সেদিনের সারা রাত আর সকালটা লেভিনের কেটেছে একেবারে অচেতন অবস্থায়, নিজেকে অনুভব করছিলেন পার্থিব জীবন থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন। সারা দিন কিছু তিনি খাননি, ঘুমাননি দু’রাত, হালকা জামায় কয়েক ঘণ্টা ঘুরেছেন হিমের মধ্যে, অথচ নিজেকে এত তাজা ও সুস্থ আর কখনো বোধ করেননি তাই নয়, দেহ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন মনে হচ্ছিল তাঁর; চলছিলেন তিনি পেশীর প্রয়াস বিনাই, মনে হচ্ছিল তিনি সব কিছু করতে পারেন তিনি নিঃসন্দেহে ছিলেন যে প্রয়োজন হলে তিনি আকাশে উড়তে পারবেন, ঠেলে সরিয়ে দেবেন বাড়ির ভিত। বাকি সময়টা তিনি কাটালেন রাস্তায়, ক্ষণে ক্ষণে ঘড়ি দেখছিলেন আর চাইছিলেন আশেপাশে।
তিনি এ সময় যা দেখেছিলেন তা পরে দেখেননি আর কখনো। বিশেষ করে স্কুলে যাচ্ছে যে ছেলেরা, ঘুঘুরঙা যে পায়রাগুলো চাল থেকে নেমে এল ফুটপাথে, ময়দা ছিটানো যে বান রুটি অদৃশ্য একটা হাত রেখে দিল জানালায়, তা অভিভূত করল তাঁকে। এই রুটি, পায়রা, ছেলে দুটোকে মনে হল অপার্থিব বস্তু। সবই ঘটল একই সময়ে’ঃ ছেলে ছুটে গেল পায়রার দিকে আর হেসে চেয়ে দেখল লেভিনকে; বাতাসে কম্পমান তুষারধূলির মধ্যে রোদে ঝকমক করে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে গেল পায়রা, আর জানালা থেকে ভেসে এল সেঁকা রুটির গন্ধ, রেখে দেওয়া হল বান রুটি। এসব কিছু একসাথে এত সন্দুর লাগল যে আনন্দে লেভিন হেসে উঠলেন, কেঁদে ফেললেন। গাজেনি গলি আর কিসলোঙ্কায় একটা বড় চক্কর দিয়ে তিনি আবার ফিরলেন হোটেলে, ঘড়ি সামনে রেখে অপেক্ষা করতে লাগলেন কখন বাজবে বারোটা। পাশের কামরায় কথা হচ্ছিল যন্ত্রপাতি আর ঠকবাজি নিয়ে, সকালবেলার কাশি শোনা যাচ্ছিল। তারা বুঝতেই পারছে না যে ঘড়ির কাঁটা সরে আসছে বারোটার ঘরে। সরেও এল। লেভিন বেরিয়ে এলেন গাড়িবারান্দায়। বোঝাই যায় যে গাড়োয়ানরা সবই যেন জানত। সহর্ষ আনন্দে তারা লেভিনকে ঘিরে বচসা করতে লাগল নিজেদের মধ্যে, সবাই তারই গাড়িতে যাবার অনুরোধ করল লেভিনকে। কারো মনে আঘাত না দেবার চেষ্টা করে তাদের গাড়িতেও যাবে এই প্রতশ্রুতি দিয়ে লেভিন একটা গাড়ি নিয়ে বললেন শ্যেরবাৎস্কিদের ওখানে যেতে। গাড়োয়ানটি চমৎকার, কাফতানের তল থেকে বেরিয়ে আসা কামিজের সাদা কলারে ঘেরা রক্তোজ্জ্বল, তেজী গর্দান স্লেজটা তার উঁচু, আয়েসী, এমন স্লেজে পরে আর কখনো লেভিন ওঠেননি, ঘোড়াও সুন্দর, চেষ্টা করছিল স্লেজ টানার, কিন্তু নড়ছিল না জায়গা থেকে। গাড়োয়ান শ্যেরবাৎস্কিদের বাড়ি চিনত, আরোহীর প্রতি বিশেষ সম্মান জানিয়ে হাত ঘের করে, ‘পুরু’ বলে গাড়ি থামাল গাড়িবারান্দার কাছে। শ্যেরবাৎস্কিদের চাপরাশি নিশ্চয় সব জানত। সেটা বোঝা গেল তার চোখের হাসি আর কথা থেকে : ‘অনেকদিন আসা হয়নি, কনস্তান্তিন দৃদ্মিত্রিচ!’
