শুয়েই রইলেন তিনি, চেষ্টা করলেন ঘুমাতে যদিও বুঝতে পারছিলেন তার সামান্যতম আশাও নেই, আর নতুন ছবির উদয় ঠেকাবার জন্য মনে যে কোন একটা চিন্তার আকস্মিক দু’একটা শব্দ ফিসফিস করতে লাগলেন। কান পেতে থেকে তিনি শুনলেন অদ্ভুত, উন্মাদ একটা ফিসফিসানিতে একই কথার পুনরাবৃত্তি : ‘কদর করতে পারেনি, কাজে লাগাতে পারি না; কদর করতে পারেনি, কাজে লাগাতে পারিনি।’
তিনি মনে মনে ভাবলেন, ‘কি ব্যাপার? নাকি পাগল হয়ে যাচ্ছি আমি? সম্ভবত। কেন লোকে পাগল হয়, কেন গুলি করে নিজেকে?’ নিজেই নিজেকে জবাব দিয়ে চোখ মেলতেই অবাক হয়ে দেখলেন মাথার কাছে ভ্রাতৃবধূ ভারিয়ার এম্ব্রয়ডারি করা নকশি বালিশ। বালিশের ঝালরটা নেড়ে তিনি ভাবতে চেষ্টা করলেন ভারিয়ার কথা, কবে তাঁকে তিনি দেখেছেন শেষ বার। কিন্তু দূরের কোন ব্যাপার নিয়ে ভাবতে যাওয়া কষ্টকর। ‘না, ঘুমাতে হবে!’ বালিশটা তিনি টেনে এনে মাথায় গুঁজলেন, কিন্তু চোখ বন্ধ রাখার জন্য জোর করতে হচ্ছি। ধড়মড়িয়ে উঠে বসলেন তিনি। ভাবলেন, ‘আমার পক্ষে ওটা চুকে গেছে। ভাবতে হবে কি করা যায়। কি বাকি রইল?’ আন্নার প্রতি তাঁর ভালোবাসা বাদ দিয়ে তাঁর যে জীবন, দ্রুত তার ওপর চোখ বুলিয়ে নিলেন তিনি।
‘উচ্চাকাঙ্ক্ষা? সেপুখোভস্কয়? উচ্চ সমাজ? রাজদরবার?’ কোনটাতেই চিন্তা তাঁর স্থির হতে পারছিল না। এ সবেরই কিছু অর্থ ছিল আগে, কিন্তু এখন নেই। সোফা থেকে উঠলেন তিনি, ফ্রক-কোট খুলে ফেলে বেল্ট খসিয়ে, ভালো করে নিঃশ্বাস নেবার জন্য রোমশ বুক উন্মুক্ত করে তিনি পায়চারি করতে লাগলেন কামরায়। এভাবেই পাগল হয়ে যায় লোকে’,. পুনরাবৃত্তি করলেন তিনি, ‘এভাবেই নিজেকে গুলি করে…যাতে লজ্জা বোধ করতে না হয়’, ধীরে ধীরে যোগ দিলেন।
দরজার কাছে গিয়ে তিনি তা বন্ধ করে দিলেন; তারপর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁত চেপে তিনি গেলেন টেবিলের কাছে, রিভলবার বের করে সেটাকে চেয়ে দেখলেন, গুলিভরা রিভলবারটা ফেরালেন নিজের দিকে এবং ভাবতে লাগলেন। বিভলবার হাতে নিশ্চল হয়ে তিনি মাথা নিচু করে একটা তীব্র মুখভাব নিয়ে চিন্তা করলেন মিনিট দুয়েক ‘বটেই তো’, নিজেকে বললেন তিনি যেন যুক্তি-পরস্পরাগত, দীর্ঘায়ত ও পরিষ্কার একটা চিন্তাধারা তাঁকে নিয়ে এসেছে সন্দেহাতীত সিদ্ধান্তে। তাঁর কাছে প্রত্যয়জনক এই ‘বটেই তো’, টা আসলে এই সময়টায় সেই একই যেসব স্মৃতি ও ছবি বারবার ভেসে উঠেছে তাঁর মনে, তার পুনরাবৃত্তির ফল। চিরকালের জন্য হারানো সেই একই সুখস্মৃতি, ভবিষ্যৎ জীবনের অর্থহীনতার সেই একই ধারণা, নিজের হীনতার সেই একই চেতনা। এসব ধারণা ও অনুভূতির পারম্পর্য ও সেই একই।
