কিটির কথাটা লেভিন সম্পূর্ণ করলেন : ‘ঠিক হয়ে গেছে যে আমি যাই হই, যাই ছিলাম না কেন, আপনি আমাকে নেবেন, ত্যাগ করবেন না? তাই কি?’
‘তাই, তাই।’
তাঁদের কথোপকথন বাধা দিলেন মাদমোয়াজেল লিনোঁ। অকপট না হলেও কোমল হাসি হেসে তিনি অভিনন্দন জানালেন আদরের শিক্ষার্থিনীকে। তিনি যেতে না যেতেই অভিনন্দন জানাতে এল চাকর-বাকরেরা, তারপর এলন আত্মীয়-স্বজনেরা, শুরু হল স্বর্গসুখের এমন একটা ডামাডোল যা থেকে লেভিন মুক্তি পেয়েছিলেন কেবল বিয়ের পরের দিন। লেভিনের সব সময় অস্বস্তি আর বিরক্তিকর ঠেকছিল কিন্তু সুখ তাঁর ক্রমাগত উঠতে লাগল পঞ্চমে। কেবলি তিনি টের পাচ্ছিলেন যে তিনি যা জানেন না এমন অনেক কিছুই তাঁর কাছে থেকে আশা করছে লোকে, এবং তাঁকে যা বলা হল সেগুলো করে তিনি আনন্দই পেলেন। তিনি ভেবেছিলেন যে তাঁর বিয়েটা অন্য বিয়ের মত হবে না, বিয়ের সাধারণ ব্যাপার-স্যাপারগুলো তাঁর অসাধারণ সুখকে পণ্ড করবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল তিনি তাই করছেন যা করে অন্য লোকেরা আর এ থেকে সুখ তাঁর বেড়েই চলল, হয়ে উঠল তা মোটেই অন্য লোকের মত নয়, নিজের অসাধারণ একটা সুখ।
‘এখন আমরা মিষ্টি খাব’, বললেন মাদমোয়াজেল লনোঁ আর লেভিনও ছুটলেন মিষ্টি কিনতে ‘ভারি আনন্দ হচ্ছে’, বললেন সি্ভ্য়াজ্স্কি, ‘আমি তোমাকে বলব, ফুলের তোড়া কোন ফোমিনের দোকান থেকে।’
‘কেন, দরকার বুঝি?’ ছুটলেন তিনি ফোমিনের দোকানে।
বড় ভাই বললেন, ‘টাকা ধার করা দরকার। কেননা অনেক খরচ আছে, উপহার আছে…’
‘উপহারও চাই?’ ছুটলেন তিনি ফুলদে’র কাছে।
আর মিষ্টিওয়ালা, ফোমিন, ফুলদে—সর্বত্রই তিনি দেখলেন যে সবাই তাঁর প্রত্যাশায় ছিল, সবাই তাঁর সুখে আনন্দিত, উল্লসিত যেমন আর সবাই যাদের সাথে এ দিনগুলোয় তাঁর কাজকর্ম ছিল। আশ্চর্য এই যে সবাই তাঁকে ভালোবাসছে শুধু নয়, আগে যারা তাঁর প্রতি ছিল নিরুত্তাপ, অদরদী, উদাসীন, তারা সবাই আন্দ করছে তাঁর সাথে, মেনে নিচ্ছে তাঁর মত, সৌজন্য সহকারে সম্মান করছে তাঁর ভাবাবেগ, সায় দিচ্ছে তাঁর এই অভিমতে যে দুনিয়ায় তিনি সবচেয়ে সুখী লোক, কারণ তাঁর বধূ পূর্ণতার পরাকাষ্ঠা। কিটিরও মনোভাব ছিল সেইরকম। কানউন্টের নক্স্টন যখন এই ইঙ্গিত করার সদিচ্ছা করেন যে আরো ভালো কিছু তিনি চাইতে পারতেন, কিটি তখন এত ক্ষেপে ওঠে আর এমন নিশ্চিত যুক্তি দিয়ে দেখায় যে দুনিয়ায় লেভিনের চেয়ে ভালো আর কেউ হতে পারে না, যে কাউন্টেস নস্টনকেসেটা স্বীকার করতে হয়, এবং কিটি উপস্থিত থাকলে সপ্রশংস হাসি না হেসে তিনি অর্থনা করতেন না লেভিনকে।
