কারেনিন নিজেকে বোঝালেন, ‘তবে ব্যাপারটা স্থির হয়ে গেছে, ও নিয়ে ভাবার কিছু নেই।’ এবং শুধু নিজের আসন্ন যাত্রা আর নিয়ন্ত্রণ কমিশনের কথা ভাবতে ভাবতে তিনি ঢুকলেন নিজের কামরায় আর হোটেলের যে চাপরাশি তাঁকে এগিয়ে দিচ্ছিলেন, তাকে বললেন তাঁর চাকরটা কোথায়; সে বলল যে চাকর এইমাত্র বেরিয়ে গেছে। কারেনিন তাঁকে চা দিতে বলে বসলেন এবং গাইডবাই নিয়ে দেখতে লাগলেন তাঁর পর্যটন-পথ।
চাকর ফিরে এসে ঘরে ঢুকে বলল, ‘দুটো টেলিগ্রাম আছে। মাপ করবেন, হুজুর। আমি এইমাত্র বেরিয়েছিলাম।’
কারেনিন টেলিগ্রাম নিয়ে তার সীল ভাঙলেন। প্রথম টেলিগ্রামটায় এই খবর দেওয়া হয়েছে যে কারেনিন যে পদটার প্রার্থী ছিলেন সেটা পেয়েছেন গ্রেমভ। টেলিগ্রাম ছুঁড়ে ফেলে লাল হয়ে তিনি পায়চারি করতে লাগলেন। ‘সৃষ্টিকর্তা যাদের মারতে চান তাদের বুদ্ধিভ্রংশ করেন’, এ পদ নির্বাচনের যারা সহযোগিতা করেছে কথাটায় তাদের মনে করে লাতিন ভাষায় বললেন তিনি। এ পদটা যে তিনি পেলেন না, তাঁকে যে স্পষ্টতই এড়িয়ে যাওয়া হল, এত তিনি তেমন ক্ষুব্ধ হননি; কিন্তু তাঁর কাছে দুর্বোধ্য, বিস্ময়কর ঠেকল কি করে ওদের চোখে পড়ল না যে বাচাল, বুলিবাগীশ গ্রেমভ অন্য সবার চেয়ে ও পদের অযোগ্য। কি করে ওদের চোখে পড়ল না যে এই নির্বাচনে ওরা সর্বনাশ করছে নিজেদের, ক্ষুণ্ন করছে নিজেদের মর্যাদা।
‘এই ধরনেরই আরো একটা কিছু হবে’, দ্বিতীয় টেলিগ্রামটা খুলতে খুলতে পিত্তি জ্বলিয়ে তিনি বললেন মনে মনে টেলিগ্রামটা স্ত্রীর কাছ থেকে নীল নেপসিলে লেখা ‘আন্না’ স্বাক্ষরটা প্রথম চোখে পড়ল তাঁর ‘মরছি, আসবার জন্যে মিনতি করছি, ক্ষমা পেয়ে মরে যাব নিশ্চিন্তে’, পড়লেন তিনি। ঘৃণাভরে তিনি হাসলেন, ছুঁড়ে ফেলে দিলেন টেলিগ্ৰাম। এটা যে একটা ছলনা, ধূর্ততা, এ বিষয়ে প্রথম মুহূর্তে তাঁর কোন সন্দেহই ছিল না।
‘কোন ছলনাতেই সে দ্বিধা করবে না। তবে প্রসব হবার কথা। হয়ত এটা তার প্রসবকালীন পীড়া। কিন্তু কি উদ্দেশ্যে? সন্তানকে বৈধ করার জন্যে, আমাকে হতমান করে বিবাহবিচ্ছেদের বাধা দেবার জন্যে?’ ভাবলেন তিনি, ‘কিন্তু লিখেছে যে : মরছি …’ টেলিগ্রামটা আবার পড়লেন তিনি; আর তাতে যা লেখা ছিল তার সাক্ষাৎ অর্থটা হঠাৎ অভিভূত করল তাঁকে। ‘যদি এটা সত্যি হয়?’ মনে মনে ভাবলেন তিনি, ‘যদি যন্ত্রণার মুহূর্তে, মৃত্যু সান্নিধ্যে তার সত্যিই অনুতাপ হয়ে থাকে, আর আমি যদি এটাকে ছলনা ভেবে যেতে আপত্তি করি? এটা শুধু নিষ্ঠুরতা হবে, সবাই ধিক্কার দেবে আমাকে, তাই না, আমার পক্ষ থেকে এটা হবে মূর্খামি।’
