‘চলুন, মায়ের কাছে যাই’, ওঁর হাত টেনে নিয়ে কিটি বলল। বহুক্ষণ লেভিন কিছু বলতে পারলেন না, সেটা এই জন্য ততটা নয় যে কথায় তাঁর হৃদয়াবেগের ইচ্ছায় নষ্ট হয়ে যাবে বলে ভয় হচ্ছিল তাঁর, যতটা এই কারণে যে প্রতিবার কিছু-একটা বলতে গেলেই তিনি অনুভব করছিলেন যে কথার বদলে সুখের অশ্রুজল ছাপিয়ে উঠবে তাঁর চোখে। কিটির হাত টেনে নিয়ে চুমু খেলেনে তিনি
‘সত্যিই কি এটা সত্যি?’ অবশেষে রুদ্ধকণ্ঠে বললেন তিনি, ‘আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে তুমি ভালোবাসো আমাকে!’
এই ‘তুমি’ কথাটা শুনে আর যে ভীরুতায় তিনি তাকালেন তার দিকে, তাতে হাসল কিটি।
‘হ্যাঁ, ধীরে ধীরে’, কথাটাকে অর্থে ভরে তুলে সে বলল, ‘ভারি সুখী আমি!’
লেভিনের হাত না ছেড়ে কিটি ঢুকল ড্রয়িং-রুমে। তাঁদের দেখে প্রিন্স মহিষীর নিঃশ্বাস পড়তে লাগল ঘন ঘন, তখনই কেঁদে ফেললেন তিনি, আবার তখনই হাসলেন আর লেভিনের পক্ষে আশাতীত সতেজ পদক্ষেপে এলেন তাঁদের কাছে; লেভিনের মাথা জড়িয়ে ধরে তাঁকে চুমু খেয়ে চোখের পানিতে ভিজিয়ে দিলেন তাঁর গাল।
‘তাহলে সব চুকল! আনন্দ হচ্ছে আমার। ওকে তুমি ভালোবাসো। আনন্দ হচ্ছে আমার…ও কিটি!’
‘তাহলে সব ঠিক করে নিলে চটপট’, বৃদ্ধ প্রিন্স বললেন উদাসীন থাকার চেষ্টা করে, কিন্তু লেভিনের সাথে যখন কথা বললেন লেভিনের নজরে পড়ল চোখ ওঁর ভেজা।
‘অনেক দিন থেকেই আমি এটাই চাইছিলাম’, লেভিনের হাত ধরে নিজের দিকে টেনে এনে বললেন, ‘এমন কি তখনই যখন এই ছেবলাটার মাথায় ঢুকেছিল…’
‘বাবা!’ চেঁচিয়ে উঠে কিটি তাঁর মুখ বন্ধ করে দিলে হাত দিয়ে। 1
‘নে হয়েছে, হয়েছে, বলব না’, বললেন উনি, ‘আমি খুবই, খুবই আন…আহ্ কি হাঁদা আমি…’
কিটিকে আলিঙ্গন করে তিনি তার মুখ, হাত এবং আবার মুখ চুম্বন করে ক্রুশ-চিহ্ন আঁকলেন তার ওপর।
আর এই যে বৃদ্ধ প্রিন্স আগে তাঁর কাছে ছিল বাইরের লোক, তাঁর প্রতি নতুন একটা প্রীতি জেগে উঠল লেভিনের মনে যখন তিনি দেখলেন কিভাবে তাঁর মাংসল হাতে অনেকখন ধরে সস্নেহে চুমু, খাচ্ছে কিটি।
ষোলো
ইজি-চেয়ারে বসে চুপচাপ হাসছিলেন প্রিন্স-মহিষী; প্রিন্স বসলেন তাঁর পাশে। কিটি বাবার হাত না ছেড়ে দাঁড়িয়ে রইল তাঁর চেয়ারের কাছে। চুপ করে রইলেন সবাই।
প্রিন্স-মহিষীই প্রথম সব কিছু কথায় ব্যক্ত করলেন, সমস্ত ভাবনা ও অনুভবগুলোকে টেনে আনলেন বাস্তব প্রশ্নে। প্রথম মুহূর্তে সেটা সকলের কাছেই সমান অদ্ভুত, এমন কি বেদনাদায়ক মনে হল।
‘তাহলে কবে? আশীর্বাদ চাই, লোকদের জানাতে হবে। কবে হবে বিয়ে? কি তুমি ভাবছ আলেকজান্ডার?’