শুধু খোলাখুলি স্বীকৃতির যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, সেটাই ছিল এ সময়টার সবচেয়ে দুঃসহ ব্যাপার। বৃদ্ধ প্রিন্সের সাথে পরামর্শ করে তাঁর অনুমতি পেয়ে লেভিন কিটিকে দেন তাঁর দিনলিপি যাতে লেখা ছিল কি তাঁর যন্ত্রণা। এটা তিনি লিখেছিলেন ভবিষ্যৎ বধূর কথা মনে রেখে। দুটো জিনিস যন্ত্রণা দিয়েছিল তাঁকে—তাঁর অপাপবিদ্ধতার লঙ্ঘন আর ধর্মে অবিশ্বাস। অবিশ্বাসের স্বীকৃতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি। কিটি নিজে ধর্মবিশ্বাসী, ধর্মে, মূল সত্যগুলোয় কখনো সন্দেহ হয়নি তার, কিন্তু লেভিনের বাহ্যিক অবিশ্বাসে একটুও বিচলিত বোধ করেনি সে। ভালোবাসা দিয়ে লেভিনের সমস্ত অন্তরটা সে জানে আর সে অন্তরে সে দেখছে যা সে চাইছিল, আর এ অন্তরকে যদি বলা হয় অধর্মীয় তাতে কিছু এসে যায় না। অন্য স্বীকৃতিটা কিন্তু হাহাকারে কাঁদিয়েছে তাকে।
অভ্যন্তরীণ একটা সংগ্রাম বিনাই লেভিন তাকে তাঁর দিনলিপি দিয়েছিলেন এমন নয়। তিনি জানতেন যে তাঁর আর কিটির মধ্যে কোন গোপনতা থাকতে পারে না, থাকা উচিত নয়, তাই ঠিক করেছিলেন এটাই সঠিক কাজ; কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে সেটা তিনি ভেবে দেখেননি, তার স্থানে তিনি বসাননি নিজেকে। শুধু সেদিন সন্ধ্যায় যখন তিনি থিয়েটারে যাবার আগে ওঁদের ওখানে যান, কিটির ঘরে ঢোকেন আর তাকে তিনি যে অপূরণীয় কষ্ট দিয়েছেন তাতে করে অশ্রুপ্লাবিত, দুঃখার্ত, করুণ আর মধুর মুখখানা দেখেন, তখন তিনি বোঝেন কি অতল ব্যবধান তাঁর কলঙ্কজনক অতীত আর কিটির কপোতসূলভ শুচিতার মধ্যে, যা করেছেন তার জন্য ভয় হল তাঁর।
‘নিয়ে যান, নিয়ে যান এই ভয়ংকর খাতাগুলো!’ সামনে টেবিলের ওপর পড়ে থাকা খাতাগুলো ঠেলে সরিয়ে দিয়ে কিটি বলল, ‘কেন ওগুলো দিয়েছেন আমাকে!…না, এ বরং ভালো; লেভিনের করুণ মুখ দেখে সে যোগ করল, ‘তাহলেও এটা সাংঘাতিক, সাংঘাতিক!’
মাথা নিচু করে নীরবে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। কিছুই বলতে পারলেন না।
পরে ফিসফিস করলেন, ‘আপনি ক্ষমা করবেন না আমাকে।’
‘না ক্ষমা, আমি করেছি, কিন্তু এটা সাংঘাতিক!’
তবে লেভিনের সুখ এত বিপুল যে এই স্বীকৃতিতে তা ধূলিসাৎ তো হলই না,বরং নতুন একটা অর্থে তা পুলকিত করল তাঁকে। কিটি ক্ষমা করেছে তাঁকে; কিন্তু সেই থেকে তিনি কিটির কাছে নিজেকে আরো বেশি অযোগ্য বলে গণ্য করতে লাগলেন, তার নৈতিক উচ্চতার কাছে আরো বেশি মাথা নত করলেন, আরো বেশি মূল্য দিলেন নিজের অন্যায্য সুখে।
সতেরো
যে কথাবার্তাগুলো হয়েছিল ডিনারের সময় এবং পরে, অজ্ঞাতসারে সেগুলো মনে মনে নাড়াচাড়া করতে করতে কারেনিন ফিরলেন তাঁর একলা কামরাটায়। ক্ষমা করা নিয়ে দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা যা বলেছিলেন, শুধু সেটাই তাঁকে পীড়া দিচ্ছিল। নিজের ক্ষেত্রে খ্রিস্টীয় নীতি প্রয়োগ করা বা না করা বড় বেশি কঠিন একটা প্রশ্ন যা নিয়ে লঘুচিত্তে কিছু বলা অনুচিত, আর বহু আগেই কারেনিন এ প্রশ্নটার নৈতিকবাচক উত্তর দিয়ে রেখেছেন। যত কিছু শোনা গিয়েছিল তার ভেতর তাঁর মনে গেঁথে দিয়েছিল নির্বোধ, সহৃদয় তুরোৎসিনের কথাটা : বাহাদুরের মত কাজ করেছেন, ডুয়েলে ডেকে দিলেন খতম করে। সবাই স্পষ্টতই এই মতই পোষণ করে যদিও সৌজন্যবশত সেটা মুখ খুলে বলেনি।
