অবলোনস্কি বললেন, তা কি আর করা যাবে, দুনিয়াটাই যে অমনি ধারায় গড়া।
‘শুধু একটা সান্ত্বনা ওই প্রার্থনাটা যা সবসময় আমার ভালো লাগতো–আমাকে ক্ষমা কর আমার পুণ্যকর্মের জন্য নয়, তোমার অনুকম্পাভরে। শুধু এভাবেই সে ক্ষমা করতে পারে।
এগারো
লেভিন তার পানপাত্রটা খালি করে ফেললেন, তারপর দুজন চুপচাপ বসে রইলেন।
লেভিনকে অবলোনস্কি জিজ্ঞেস করলেন, একটা কথা তোমাকে আমার বলা দরকার। ভ্রনস্কিকে চেনো তুমি?
না, চিনি না। কিন্তু কেন?
‘আরেকটা আনো’, অবলোনস্কি বললেন তাতারকে। পানপাত্র ভরে দিচ্ছিল সে, আর ওঁদের কাছে ঘুরঘুর করছিল ঠিক যে সময়টিতে তার দরকার থাকত না।
‘ভ্রনস্কিকে আমার জানতে হবে কেন?
‘জানতে হবে, কেননা সে তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন।
‘কে এই ভ্রনস্কি জিজ্ঞেস করলেন লেভিন, এই কিছুক্ষণ আগেও তাঁর যে শিশুসুলভ উল্লসিত মুখভাব অবলোনস্কিকে মুগ্ধ করেছিল হঠাৎ তা হয়ে উঠল রাগত আর অপ্রীতিকর।
‘ভ্রনস্কি হলেন কাউন্ট কিরিল ইভানোভিচ ভ্রনস্কির এক ছেলে এবং পিটার্সবুর্গের গিল্টি-করা যুবসমাজের শ্রেষ্ঠ নির্দশন একটা। ভেরে যখন কাজ করতাম, তখন চিনতাম তাকে। সৈন্য রিক্রুটিঙের ব্যাপারে তিনি এসেছিলেন সেখানে। সাঙ্ঘাতিক ধনী, সুপুরুষ, বিস্তৃত যোগাযোগ, এইডডেকং, সেইসাথে ভারি মোলায়েম, চমৎকার লোক। না, নেহাৎ একজন চমৎকার লোকের চেয়েও বেশি। এখানে যখন আমি ওঁকে দেখলাম, তখন তিনি যেমন সুশিক্ষিত, তেমনি বুদ্ধিমান; এ লোক অনেক দূর যাবে।
লেভিন ভুরু কুঁচকে চুপ করে রইলেন।
‘তা উনি এখানে দেখা দিয়েছেন তুমি চলে যাবার কিছু পরেই, আর আমি যতদূর বুঝছি, কিটির প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছেন আর বুঝতেই তো পারো, মা…’
‘মাপ কর, কিছুই আমি বুঝছি না’, লেভিন বললেন মুখ হাঁড়ি করে কপাল কুঁচকিয়ে, সেই মুহূর্তে তার মনে পড়ল নিকোলাই ভাইয়ের কথা এবং কি জানোয়ার তিনি যে তাকে ভুলতে পারলেন।
‘আরে দাঁড়াও, দাঁড়াও, হেসে তাঁর হাত ধরে বললেন অবলোনস্কি, ‘আমি যা জানি শুধু তাই তোমাকে বলেছি, তবে আবার জানাই, এই সূক্ষ্ম, সুকোমল ব্যাপারে যতটা অনুমান করা সম্ভব তাতে আমার মনে হয় চান্তা তোমার দিকেই বেশি।
লেভিন চেয়ারে আবারা ধপাস করে বসে পড়লেন, মুখ তার বিবর্ণ হয়ে উঠল।
তাঁর পানপাত্র পূর্ণ করে দিতে দিতে অবলোনস্কি বলে চললেন, ‘আমি পরামর্শ দেব যথাসত্বর ব্যাপারটার হেস্ত নেস্ত করে ফেলতে।
‘না, ধন্যবাদ, কিন্তু পান করতে আমি আর পারছি না’, গেলাস ঠেলে দিয়ে লেভিন বললেন, মাতাল হয়ে পড়ব… কিন্তু তুমি আছ কেমন? স্পষ্টতই কথার মোড় ফেরাবার জন্য বললেন লেভিন।
