‘ডাক্তার, ধাই আর কাউন্ট ভ্ৰন্স্কি।’
অন্তঃপুরে ঢুকলেন কারেনিন। ড্রয়িং-রুমে কেউ ছিল না; তাঁর পদশব্দ শুনে বেগুনি ফিতে লাগানো টুপি পরা ধাই বেরিয়ে এল আন্নার স্টাডি থেকে।
কারেনিনের কাছে এসে সে মৃত্যুর সন্নিকটতা হেতু অন্তরঙ্গতায় তাঁর হাত ধরে নিয়ে গেল শোবার ঘরে। বলল, ‘যাক, আপনি এসে গেছেন! কেবলই আপনার কথা, শুধু আপনার কথা।’
‘বরফ দিন শিগগির!’ শোবার ঘর থেকে শোনা গেল ডাক্তারের হুকুমদার গলা।
কারেনিন গেলেন আন্নার স্টাডিতে। সেখানে নিচু একটা টুলে পাশকে ভাবে বসে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদছিলেন ভ্রন্স্কি। ডাক্তারের গলা শুনে লাফিয়ে উঠলেন তিনি, মুখ থেকে হাত সরাতেই দেখতে পেলেন কারেনিন। স্বামীকে দেখে তিনি এত বিব্রত হয়ে গেলেন যে বসে পড়লেন আবার, ঘাড়ের মধ্যে মাথা এমনভাবে গুটিয়ে আনলেন যেন কোথাও হোক অন্তর্ধান করতে চান; তবে নিজের ওপর জোর খাটিয়ে বললেন : ‘ও মারা যাচ্ছে। ডাক্তাররা বলেছে কোন আশা নেই। এটা অবশ্য আপনার ইচ্ছাধীন, কিন্তু এখানে থাকতে দিন আমাকে…তবে এটা আপনার যা ইচ্ছে, আমি…’
ভ্রন্স্কির চোখে পানি দেখে কারেনিন বিচলিত বোধ করলেন যেমনটা তাঁর হত অন্য লোকের কষ্ট দেখলে, মুখ ফিরিয়ে ভ্রন্স্কির কথা সবটা না শুনে চলে গেলেন দরজার দিকে। শোবার ঘর তেকে শোনা যাচ্ছিল আন্নার গলা, কি যেন বলছেন। গলার স্বর ওঁর সজীব, প্রফুল্ল, সুনির্দিষ্ট জোর পড়ছে এক-একটা শব্দে। শোবার ঘরে ঢুকে কারেনিন গেলেন পালঙ্কের কাছে। আন্না শুয়েছিলেন ওঁর দিকে মুখ করে। গাল রক্তিম, ঝকঝকে চোখ, ছোট ছোট সাদা হাত ব্লাউজের আস্তিন থেকে বেরিয়ে এসে খেলা করছে কম্বলের কিনারা নিয়ে। তাঁকে শুধু সুস্থ ও সবল দেখাচ্ছিল তাই নয়, মেজাজও চমৎকার। কথা বলছিলেন দ্রুত, ঝঙ্কৃত, অসাধারণ সঠিক আর সাবেগ টানে।
কেননা আলেক্সেই, আমি বলছি কারেনিনের কথা (কি বিচিত্র, ভয়ংকর নির্বন্ধ যে দুজনেই আলেক্সেই, তাই না?) আলেক্সেই আমাকে ত্যাগ করল না। আমিও ভুলে যেতাম, সেও ক্ষমা করত…কিন্তু কেন আসছে না সে? ভারি সে ভালো লোক, নিজেই জানে না কত ভালো। আহ্, হে আল্লাহ্, কি যে বিছ্ছিরি লাগছে! তাড়াতাড়ি একটু পানি খেতে দিন আমাকে! আহ্, এতে যে আমার মেয়েটার ক্ষতি হবে! বেশ, ঠিক আছে, ওকে দিন ধারা-মা’র কাছে! সেই বরং ভালো। ও আসবে, খুকিকে দেখলে কষ্ট হবে ওর। ওকে দিয়ে দিন ধাই মা’র কাছে।’
আন্না আর্কাদিয়েভনা, উনি এসেছেন। এই-যে উনি!’ ধাই বলল কারেনিনের দিকে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে।
