‘সানন্দে’, বলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন তাঁর স্ত্রী ও শ্যালিকার খবর। আর তাঁর কাছে সি্ভ্য়াজ্স্কি শ্যালিকার কথাটা বিবাহের সাথে মিলে থাকায় একটা বিচিত্র ভাবানুষঙ্গে তাঁর মনে হল যে নিজের সুখের কথাটা শুনবার পক্ষে সি্ভ্য়াজ্স্কির স্ত্রী ও শ্যালিকার মত লোক আর হয় না। ওঁদের কাছে যেতে পারায় খুবই খুশি হলেন তিনি।
গ্রামে তাঁর বিষয়-আশয়ের খবর জিজ্ঞেস করলেন সি্ভ্য়াজ্স্কি, ইউরোপে যা যাওয়া যায়নি তেমন কোন উপায় পাবার সম্ভাবনায় বরাবরের মতই কোন আমল না দিয়ে, কিন্তু তাতেও এখন লেভিনের এতটুকু খারাপ লাগল না। বরং তাঁর মনে হল সি্ভ্য়াজ্স্কি সঠিক, তাঁর সমস্ত ব্যাপারটাই তুচ্ছ, নিজের সঠিকতার প্রতিপাদন যে আশ্চর্য নম্রতা ও কোমলতায় সি্ভ্য়াজ্স্কি এড়িয়ে যাচ্ছেন সেটা দেখতে পেলেন তিনি। লেভিনের মনে হল তাঁরা তাঁর সব কথা জানেন ও টের পাচ্ছেন কিন্তু বলল না শুধু ভদ্রতাবেশে। ওঁদের ওখানে তিনি রইলেন ঘণ্টা দু’তিন, কথা হল নানা বিষয় নিয়ে, কিন্তু একটা জিনিসেই তাঁর মন ছিল ভরা, খেয়ালই করেননি যে উনি ওঁদের ভয়ানক অতিষ্ঠ করে তুলছেন, বহুক্ষণ ঘুমাবার সময় হয়ে গেছে ওঁদের। হাই তুলতে তুলতে এবং বন্ধুর বিচিত্র মেজাজে অবাক হয়ে সি্ভ্য়াজ্স্কি তাঁকে এগিয়ে দিলেন প্রবেশ-কক্ষে পর্যন্ত। তখন একটা বেঘে গেছে। হোটেলের ফিরে অবশিষ্ট আরো দশ ঘণ্টা তাঁকে একা কাটাতে হবে ভেবে ভয় হল লেভিনের। বাতি জ্বালিয়ে দিয়ে অনিদ্রিত চাপরাশি চলে যেতে চাইছিল, কিন্তু লেভিন তাকে থামালেন। এটি এই ইয়েগরটি, লেভিন যাকে, খেয়ালই করেননি আগে, দেখা গেল খুবই বুদ্ধিমান, ভালো এবং বড় কথা, সহৃদয় লোক।
‘কি হল ইয়েগর, সারা রাত জেড়ে থাকা কঠিন, তাই না?’
‘কি করা যাবে! ওই আমাদের চাকরি। ভদ্রলোকের বাড়ি চাকরিতে ঝামেলা নেই, তবে এখানে পয়সা আছে।’
জানা গেল ইয়েগরের ঘর-সংসার আছে, তিনটা ছেলে আর, একটা মেয়ে, সেলাই করে, জিন বিক্রির দোকানে যে ছেলেটা কাজ করে তার সাথে মেয়েটার বিয়ে দিতে চায় সে।
এই উপলক্ষে লেভিন তাকে জানিয়ে দিলেন কি তিনি ভাবেন, বললেন যে বিয়ের ব্যাপারে প্রধান কথা হল ভালোবাসা, সেটা থাকলে সব সময়ই সুখী হওয়া যায়, কেননা সুখ থাকে কেবল নিজের মধ্যেই।
ইয়েগর মন দিয়ে শুনলে তাঁর কথা, বাহ্যত মনে হল লেভিনের কথাটা সে পুরোপুরি বুঝতে পেরেছে, কিন্তু তার সমর্থনে সে লেভিনের কাছে একেবারে অপ্রত্যাশিত যে কথাটা বলল সেটা হল এই যে : যখন সে থেকেছে ভালো মনিবদের সাথে, মনিবদের ব্যাপারে সব সময় সন্তুষ্ট থেকেছে সে, এখনো সে পুরোপুরি সন্তুষ্ট তার মনিবকে নিয়ে যদিও সে ফরাসি।
‘আশ্চর্য ভালোমানুষ’, মনে হল লেভিনের।
‘কিন্তু তুমি যখন বিয়ে করেছিলে ইয়েগর, ভালোবাসাতে বৌকে?’