সবই সে জানত শুধু তাই নয়, স্পষ্টতই বেশ উল্লসিত বোধ করছিল সে, চেষ্টা করছিল নিজের আনন্দ লুকিয়ে রাখার। তার বৃদ্ধ সহৃদয় চোখের দিকে চেয়ে লেভিন সুখে আরো নতুন কিছু-একটার স্বাদ পেলেন।
‘সবাই উঠেছেন?’
‘জ্বি, যান ভেতরে। আর এটা এখানেই রেখে যান’, লেভিন যখন তাঁর টুপি সাথে নেবার জন্য ফিরতে আসছিলেন, সে বলল। এটারও অর্থ আছে কিছু।
‘কাকে খবর দেব?’ জিজ্ঞেস করল চাকর।
চাকরটা ছোকরা আর নতুন চাকরদের মত কিছু সাহেব গোছের হলেও বেশ সজ্জন, ভালামানুষ, সেও সব বুঝতে পারছিল।
লেভিন বললেন, ‘প্রিন্স-মহিষী… প্রিন্স… প্রিন্স কন্যাকে … ‘
প্রথম যে ব্যক্তিটিকে তিনি দেখলেন, তিনি মাদমোয়াজেল লিনোঁ। মুখ আর কোঁকড়া চুল জ্বলজ্বলিয়ে তিনি আসছিলেন হল পেরিয়ে। তাঁর সাথে কথা বলতে না বলতেই হঠাৎ দরজার বাইরে শোনা গেল পোশাকের খসখস শব্দ, মাদমোয়াজেল লিনোঁও পলকে আদৃশ্য হলেন লেভিনের দৃষ্টিপথ থেকে, সুখের সান্নিধ্যের একটা সানন্দ আতংক অভিভূত করল তাঁকে। মাদমোয়াজেল লিনোঁ তাঁকে ছেড়ে রেখে তাড়াতাড়ি করে গেলেন অন্য দরজায়। আর তিনি যেতেই দ্রুত লগু পদক্ষেপ শোনা গেল মেজের পার্কেটে এবং তাঁর যা সুখ, তাঁর জীবন, তিনি নিজে, নিজের চেয়েও যা বেশি, এতদিন যার অপেক্ষা করেছেন তিনি, খুঁজছেন, দ্রুত তা কাছিয়ে এল তাঁর দিকে, এল না, অদৃশ্য কোন এক শক্তি ভাসিয়ে আনল তাকে।
তিনি দেখলেন শুধু তার চোখ—স্বচ্ছ, ন্যায়পর, তাঁর নিজের বুক যে আনন্দঘন ভালোবাসায় ভরা,
সেই ভালোবাসায় সে চোখ ত্রস্ত, জ্বলজ্বল করে সে চোখ ক্রমেই কাছিয়ে আসতে লাগল, ভালোবাসার দীপ্তিতে চোখ ধাঁধিয়ে দিলে লেভিনের। কিটি থামলে একেবারে লেভিনের কাছে,ত তাঁর গা ছুঁয়ে। হাত তার উঠে গিয়ে নামল লেভিনের কাঁধে।
যা সম্ভব সবই করল সে—ছুটে এল লেভিনের সানন্দে আত্মসমর্পণ করল। লেভিন আলিঙ্গন করলেন তাকে, যে মুখ চুম্বন ভিক্ষা করছিল, লেভিন তাঁর ঠোঁট চেপে ধরলেন সে মুখে।
কিটিও সারা রাত ঘুমায়নি। সেদিন সারা সকাল অপেক্ষা করেছে তাঁর জন্য। মা আর বাবা সম্মত ও তার সুখে সুখী হয়েছিলেন বিনা দ্বন্দ্বে। লেভিনের অপেক্ষা করছিল যে, চেয়েছিল নিজের ও তাঁর সুখের কথা সে তাঁকে জানাবে সর্বপ্রথম। একা তাঁর সাথে দেখা করার জন্য সে তৈরি হয়েছিল, সে কথাটা ভেবে তার আনন্দ হচ্ছিল, আবার সংকোচ হচ্ছিল, লজ্জা পাচ্ছিল, নিজেই জানত না কি সে করছে। লেভিনের পদশব্দ আর কণ্ঠস্বর তার কানে গিয়েছিল, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে সে অপেক্ষা করছিল কখন মাদমোয়াজেল লিনোঁ চলে যাবেন। চলে গেলেন তিনি। কোন কিছু না ভেবে, কি-কেন নিজেকে জিজ্ঞাসামাত্র না করে কিটি চলে গিয়েছিল তাঁর কাছে এবং যা করেছে সেটা করে ফেলল।
