন্যদাত্রীর দুধ ছিল না স্যার।’
ভাবনায় পড়লেন কারেনিন, দুয়েক সেকেণ্ড দাঁড়িয়ে গেলেন অন্য দরজাটার দিকে। খুকিটি মাথার উল্টো দিকে ভর দিয়ে শুয়ে ছিল, আঁকুপাঁকু করছিল স্তন্যদাত্রীর কোলে যে, পুরুষ্টু স্তন তাকে দেওয়া হচ্ছিল তা নিতে চাইছিল না, তার ওপর নুয়ে স্তন্যদাত্রী আর আয়া উভয়েই শি-শি শব্দ করে তাকে শান্ত করার চেষ্টা করা সত্ত্বেও চিল্লানি থামাচ্ছিল না কিছুতেই।