‘ওই’, লেভিনকে দেখিয়ে বললেন বৃদ্ধ প্রিন্স, ‘ওই এ ব্যাপারে মুখ্য ব্যক্তি।’
‘কবে?’ লেভিন বললেন লাল হয়ে, ‘কালই। আমার মত যদি চান, তাহলে আমার মনে হয় আজ আশীর্বাদ কাল বিয়ে।’
‘রাখো তো যত বাজে কথা, mon cher!‘
‘তাহলে এক সপ্তাহ বাদে।’
‘একেবারে পাগলা।’
‘কেন আমার!’ ওঁর এই ব্যস্ততায় সানন্দে হেসে বললেন মা, ‘আর যৌতুক?
‘যৌতুক-টৌতুকও চাই নাকি?’ সভয়ে ভাবলেন লেভিন, ‘তবে যৌতুক আর আশীর্বাদ-টাশীৰ্বাদ—এসব কিছু সুখ মাটি করে দিতে পারে? কোন কিছুতেই এটা মাটি হবার নয়!’ উনি তাকালেন কিটির দিকে, লক্ষ্য করলেন যে যৌতুকের কথায় মোটেই, মোটেই অপমানিত বোধ করছে না সে। ভাবলেন, ‘তাহলে এটার দরকার আছে।’
‘আমার তো কিছু জানা নেই। শুধু নিজের ইচ্ছের কথাটা বললাম’, লেভিন বললেন কাঁচুমাচু হয়ে।
‘তাহলে ঠিক করা যাক। এখন আশীর্বাদ আর লোককে খবর দেওয়া যেতে পারে। এই ঠিক।’
প্রিন্স-মহিষী স্বামীর কাছে গিয়ে তাঁকে চুমু খেয়ে চলে যেতে চাইছিলেন, কিন্তু প্রিন্স তাঁকে ধরে রাখলেন, আলিঙ্গন করলেন তাঁকে, নবীন প্রণয়ীর মত কোমল হেসে চুমু, খেলেন কয়েকবার। বৃদ্ধেরা স্পষ্টতই মুহূর্তের জন্য আত্মহারা হয়ে ঠিক বুঝতে পারছিলেন না তাঁরাই আবার প্রেমে পড়েছেন নাকি তাঁদের মেয়ে। প্রিন্স আর প্রিন্স-মহিষী চলে গেলে লেভিন কিটির কাছে গিয়ে তার হাত ধরলেন। এখন তিনি নিজের ওপর কর্তৃত্ব ফিরে পেয়েছেন, কথা বলতে পারেন আর বলার কথা তাঁর অনেক। কিন্তু যা বলার কথা মোটেই সেটা বললেন না তিনি।
‘ওহ্, আমি জানতামই যে এই হবে! তবে আশা করিনি কিছু; কিন্তু মনে মনে সব সময় নিশ্চিত ছিলাম’, বললেন তিনি, ‘আমার বিশ্বাস এটা আমার নির্বন্ধ।’
‘আর আমি?’ কিটি বলল, ‘এমন কি তখনো…’ থেমে গিয়ে সে আবার তার ন্যায়পরায়ণ চোখে তাঁর দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে যেতে লাগল, ‘এমন কি তখনও, যখন নিজের সুখকে আমি ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিলাম। সব সময় আমি শুধু আপনাকেই ভালোবেসেছি। তবে মোহে পড়েছিলাম। সেটা আপনাকে বলতেই হবে… আপনি কি তা ভুলে যেতে পারবেন?’
বোধ হয় সেটা ভালোই। আমার অনেক কিছু ক্ষমা করতে হবে আপনাকে। আমার বলা উচিত।…’
কিটিকে লেভিন যা যা বলতে চেয়েছিলেন এটা তার একটা। উনি ঠিক করেছিলেন যে কিটিকে বলবেন দুটো বিষয়—উনি তার মত পূতপবিত্র নন, আর দ্বিতীয়ত, উনি নাস্তিক। বলাটা কষ্টকর কিন্তু উনি মনে করেছিলেন, দুটো কথাই বলা উচিত
‘না, এখন নয়, পরে হবে!’ বললেন তিনি।
‘বেশ, পরেই হবে। কিন্তু অবশ্য-অবশ্য বলবেন। কিছুতেই ভয় নেই আমার। সব কিছু জানা আমার দরকার। এখন তো সব ঠিক হয়ে গেছে।’