তিনি চাকরকে বললেন, ‘পিওত্র, একটা গাড়ি ডাক, আমি পিটার্সবুর্গ যাচ্ছি।’
কারেনিন স্থির করলেন পিটার্সবুর্গ গিয়ে স্ত্রীকে দেখবেন। যদি তার পীড়াটা ছলনা হয়, তাহলে তিনি কিছুই না বলে চলে যাবেনর। আর যদি সত্যিই সে হয় অসুস্থ, মরণাপন্ন, মৃত্যুর আগে দেখতে চাইছে তাঁকে, তাহলে ও জীবিত থাকরে তাকে তিনি ক্ষমা করবেন আর বড় বেশি দেরি হয়ে গেলে শেষকৃত্য করে যাবেন।
কি তাঁকে করতে হবে, সারা রাস্তায় সে কথাটা আর ভাবলেন না তিনি।
রেল কামরায় কাটানো রাতটার ফলে একটা অপরিচ্ছন্নতার বোধ আর ক্লান্তি নিয়ে পিটার্সবুর্গের প্রভাতী কুয়াশায় তিনি ফাঁকা নেভস্কি সড়ক দিয়ে চললেন সোজা সামনের দিকে তাকিয়ে, কি তাঁর কপালে আছে সে কথা মোটেই ভাবছিলেন না। সে কথা ভাবতে তিনি পারছিলেন না কারণ কি হবে সেটা কল্পনা করতে গেলেই যত মুশকিলে তিনি পড়েছেন, আন্নার মৃত্যুতে তৎক্ষণাৎ তার আসান হয়ে যাবে এই ধারণাটা তাড়ানো যাচ্ছিল না। রুটিওয়ালা ছোঁড়া, দরজা-বন্ধ দোকান, রাতের ছ্যাকরা গাড়ির গাড়োয়ান, ফুটপাত সাফ করার ঝাড় দার ভেসে যেতে লাগল তাঁর চোখের সমুখ দিয়ে। আর এসবই তিনি নিরীক্ষণ করতে লাগলেন কি তাঁর কপালে আছে যার যা চাইবার সাহস তাঁর নেই অথচ চাইছেন, সে ভাবনাটা চাপা দেবার চেষ্টা করে। গেলেন গাড়ি-বারান্দার দিকে। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল একটা ছ্যাকরা গাড়ি কোচোয়ান আর তাতে ঘুমন্ত সহিস। অলিন্দে যেতে যেতে কারেনিন মস্তিষ্কের কোন এক সুদূর প্রান্ত থেকে যেন টেনে আনলেন নিজের সিদ্ধান্ত এবং সেটা গুছিয়ে নিলেন। তার অর্থ দাঁড়াল : যদি ছলনা হয়, তাহলে ঘৃণাভরে স্থিরতা বজায় রেখে চলে যাওয়া। যদি সত্যি হয় তাহলে সৌজন্য পালন।’
কারেনিন ঘণ্টি দেবার আগেই দরজা খুলল চাপরাশি। টাই ছাড়া পুরানো একটা ফ্রক-কোট আর ঘরোয়া জুতো পরা চাপরাশি পেত্রভ বা কাপিতোনিচকে দেখাচ্ছিল অদ্ভুত।
‘গিন্নির খবর কি?’
কাল ভালোয় ভালোয় প্রসব হয়েছে।’
বিবর্ণ হয়ে থমকে দাঁড়ালেন কারেনিন। এখন তিনি পরিষ্কার বুঝতে পারলেন কি ভয়ানক আন্নার মৃত্যুকামনা করছিলেন তিনি।
‘আর স্বাস্থ্য?’
সকাল বেলাকার অ্যাপ্রন পরা কর্নেই নেমে এল সিঁড়ি দিয়ে। বলল, ‘খুব খারাপ। কাল ডাক্তারদের পরামর্শ- বৈঠক হয়েছে। এখন ডাক্তার এখানেই।’
‘জিনিসগুলো তোল’, কারেনিন বললেন এবং এখনো তাহলে মৃত্যুর আশা আছে এই সংবাদে খানিকটা হালকা হয়ে তিনি ঢুকলেন প্রবেশ কক্ষে।
র্যাকে একটা ফৌজী ওভারকোট ঝুলতে দেখে তিনি বললেন : ‘কে আছে ওখানে?’