‘আরেকটা কথা, সমস্যাটা তাড়াতাড়ি মিটিয়ে ফেলল, এই আমার পরামর্শ। আজই কথা বলতে বলছি না, বললেন অবলোনস্কি, ‘চলে যাও কাল সকালে। চিরায়ত রীতিতে প্রস্তাব দিও। তারপর সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ…’।
কই, তুমি যে কেবলি বল শিকারের জন্য আমার ওখানে আসবে? এসো-না বসন্ত কালে’, লেভিন বললেন।
অবলোনস্কির সাথে এই আলাপটা শুরু করেছিলেন বলে এখন তিনি সর্বান্তঃকরণে অনুতপ্ত। কোন এক পিটার্সবুর্গ অফিসারের প্রতিযোগিতা নিয়ে কথাবার্তাটায়, অবলোনস্কির প্রস্তাব আর পরামর্শে তার বিশেষ অনুভূতিতে মালিন্য লেগেছে। অবলোনস্কি হাসলেন। তিনি বুঝেছিলেন কি চলছে লেভিনের ভেতরটায়।
বললেন, যার কোন এক সময়। আহ্ ভাই, নারী–এই স্কুপটা দিয়েই সব কিছু ঘুরছে। এই যেমন আমার অবস্থাটা খারাপ, অতি খারাপ। আর সবই ঐ নারীদের জন্য। তুমি আমাকে খোলাখুলি বলো তো, চুরুট বের করে অন্য হাতে পানপাত্র নিয়ে তিনি বলে চললেন, ‘তুমি উপদেশ দাও আমাকে।’
‘কিন্তু কি ব্যাপার?
ব্যাপার এই। ধরা যাক তুমি বিবাহিত, স্ত্রীকে ভালোবাসো, কিন্তু অন্য নারীর প্রেমে মেতে উঠেছ…’
‘মাপ কর, এটা আমি একেবারেই বুঝি না, যে যেন…যতই বলো, যেমন বুঝি না কেন আমি ভরপেট খাওয়া দাওয়ার পরই রুটিখানার পাশ দিয়ে যাবার সময় চুরি করব কিনা একটা বন রুটি।’
অবলোনস্কির চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল সচরাচরের চেয়েও বেশি।
‘কেন নয়? মাঝে মাঝে বন রুটি এমন গন্ধ ছাড়ে যে লোভ সামলানো দায়।
নিজের পাথিব কামনা-বাসনাকে
যদি আমি পরাজিত করে থাকি, সে তো চমৎকার;
আর যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলেও
আনন্দটুকু তো পাওয়া গেল।
জার্মান ভাষায় এই বলে অবলোনস্কি শুধু সূক্ষ্ম হাসলেন। না হেসে পারলেন না লেভিনও।
অবলোনস্কি বলতে লাগলেন, না, এটা ঠাট্টার কথা নয়। ভেবে দেখো, এ নারী মিষ্টি, নম্র, প্রেমময়ী একটা প্রাণী, বেচারা, নিঃসঙ্গিনী, সব বিসর্জন দিয়েছে আমার জন্য। এখন, কাণ্ডটা যখন হয়েই গেছে–ভেবে দেখো–সত্যিই কি ওকে ত্যাগ করতে পারি? ধরা যাক, পরিবার টিকিয়ে রাখার জন্য ছাড়াছাড়ি হল, কিন্তু ওর জন্য কি করুণা হবে না, ওর একটা ব্যবস্থা করব না, সহনীয় করে তুলব না ওর জীবন?
কিন্তু মাপ কর ভাই, তুমি তো জানো, আমার কাছে সমস্ত নারী দু’ভাগে বিভক্ত… মানে, না… সঠিক বলল : নারী আছে এবং আছে… মনোরমা পতিতা আমি দেখিনি, দেখবও না, আর কাউন্টারের ওই চাচর চিকুর দোলানো রঙ-করা ফরাসিনীর মত যারা, তারা আমার কাছে জঘন্য জীব, সব পতিতাই তাই।