‘ভালো না বাসরে চলে!’ জবাব দিলে ইয়েগর।
লেভিন দেখতে পেলেন যে ইয়েগরও একই রকম উচ্ছ্বসিত অবস্থায় আছে, বলতে চাইছে তার প্রাণের সব কিছু কথা।
‘আমার জীবনওটা আশ্চর্য বটে। ছেলেবেলা থেকে আমি…’ চোখ জ্বলজ্বল করে শুরু করল ইয়েগর, স্পষ্টতই লেভিনের উচ্ছ্বাসে সংক্রামিত হয়েছিল সে-ও, যেভাবে একজন হাই তুললে অন্যজনেরও হাই পায়।
কিন্তু এ সময় ঘণ্টি বাজল; ইয়েগর চলে গেল, লেভিন রইলেন একা। ডিনার তিনি প্রায় কিছুই খাননি, সি্ভ্য়াজ্স্কিদের ওখানে চা আর নৈশাহারও বাদ দিয়েছিলেন, কিন্তু খাবার কথা ভাবতে পারছিলেন না তিনি। আগের রাতে ঘুম হয়নি তাঁর, কিন্তু গুমোট লাগিছল। জানালার ওপরকার ছোট কপাট—দুটোই খুলে দিয়ে তিনি বসলেন তার সামনাসামনি। তুষারাবৃত চালগুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছিল শেকল ঝোলানো নশি ক্রশ আর তার ওপরে উদীয়মান ত্রিকোণ অরিগা নক্ষত্রমণ্ডলী আর জ্বলজ্বলে-হলুদ কাপেলা তারাটা। কখনো ক্রশ, কখনো তারাটাকে দেখছিলেন তিনি, তাজা, হিমেল হাওয়া টানছিলেন বুক ভরে, যা ঘরে ঢুকছিল তালে তালে এবং স্বপ্নের মত কল্পনায় ভেসে উঠতে লাগল স্মৃতি আর মূর্তি। রাত তিনটার পর পদশব্দ শোনা গেল করিডরে, উনি তাকিয়ে দেখলেন দরজা দিয়ে। তাঁর পরিচিত জুয়াড়ি মিয়াস্কিন ফিরছে ক্লাব থেকে। ফিরছিল সে মনমরার মত, কাশতে কাশতে। ‘বেচারি, হতভাগ্য!’ লেভিন ভাবলেন, লোকটার জন্য ভালোবাসা আর অনুকম্পায় চোখে পানি এসে গেল তাঁর। ভেবেছিলেন ওর সাথে কথা বলবেন, সান্ত্বনা দেবেন; কিন্তু মনে পড়ে গেল যে তিনি শুধু শার্ট পরে আছেন, তাই সে চিন্তা ছেড়ে আবার গিয়ে বসলেন জানালার কাছে শীতল বাতাসে অবগাহনের জন্য আর তাঁক কাছে ভারি তাৎপর্যময় ওই ক্রশটার অদ্ভুত আকার আর উদীয়মান জ্বলজ্বলে-হলুদ তারাটাকে দেখতে। ছ’টার পর শোনা গেল মেঝে-পালিশ করা লোকদের শব্দ, কি-একটা আরাধনার জন্য গির্জার ঘণ্টা, শীত-শীত করতে লাগল লেভিনের। ওপর-জানালা বন্ধ করে, হাত-মুখ ধুয়ে পোশাক পরে বাইরে বেরিয়ে এলেন তিনি।
আন্না কারেনিনা – ৪.১৫
তখনো রাস্তাটা ফাঁকা, শ্যেরবাৎস্কিদের বাড়িতে গেলেন লেভিন। সদর দরজা বন্ধ, সবাই ঘুমাচ্ছে। ফিরে এলেন তিনি হোটেলে, ঘরে গিয়ে কফি চাইলেন। ইয়েগর নয়, দিনের বেলাকার চাপরাশি তা নিয়ে এল। তার সাথে কথা বলার ইচ্ছে হয়েছিল লেভিনের, কিন্তু ঘণ্টি বেজে উঠল, চলে গেল সে। লেভিন চেষ্টা করলেন কফিটা খেতে, এক টুকরো বান রুটি মুখে দিলেন, কিন্তু সেটা নিয়ে কি করা যাবে, মুখ কিছুতেই তা বুঝতে পারছিল না। রুটিটা উগরে ফেলে ওভারকোট পরে আবার বেরোলেন লেভিন। শ্যেরবাৎস্কিদের বাড়ির গাড়িবারান্দার দ্বিতীয়বার যখন তিনি পৌঁছলেন, তখন ন’টা বেজে গেছে। বাড়ির লোকে সবে ঘুম থেকে উঠছে, বাবুর্চি গেল দোকানে। দরকার ছিল আরো দু’ঘণ্টা কাটানোর।
