‘কি, ধাঁধা—ধাঁধা খেলা হচ্ছে?’ কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন বৃদ্ধ প্রিন্স, ‘তবে সময় মত থিয়েটারে যেতে হলে এখন রওনা দিতে হয়।’
লেভিন উঠে দাঁড়িয়ে কিটিকে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন।
তাঁদের কথাগুলোয় সবই বলা হয়ে গিয়েছিল; বলা যে কিটি ভালোবাসে লেভিনকে, বাপ-মাকে সে কথা সে জানাবে; লেভিন তাঁদের বাড়িতে আসবে পরদিন সকালে।
চৌদ্দ
কিটি চলে যাওয়ার পর তাকে ছাড়া এক লেভিনের এতই অস্থিরতা, আবার যখন তাঁদের দেখা এবং চিরকালের জন্য মিলন হবে, আগামী কালের সেই সকালটার জন্য এতই অসহিষ্ণুতা বোধ হচ্ছিল যে কিটিকে ছাড়া এই যে চোদ্দটা ঘণ্টা তাঁকে কাটাতে হবে তাতে আতংক হচ্ছিল তাঁর, যেন সাক্ষাৎ যম এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। একা যাতে না থাকতে হয়, সময়কে যাতে ছলনা করা যায় তার জন্য তাঁর প্রয়োজন ছিল কারো সাথে থাকা, কথা বলা। তাঁর কাছে সবচেয়ে মনোহর সহালাপী ছিলেন অব্লোন্স্কি, কিন্তু তিনি চলে গেলেন, ওঁর কথায়, কোন একটা সান্ধ্যবাসরে, কিন্তু আসরে ব্যালেতে। লেভিন শুধু এটুকু বলবার ফুসরত পেলেন যে তিনি সুখী, তাঁকে তিনি ভালোবাসেন এবং কখনো কখনো ভুলবেন না তাঁর জন্য যা তিনি করেছেন। অব্লোন্স্কির দৃষ্টি ও হাসি থেকে লেভিন টের পেলেন যে বন্ধু তাঁর এ অনুভূতিটাকে বেশ বুঝতে পারছেন।
‘কি মরার সময় হয়নি তাহলে?’ লেভিনের মর্মস্পর্শী করমর্দন করে বললেন অব্লোন্স্কি।
লেভিন বললেন, ‘মোটেই না!’
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনাও তাঁকে বিদায় দিতে গিয়ে অভিনন্দনের সুরে বললেন : ‘কিটির সাথে আপনার আবার দেখা হওয়ায় ভারি আনন্দ হল আমার, অনেকদিনকার ভাব, তার কদর করা উচিত।’
কিন্তু দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার এ কথাগুলো লেভিনের ভালো লাগল না। এটা যে তাঁর অয়নাত্ত কত এর ব্যাপার সেটা বুঝতে পারেন না তিনি, ও কথা উল্লেখের স্পর্ধা করা উচিত হয়নি তাঁর।
ওঁদের কাছ থেকে বিদায় নিলেন লেভিন, কিন্তু একা যাতে না থাকতে হয়, তার জন্য বড় ভাইয়ের সঙ্গ ধরলেন। ‘কোথায় যাচ্ছ তুমি?’
‘আমি—বৈঠকে।’
‘আমিও যাব তোমার সাথে। আপনি নেই?’
‘আপত্তি কিসের? চল যাই’, হেসে বললেন কজ্নিশেভ, ‘আজ তোর হয়েছে কি বল তো?’
‘আমার? সৌভাগ্যের উদয় হয়েছে আমার?’ যে গাড়িতে তাঁরা যাচ্ছিলেন তার জানালার কপাট নামিয়ে দিয়ে লেভিন বললেন, ‘তোমার অসুবিধা হবে না তো? নইলে বড় গুমোট। আমার সৌভাগ্যোদয় হয়েছে! তুমি কখনো বিয়ে করলে না কেন বল তো?’