‘আহ্, কি ছাইভস্ম!’ আন্না বলে চললেন স্বামীকে লক্ষ্য না করে। ‘দাও ওকে, খুকিকে দাও আমাকে! এখনো ও এল না। ক্ষমা করবে না তোমরা বলছ কারণ ওকে চেনো না তোমরা। কেউ চিনতে না, চিনতাম শুধু একা আমি, তাও কি কষ্টই না হয়েছে। দেখা উচিত ওর চোখ দু’খানা, সেরিওজারও অমনি চোখ, তাই সে দিকে তাকাতে পারি না। সেরিওজাকে খেতে দেওয়া হয়েছে? আমি যে জানি, সবাই ওকে ভুলে থাকবে। ও হলে ভুলত না। সেরিওজাকে নিয়ে আসা দরকার কোণের ধরটায়, মারিয়েটকে বলা হোক ওর সাথে শুতে।’
হঠাৎ উনি কুঁকড়ে এলেন, চুপ করে গেলেন, যেন কোন একটা আঘাতের ভয়ে আত্মরক্ষায় হাত তুললেন মুখের কাছে। স্বামীকে দেখতে পেয়েছেন।
‘না-না’, আন্না বলে চললেন, ‘ওকে আমি ভয় পাই না, ভয় পাই মরণকে। আলেক্সেই এসো এখানে। বড় তাড়া আমার, কেননা সময় নেই, বেঁচে থাকব মাত্র কিছুক্ষণ, এখনই জ্বর উঠবে, তখন কিছুই আর বুঝতে পারব না। এখন পারছি, সব বুঝতে পারছি, দেখতে পাচ্ছি সবই।’
কারেনিনের কুঞ্চিত মুখে ফুটে উঠল যন্ত্রণা। আন্নার হাত ধরলেন তিনি, কি একটা বলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু কিছুতেই পারলেন না; নিচের ঠোঁট কাঁপছিল, কিন্তু তখনও তিনি লড়ছিলেন নিজের ব্যাকুলতার সাথে, আন্নার দিকে তাকাচ্ছিলেন শুধু মাঝে-মধ্যে। আর যতবার তাকাচ্ছিলেন, নজরে পড়ছিল আন্নার চোখ যা তাঁর প্রতি নিবদ্ধ ছিল এমন একটা মিনতি আর উচ্ছ্বসিত কোমলতা নিয়ে যা আগে তিনি দেখেননি কখনো।
‘দাঁড়াও তুমি জানো না…দাঁড়াও, দাঁড়াও…’ থেমে গেলেন আন্না, যেন নিজের ভাবনটা গুছিয়ে নিতে চান ‘হ্যাঁ’, শুরু করলেন তিনি, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, তোমাকে যা বলতে চাইছিলাম। আমার ব্যাপারে অবাক হয়ো না। আমি সেই একই আছি…আমার মধ্যে আছে আরেকজন, আমি ভয় করি তাকে, সে ভালোবাসে ঐ লোকটাকে, চেয়েছিলাম তোমাকে ঘৃণা, করতে, কিন্তু আগে আমি যা ছিলাম সে সত্তাটাকে ভুলতে পারিনি। ও মেয়েটা আমি নই। এখন আমি আসল, গোটাটাই। আমি এবার মরছি, জানি যে মরছি, জিজ্ঞেস করো ওকে। এখনই আমি টের পাচ্ছি এই তো হাতে, পায়ে আঙুলে মন খানেক করে ভার। আঙুলগুলো দেখো-না, কি বিরাট। তবে এ সব শিগগিরই ঢুকে যাবে…শুধু একটা জিনিস আমার দরকার : আমাকে ক্ষমা করো তুমি, করে দাও পুরোপুরি। আমি যাচ্ছেতাই, কিন্তু আমার ধাই-মা যা বলত : সন্ন্যাসিনী কৃচ্ছ্রসাধিকা-কি যেন তার নাম? সে তো আমার চেয়েও খারাপ। রোমে চলে যাব আমি, মরুভূমি আছে সেখানে, তখন কারো ব্যাঘাত ঘটাব না, শুধু সেরিওজাকে সাথে নেব, আর খুকিটিকে …না, তুমি ক্ষমা করতে পারো না! আমি জানি, এটা যে ক্ষমা করা চলেনা! না, না, চলো যাও, বড় বেশি ভালো তুমি!’ উত্তপ্ত এক হাতে তিনি ধরে রইলেন তাঁর হাত, অন্য হাতে ঠেলতে লাগলেন তাঁকে।