স্মৃতি ও ভাবনার সেই একই দুষ্ট চক্রে আবার যখন তাঁর মন ঘুরছে তৃতীয় বার তখন আবার পূনরাবৃত্তি করলেন তিনি, ‘বটেই তো’, এবং বুকের বাঁ দিকে রিভলবার ঠেকিয়ে প্রচণ্ড কম্পমান হাত হঠাৎ যেন মুঠো করে ঘোড়া টিপলেন। গুলির শব্দ তিনি শুনতে পাননি, কিন্তু বুকে ভয়ানক একটা ঘা খেয়ে পড়ে গেলেন তিনি। টেবিলের কিনারাটা তিনি ধরতে গিয়েছিলেন, রিভলবারটা খসে পড়ল আর তিনি টলে উঠে বসে পড়লেন মেঝেয়, অবাক হয়ে দেখতে লাগলেন চারদিক। নিচু থেকে টেবিলের বাঁকা পায়া, বাজে কাগজের ঝুড়ি, বাঘের চামড়া দেখে নিজের ঘরখানাকে তিনি চিনতে পারছিলেন না। ড্রয়িং-রুম দিয়ে ছুটে আসা চাকরের ক্যাককেঁচে দ্রুত পদশব্দে সম্বিৎ ফিরল তাঁর। জোর করে ভেবে ভেবে তিনি বুঝলেন যে তিনি মেঝেয় পড়ে আছেন এবং বাঘের চামড়ায় আর হাতে রক্ত দেখে টের পেলেন যে তিনি গুলি করেছেন নিজেকে 1
‘যাঃ! ফসকে গেছে!’ বিভলবারটার জন্য মেজে হাতড়াতে হাতড়াতে তিনি বললেন। রিভলবার ছিল তাঁর কাছেই, কিন্তু তিনি খুঁজছিলেন আরো দূরে। খুঁজতে খুঁজতে তিনি অন্য দিকে ঝুঁকলেন আর ভারসাম্য রাখতে না পেরে পড়ে গেলেন রক্ত ঝরাতে ঝরাতে।
জুলপিওয়ালা সভ্যভব্য যে চাকরটা একাধিকবার তার স্নায়ুদৌর্বল্যের অনুযোগ করেছে পরিচিতদের কাছে, মনিবকে মেঝেয় পড়ে থাকতে দেখে সে এতই ভয় পেয়ে গেল যে রক্ত নিঃসরণের জন্য তাঁকে ফেলে রেখে ছুটল লোক ডাকতে। এক ঘণ্টা পরে ভ্রাতৃবধূ ভারিয়া এলেন তিনজন ডাক্তার নিয়ে। এঁদের জন্য চতুর্দিকে লোক পাঠিয়েছিল সে আর এলেন তাঁরা একই সময়ে। আহতকে বিছানায় শুইয়ে ভারিয়া তাঁর সেবায় রইলেন।
উনিশ
কারেনিন স্ত্রীর সাথে সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত হবার সময় একটা ভুল করেছিলেন : এমন সম্ভাবনা তিনি ভেবে দেখেননি যে স্ত্রীর অনুতাপ হবে আন্তরিক; তিনি তাঁকে ক্ষমা করবেন এবং সে মারা যাবে না। মস্কো থেকে ফেরার দু’মাস পরে এই ভুলটা তার সমস্ত প্রবলতায় প্রকট হয়ে উঠল তাঁর কাছে। কিন্তু ভুলটা তিনি করেছিলেন শুধু এই থেকে নয় যে সম্ভাবনাটা তিনি ভেবে দেখেননি, এজন্যও যে মুমূর্ষু স্ত্রী সাথে সাক্ষাতের এই দিনটার আগে পর্যন্ত নিজের হৃদয়কে তিনি জানতেন না। রুগ্না স্ত্রীর শয্যাপার্শ্বে তিনি জীবনে প্রথম একটা মর্মস্পর্শী সমবেদনার কাছে আত্মসমর্পণ করেন। পরের কষ্ট দেখলে এই অনুভূতিটা তাঁর হত আর এটাকে একটা ক্ষতিকর দুর্বলতা জ্ঞান করে আগে লজ্জা হত তাঁর; স্ত্রীর প্রতি অনুকম্পা, তাঁর মৃত্যুকামনা করেছিলেন বলে নিজের অনুশোচনা আর বড় কথা, ক্ষমার আনন্দটা থেকেই তিনি হঠাৎ অনুভব করেছিলেন যে তাঁর মর্মযন্ত্রণা জুড়িয়ে যাবে শুধু নয়, এমন একটা শান্তিও পেলেন যা আগে কখনো পাননি। হঠাৎ তিনি অনুভব করলেন, যা ছিল তাঁর যন্ত্রণার উৎস সেটাই হয়ে দাঁড়াল তাঁর প্রাণানন্দের উৎস, যখন তিনি ধিক্কার দিয়েছেন, ভর্ৎসনা করেছেন, ঘৃণা করেছেন তখন যেটা মনে হয়েছিল সমাধানহীন, ক্ষমা করা আর ভালোবাসার সাথে সাথে তা হয়ে উঠল সহজ আর পরিষ্কার।
