উঠে দাঁড়ালেন তিনি, ফোঁপানিতে বন্ধ হয়ে গেল কথা। ভ্রন্স্কিও উঠে দাঁড়ালেন এবং নুয়ে, খাড়া না হয়ে কপালের তল থেকে চাইছিলেন তাঁর দিকে। কারেনিনের অনুভূতিটা তিনি বুঝতে পারছিলেন না। তবে টের পাচ্ছিলেন যে সেটা একটা উঁচুদরের হৃদয়াবেগ, তাঁর যা দৃষ্টিভঙ্গি তাতে করে সেটা তাঁর পক্ষে এমন কি অনধিগম্যই
আঠারো
কারেনিনের সাথে কথাবার্তার পর ভ্রন্স্কি বেরিয়ে এসে কারেনিনদের বাড়ির দেউড়িতে থেমে চেষ্টা করে স্মরণ করতে চাইলেন—কোথায় তিনি, কোথায় যেতে হবে তাঁকে। নিজেকে লজ্জিত, অপমানিত, দোষী আর নিজের অবমাননা মুছে ফেলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত বলে বোধ করছিলেন তিনি। যে বাঁধা-রাস্তা দিয়ে তিনি এযাবৎ অমন সগর্বে আর অনায়াসে এগিয়ে এসেছেন, তা থেকে নিজেকে নিক্ষিপ্ত বলে বোধ হচ্ছিল তাঁর। জীবনের যেসমস্ত অভ্যাস আর নিয়ম তাঁর ভারি দৃঢ় বলে মনে হত, হঠাৎ দেখা গেল সেগুলো মিথ্যা আর অপ্রয়োজ্য। প্রতারিত যে স্বামীকে তাঁর এতদিন মনে হয়েছিল করুণ একটি জীব, তাঁর সুখের পথে একটা আপতিক এবং খানিকটা হাস্যকর অন্তরায়, হঠাৎ আন্না নিজেই তাকে ডেকে পাঠালেন, তুলে দিলেন হীনতাবোধ জাগাবার মত একটা উচ্চতায়, আর সে উচ্চতায় এ স্বামী মোটেই আক্রোশপরায়ণ নয়, মিথ্যাচারী নয়, হাস্যকর নয়, সহৃদয়, সহজ, মহিমান্বিত। এটা অনুভব না করে ভ্রন্স্কি পারলেন না। হঠাৎ বদলে গেল ভূমিকা দুটো। ভ্রন্স্কি অনুভব করলেন স্বামীর উচ্চতা, নিজের হীনতা, তার ন্যায্যতা, নিজের অন্যায়। অনুভব করলেন যে নিজের দুঃখেও স্বামী মহানুভব আর নিজের প্রতারণায় তিনি নীচ আর তুচ্ছ। কিন্তু যে ব্যক্তিকে তিনি অন্যায়ভাবে অবজ্ঞা করেছেন তার কাছে এই হীনতাবোধ তাঁর শোচনার অল্পাংশ মাত্র। নিজেকে তাঁর অবর্ণনীয় অসুখী মনে হল এই জন্য যে এখন যখন তিনি বুঝলেন যে চিরকালের জন্য আন্নাকে হারিয়েছেন, তখন আন্নার জন্য যে হৃদয়াবেগ নিভে আসছে বরে তাঁর ইদানীং মনে হয়েছিল, সেটা এত প্রবল হয়ে উঠ যা আর কখনো হয়নি। অসুখের সময় তিনি আন্নার সমস্তটা দেখতে পেয়েছেন, দেখেছেন তাঁর অন্তঃস্থল, আর তাঁর মনে হয়েছে এতদিন পর্যন্ত তিনি ভালোবাসেননি তাঁকে। এখন, তিনি যখন তাঁকে জানলেন, তখন তাঁর বুকে এমন একটা ভালোবাসা উথলে উঠল যেভাবে তাঁকে ভালোবাসা উচিত; তাঁর কাছে তিনি হীন হয়েছেন, চিরকালের জন্য হারালেন তাঁকে শুধু নিজের লজ্জাকর স্মৃতি রেখে গেলেন তাঁর মনে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার তাঁর সেই হাস্যকর, কলংকজনক দশা যখন কারেনিন তাঁর হাত সরিয়ে দেন তাঁর লজ্জিত মুখ থেকে। কারেনিনদের বাড়ির দেউড়িতে হতবিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি, ভেবে পাচ্ছিলেন না কি করবেন।
‘গাড়ি ডাকব কি?’ জিজ্ঞেস করল চাপরাশি।
‘হ্যাঁ, গাড়ি!’