সের্গেই ইভানোভিচ কজ্নিশেভ হাসলেন। ‘ভারি খুশি হলাম মেয়েটা মনে হয় চমৎ…’ শুরু করতে যাচ্ছিলেন কজ্নিশেভ।
‘ও কথা নয়, ও কথা নয়, ও কথা নয়!’ দুই হাতে তাঁর ফার কোটের কলার চেপে ধরে ওঁর মুখ বন্ধ করে চেঁচিয়ে উঠলেন লেভিন। ‘চমৎকার মেয়ে’ কথাটা বড়ই মামুলি, তুচ্ছ। তাঁর হৃয়দাবেগের অনুপযোগী।
ফুর্তিতে হাসলেন কজ্নিশেভ, যা তাঁর ক্ষেত্রে ঘটে কদাচিৎ।
‘তাহলেও এটুকু তো বলতে পারি যে আমি এতে খুবই খুশি।’
‘সেটা হতে পারে কাল, কালকে; এখন আর কিছু নয়! কিছু নয়, কিছু নয়, চুপ!’ ফার কলার দিয়ে আরেকবার তাঁর মুখ বন্ধ করে লেভিন বললেন, ‘তোমাকে আমি ভারি ভালোবাসি! কি, তোমাদের বৈঠকে যেতে পারি?’
‘বলাই বাহুল্য, নিশ্চয় প্যারিস।’
‘আজ, তোমাদের আলোচনা হবে কি নিয়ে?’ হাসি না থামিয়ে জিজ্ঞেস করলেন লেভিন।
এলেন তাঁরা অধিবেশনে। তোতলাতে তোতলাতে কর্মসচিব আলোচ্যসূচি পড়ে শোনালেন, যেটা স্পষ্টতই তাঁর নিজের কাছেই বোধগম্য ছিল না; কিন্তু সচিবের মুখ থেকেই লেভিন বুঝতে পারলেন কি মিষ্টি, সহৃদয়, চমৎকার মানুষ তিনি। আলোচ্যসূচি পড়তে গিয়ে যেভাবে তিনি থতমত খাচ্ছিলেন, গুলিয়ে ফেলছিলেন তা থেকে ই সেটা বোঝা যাচ্ছিল। তারপর শুরু হল বক্তৃতা। কি একটা টাকা বরান্দ আর কি-সব পাইপ বসানো নিয়ে তর্ক হচ্ছিল। দুজন সদস্যকে বিষ-কামড় দিয়ে বিজয়ের ভাব নিয়ে কজ্নিশেভ কি যেন বললেন অনেকক্ষণ ধরে; অন্য একজন সদস্য কাগজে কি-সব জুকে নিয়ে প্রথমে শুরু করলেন সসংকোচে কিন্তু পরে মোক্ষম জবাব দিলেন বেশ পিত্তি জ্বলিয়ে তারপর য়িাজইস্কও (তিনিও ছিলেন সেখানে) কি-কি বললেন ভারি সুন্দর করে, উদার স্বরে। লেভিন এসব শুনে পরিষ্কার দেখতে পেলেন যে এসব টাকা বরাদ্দ আর পাইন কিছুই নয়, সদস্যরা মোটেই রাগারাগি করছেন না, সবাই তাঁরা ভারি ভালো, চমৎকার লোক, তাঁদের মধ্যে সবই চলছে বেশ ভালোভাবেই। কেউ কাউকে বাধা দিচ্ছেন না, সবাই সুপ্রসন্ন। লেভিনের পক্ষে বিশেষ আকর্ষক হয়েছিল এই যে তিনি আজ সবার ভেতরটা পর্যন্ত দেখতে পাচ্ছিলেন, আগে যা তাঁর লক্ষ্যে পড়ে নি এমন সব ছোট ছোট লক্ষণ থেকে তিনি প্রত্যেকের অন্তরটা জানতে পারছিলেন এবং পরিষ্কার দেখলেন যে তাঁরা সবাই সহৃদয় লোক। বিশেষ করে তাঁকে, লেভিনকে, ওঁরা আজ সবাই খুব ভালোবাসছেন। যেভাবে তাঁর কথা কইছিলেন তাঁর সাথে, কি সাদরে, সৌজন্যসহকারে তাঁর দিকে চাইছিলেন এমন কি অপরিচিতরাও, তা থেকে সেটা বোঝা যাচ্ছিল।
কজ্নিশেভ জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি খুশি হয়েছিস?’
‘খুবই। আমি কখনো ভাবিনি যে এত ভালো লাগবে! চমৎকার!’
সি্ভ্য়াজ্স্কি লেভিনের কাছে এসে তাঁকে চা-পানে ডাকলেন। সি্ভ্য়াজ্স্কি ওপর লেভিন অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন কেন, কি তাঁর মধ্যে তিনি চেয়েছিলেন, সেটা বুঝতে বা স্মরণ করতে লেভিন পারলেন না কিছুতেই। এ যে ভারি বুদ্ধিমান, আশ্চর্য সদাশয় মানুষ
