কারেনিনের প্রাণের বেদনা ক্রমেই বেড়ে উঠে এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে সেটা দমন করার চেষ্টা তিনি ছেড়ে দিলেন; হঠাৎ তিনি অনুভব করলেন যে প্রাণের বেদনা বলে যেটাকে ভাবছিলেন সেটা উল্টো বরং প্রাণের একটা পরামানন্দের অবস্থা, যা হঠাৎ তাঁকে দিচ্ছে নতুন একটা সুখ, যা আগে তিনি পাননি কখনো। তিনি ভাবেননি যে সারা জীবন যা তিনি অনুসরণ করতে চেয়েছেন সেই খ্রিস্টীয় অনুশাসনটাই তাঁকে তাঁর শত্রুদের ক্ষমা করতে ও ভালোবাসতে বলছে; কিন্তু শত্রুকে ভালোবাসা ও ক্ষমার একটা সুখানুভূতিতে বুক তাঁর ভরে উঠল। নতজানু হয়ে বসলেন তিনি, মাথা রাখলেন আন্নার হাতের ভাঁজে, ব্লাউজের তল থেকে তা পুড়িয়ে দিচ্ছিল তাঁর কপাল, কাঁদতে লাগলেন শিশুর মত। আন্না তাঁর কেশ বিরল মাথা জড়িয়ে ধরলেন, তাঁর দিকে সরে এসে দৃপ্ত গর্বে চোখ তুললেন ওপরে।
‘দ্যাখো কেমন লোক, আমি তো জানতামই! এবার বিদায় সকলের কাছ থেকে বিদায়!…আবার এসেছে ওরা, কেন ওরা চলে যাচ্ছে না?…আহ্, খুলে নাও না আমার ওভারকোট!’
ডাক্তার তাঁর হাতে খসিয়ে সন্তর্পণে তা রাখলেন বালিশের ওপর, কাঁধ পর্যন্ত ঢেকে দিলেন। বাধ্যের মত শুয়ে রইলেন আন্না, জ্বলজ্বলে চোখে চেয়ে থাকলেন সামনের দিকে।
‘শুধু একটা কথা মনে রেখো, আমার চাই ক্ষমা, আর কিছুই আদার দরকার নেই…ও আসছে না কেন?’ দরজায় ভ্রন্স্কিকে লক্ষ্য করে আন্না বললেন, ‘এসো, করমর্দন কর ওর।’
খাটের কিনারার কাছে এসে ভ্রন্স্কি আবার তাঁকে দেখে আবার মুখ ঢাকলেন হাত দিয়ে।
‘মুখ খোলো, ওর দিকে চাও। সাধু ও’, আন্না বললেন, খোলো, মুখ খোলো তো!’ রাগত স্বরে বলে উঠলেন তিনি, ‘কারেনিন, ওর হাত সরিয়ে নাও! আমি ওর মুখ দেখতে চাই।’
কারেনিন হাত সরিয়ে দিলেন ভ্রন্স্কির মুখ থেকে যা যন্ত্রণা আর লজ্জায় ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল।
‘ওকে হাত দাও। ক্ষমা করো ওকে।
চোখ থেকে যে পানি ঝরছিল তা সম্বরণের চেষ্টা না করে তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন।
‘সৃষ্টিকর্তা মহান, সৃষ্টিকর্তা মহান’, আন্না বললেন, ‘এবার সব তৈরি। কেবল পা দুটো একটু লম্বা করে দিলে ভালো হয়। হ্যাঁ, ওইরকম, আহ্ চমৎকার! কি রুচিহীন এই ফুলগুলো, একেবারেই ভায়োলেটের মত নয়’, ওয়ালপেপার দেখিয়ে বললেন তিনি, ‘মাগো, মাগো। কখন এসব চুকবে? মর্ফিয়া দিন আমাকে। ডাক্তার! মর্ফিয়া দিন। মাগো, মাগো!’