তিনটি বিনিদ্র রাতের পর ঘরে ফিরে ভ্রন্স্কি পোশাক না ছেড়ে, হাত গুটিয়ে মাথার তলে রেখে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লেন সোফায়। মাথা তাঁর ভারি। অতি বিচিত্র সব ছবি, স্মৃতি, চিন্তা অসাধারণ দ্রুততা আর স্পষ্টতায় আদল-বদল হতে থাকল : এই তিনি রোগিণীর জন্য চামচে ওষুধ ঢালতে গিয়ে উপছে ফেললেন, কখনো দেখা গেল ধাত্রীর সাদা হাত, কখনো-বা খাটের কাছে মেঝেতে কারেনিনের বিচিত্র অবস্থান।
‘ঘুম! বিস্মরণ!’ মনে মনে বললেন তিনি সুস্থ লোকের এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে যে ক্লান্ত হয়েসে যদি ঘুমাতে চায়, তাহলে তখনই ঘুমিয়ে পড়বে। আর সত্যিই সেই মুহূর্তেই তাঁর মাথার মধ্যে সব গোলমাল হয়ে যেতে লাগল, বিস্মরণের অতল গহ্বরে পড়তে থাকলেন তিনি। অচেতন জীবনের সাগরতরঙ্গ বইত লাগল তাঁর মাথার ওপর দিয়ে, হঠাৎ যেন বিদ্যুৎপ্রবাহের একটা প্রবল আঘাত ছুঁয়ে গেল তাঁকে, এমনভাবে তিনি চমকে উঠলেন যে সোফার স্প্রিঙের ওপর সারা দেহ তাঁর লাফিয়ে উঠল, দু’হাতে ভর দিয়ে সভয়ে হাঁটু গেড়ে বসলেন তিনি। চোখ তাঁর বিস্ফারিত, যেন কখনো তিনি ঘুমাননি। মাথার ভার, অঙ্গপ্রতঙ্গের শিথিলতা যা তিনি এক মিনিট আগেও অনুভব করেছেন, হঠাৎ অন্তর্ধান করল তা।
‘আপনি আমাকে কাদায় ধামসাতে পারেন’, শুনলেন তিনি কারেনিনের গলা দেখলেন তাঁকে নিজের সামনে, দেখলেন আতপ্ত রক্তিমোচ্ছ্বাস আর জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে আন্নার মুখ কোমলতা আর ভালোবাসায় তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে নয়, কারেনিনের দিকে; তাঁর মুখ থেকে তিনি যখন হাত সরিয়ে দেন, নিজের তখনকার উজবুক আর হাস্যজনক মূর্তিটা, যা তাঁর মনে হচ্ছিল, চোখে পড়ল তাঁর। আবার তিনি পা টান করে আগের ভঙ্গিতে শুলেন সোফায়, চোখ বন্ধ করলেন।
‘ঘুম! ঘুম!’ পুনরাবৃত্তি করতে লাগলেন মনে মনে। কিন্তু চোখ বন্ধ করেও তিনি পরিষ্কার দেখতে পেলেন আন্নার মুখ, যেমন তাঁকে দেখেছিলেন ঘোড়দৌড়ের আগের দিনটার সন্ধ্যায়।
‘সেটা আর নেই, সে আর হবে না, আন্না এটা মুছে ফেলতে চায় স্মৃতি থেকে। অথচ এ ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না। কিভাবে মেলা যায় আমাদের, কিভাবে মেলা যায়?’ উনি বললেন সরবেই আর অজান্তে তার পুনরাবৃত্তি করতে থাকলেন। শব্দের এই পুনরাবৃত্তিতে যে নতুন নতুন ছবি ও স্মৃতিগুলো তাঁর মাথায় ভিড় করে আসছে বলে তিনি টের পাচ্ছিলেন তা সংযত হচ্ছিল। কিন্তু সংযত হচ্ছিল অল্পক্ষণের জন্য। অসাধারণ দ্রুততায় একের পর এক দেখা দিতে থাকল সুখের সেরা মুহূর্তগুলো আর সেইসাথে সাম্প্রতিক হীনতা। আন্নার স্বর বলছে, ‘হাত সরিয়ে নাও’। হাত তিনি সরিযে নিচ্ছেন আর টের পাচ্ছেন কি বোকা-বোকা লজ্জিত দেখাচ্ছে তাঁ মুখ।