বিছানায় ছটফট করতে লাগলেন তিনি।
এই ডাক্তার এবং অন্য ডাক্তাররাও বলেছিলেন যে এটা প্রসবের জ্বর, শতকরা নিরানব্বই ক্ষেত্রেই যার পরিণাম মৃত্যু। সারা দিন চলল জ্বর, ভুল বকা, সংজ্ঞাহীনতা। মাঝ রাতের দিকে রোগিণী পড়ে রইলেন অসাড় হয়ে, নাড়ী প্রায় ছিল না।
প্রতি মুহূর্তে লোকে প্রতীক্ষা করছিল অন্তিমটার জন্য।
ভ্রন্স্কি বাড়ি চলে গেলেন কিন্তু সকালে ফিরে এলেন খবর নিতে। প্রবেশ-কক্ষে তাঁকে দেখে কারেনিন বললেনঃ ‘থেকে যান, হয়ত চাইবে আপনাকে’, এবং নিজেই তাঁকে নিয়ে গেলেন স্ত্রীর স্টাডি ঘরে।
সকালে আবার শুরু হল ব্যাকুলতা, উত্তেজনা, চিন্তা ও উক্তির ক্ষিপ্রতা, এবং আবার শেষ হল সংজ্ঞানতায়। তৃতীয় দিনেও তাই চলল, ডাক্তাররা বললেন আশা নাকি আছে। সেদিন স্টাডিতে গেলেন কারেনিন, যেখানে বসে ছিলেন ভ্রন্স্কি, দরজা বন্ধ করে বসলেন তাঁর মুখোমুখি।
‘কারেনিন’, কৈফিয়তের পালা কাছিয়ে আসছে অনুভব করে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘আমি কথা বলতে পারছি না, কিছু বুঝতেও পারছি না। কৃপা করুন আমাকে। আপনার যত কষ্টই হোক, আমার অবস্থা তার চেয়েও খারাপ।’
উঠতে যাচ্ছিলেন তিনি কিন্তু কারেনিন তাঁর হাত ধরে বললেন : ‘অনুরোধ করি, আমার কথাগুলো শুনুন, এর প্রয়োজন আছে। আমার মনোভাবগুলো আপনাকে বুঝিয়ে বলা উচিত, যার দ্বারা আমি চালিত হয়েছি এবং হব যাতে আমার সম্পর্কে আপনার মনে কোন বিভ্রান্ত না থাকে। আপনি জানেন যে আমি বিবাহবিচ্ছেদ করব বলে স্থির করেছিলাম এবং ব্যাপারটা শুরুও করে দিয়েছিলাম। আপনার কাছে লুকাব না যে শুরু করে দ্বিধায় পড়েছিলাম, কষ্ট পাচ্ছিলাম আমি; স্বীকার করছি যে ওর এবং আপনার ওপর প্রতিশোধ নেবার বাসনা আমাকে পেয়ে বসেছিল। যখন আমি টেলিগ্রাম পাই, তখন আমি এখানে এসেছিলাম একই মনোভাব নিয়ে, বলা উচিত তারও বেশি, মৃত্যু কামনা করেছিলাম ওর। কিন্তু…’ চিন্তায় খানিক চুপ করে রইলেন, নিজের মনোভাব ওঁর কাছে প্রকাশ করবেন কি করবেন না, ‘কিন্তু ওকে দেখার পর আমি ক্ষমা করি। ক্ষমার সুখ আমাকে বলে দেয় কি আমার কর্তব্য। ক্ষমা করেছি পুরোপুরি। অন্য গালটাও পেতে দিতে চাই আমি। কেউ আমার কোট কেড়ে নিলে কামিজটাও দিতে চাই তাকে। সৃষ্টিকর্তার কাছে আমার শুধু একটাই প্রার্থনা, ক্ষমার সুখ যেন আমার কাছ থেকে নিয়ে না নেন!’ চোখে তাঁর পানি আর সে চোখের প্রশান্ত দৃষ্টি বিস্মিত করল ভ্রন্স্কিকে। ‘এই আমার অবস্থা। আপনি আমাকে কাদায় ধামসাতে পারেন, সমাজের কাছে একটা হাসির পাত্র করে তুলতে পারেন আমাকে, কিন্তু ওকে আমি ত্যাগ করব না, আপনাকেও ভর্ৎসনা কবর না কখনো’, বলে চললেন উনি, ‘আমার কর্তব্য আমার সামনে সুস্পষ্ট : ওর সাথে আমাকে থাকতে হবে এবং থাকব। ও যদি আপনাকে দেখতে চায়, আমি জানাব, কিন্তু এখন, আমি মনে করি আপনার বিদায় নেওয়া ভালো।’
