কিটি কপাল কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করছিল। কিন্তু লেভিন বোঝতে শুরু করা মাত্রই বুঝে ফেলেছিল কিটি।
‘বুঝতে পারছি, জানতে হবে কি জন্যে তর্ক করছে, কি তার পছন্দ, তাহলে…’
লেভিন যে ভাবনাটা ভালো করে প্রকাশ করতে পারেননি সেটা পুরোপুরি অনুমান করে প্রকাশ করলে কিটি। আনন্দে হাসলেন লেভিন : পেস্তসোভ আর বড় ভাইয়ের সাথে শব্দবহুল গোলমেলে তর্কটা থেকে অমি জটিল ভাবনার অতি সংক্ষিপ্ত ও পরিষ্কার, যাতে প্রায় শব্দ নেই বললেই চলে, এমন একটা বিবৃতিতে পৌঁছে যাওয়ায় অভিভূত হয়েছিলেন তিনি।
শ্যেরবাৎস্কি সরে গেল ওঁদের কাছ থেকে আর তাস খেলার জন্য যে টেচিল পাতা হয়েছিল কিটি গিয়ে বসল সেখানে, একটা চকখড়ি নিয়ে নতুন সবুজ টেবিল-ঢাকা জাজিমের ওপর একটার পর একটা বৃত্ত আঁকতে লাগল। ডিনারের সময় যে আলাপটা শুরু হয়েছিল সেটার পুনরারম্ভ করল তারা, যথা মেয়েদের স্বাধীনতা আর কাজ। যে মেয়ে বিয়ে করেনি সে কোন পরিবারের নারীসুলভ কাজ জুটিয়ে নিতে পারে, দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার এ মতটায় সায় ছিল লেভিনের। জোর দিয়ে তিনি বললেন যে সাহায্যকারিণী ছাড়া কোন সংসারেরই চলে না, ধনী, গরিব সমস্ত সংসারেই আছে, থাকা উচিত মাইনে করা অথবা আত্মীয় কোন আয়া।
‘না’, লাল হয়ে এবং তাতে করে আরো অসংকোচে লেভিনের দিকে তার ন্যায়পরায়ণ চোখ মেলে কিটি বললেন, ‘মেয়ে এমন অবস্থায় পড়তে পারে যে হীনতা স্বীকার না করে সে কোন পরিবারের কাজ নিতে পারে না আর নিজে সে… ‘
লেভিন বুঝলেন তার ইঙ্গিত। বললেন, ‘ও, হ্যাঁ-হ্যাঁ-হ্যাঁ। আপনি ঠিক বলেছেন, ঠিকই বলেছেন!’
ডিনার টেবিলে নারী স্বাধীনতা নিয়ে পেস্তসোভ যা প্রমাণ করতে চাইছিলেন সেটা সবই লেভিনের বোধগম্য হয়ে গেল শুধু এই কারণে যে কিটির মধ্যে দেখতে পেলেন কুমারীত্ব ও হীনতাস্বীকারের ভয়, আর তাকে ভালোবাসায় নিজেই সে ভয় আর হীনতাটা অনুভব করে তৎক্ষণাৎ বাতিল করে দিলেন নিজের যুক্তি।
নীরবতা নামল। খড়ি দিয়ে কিটি কেবলই দাগ দিয়ে যাচ্ছিল টেবিলে। চোখ তার জ্বলজ্বল করছিল একটা শান্ত দীপ্তিতে। তার মেজাজে নিজেকে সঁপে দিয়ে লেভিন তাঁর সমগ্র সত্তায় অনুভব করছিলেন সুখের একটা ক্রমবর্ধমান চাপ।
‘যাঃ, গোটা টেবিলটায আঁকিবুকি কেটে ফেলেছি!’ এই বলে খড়ি রেখে সে যেন উঠবার উপক্রম করল। ‘ওকে ছাড়া আমি একটা থাকব কি করে?’ সভয়ে মনে হল লেভিনের। খড়িটা নিয়ে টেবিলের কাছে বসে বললেন, ‘একটু দাঁড়ান, অনেকদিন থেকে আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব ভাবছিলাম।’
সোজাসুজি তিনি চাইলেন কিটির সস্নেহ, তবু ত্রস্ত চোখের দিকে।
‘বেশ তো, জিজ্ঞেস করুন।
’এটা’, বলে তিনি লিখলেন শব্দের আদ্যক্ষরগুলো : আ. য. ব. য. হ. পা. না. সে. কি. ব. ম. না. ত. জ? অক্ষরগুলোর অর্থ : ‘আপনি যখন বলেছিলেন যে হতে পারে না, সেটা কি বরাবরের মত, নাকি তখনকার জন্যে?’ জটিল এই বাক্যটা কিটি বুঝতে পারবে এমন কোন নিশ্চয়তা ছিল না; তার দিকে লেভিন তাকিয়ে রইলেন এমন ভাব করে যেন কথাগুলো সে বুঝবে কিনা, তার ওপর নির্ভর করছে তাঁর জীবন।
গম্ভীরভাবে কিটি চাইল তাঁর দিকে, তারপর হাতের ওপর কুঞ্চিত কপাল ভর দিয়ে পড়তে লাগল অক্ষরগুলো। মাঝে মাঝে সে লেভিনের দিকে তাকিয়ে যেন বলচ্ছিল : ‘আমি যা ভাবছি সেটা ঠিক?’
লাল হয়ে উঠে সে বলল, ‘বুঝতে পেরেছি।’
যে কথাটায় বলা হয়েছে ‘বরাবরের মত’ সে অক্ষরটা দেখিয়ে লেভিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কি শব্দ?’
‘বরাবরের মত’, কিটি বলল, ‘কিন্তু ওটা ঠিক নয়!’
তাড়াতাড়ি অক্ষরগুলো মুছে লেভিন উঠে দাঁড়িয়ে কিটিকে খড়িটা দিলেন। সে লিখল : ত. আ. আ. জ. দি. পা, না.।
কারেনিনের সাথে কথাবার্তা থেকে ডল্লি যে কষ্ট পেয়েছিলেন তার ভার একেবারে নেমে গেল যখন দেখলেন এই যুগল মূর্তিকে : খড়ি হাতে, ভীরু-ভীরু, সুখের হাসি নিয়ে কিটি চোখ তুলে আছে লেভিনের দিকে, আর তাঁর সুকুমার দেহ নুয়ে আছে টেবিলের ওপর, দীপ্ত চোখ কখনো নিবদ্ধ টেবিলে, কখনো কিটির দিকে। হঠাৎ জ্বলজ্বল করে উঠলেন তিনি : বুঝতে পেরেছেন। অক্ষরগুলোর অর্থ : ‘তখন আমি অন্য জবাব দিতে পারতাম না!’
কিটির দিকে তিনি চাইলেন সপ্রশ্ন ভীরু, দৃষ্টিতে।
‘শুধু তখন?’
‘হ্যাঁ’, জবাব দিলে কিটির হাসি।
‘বেশ, পড়ে দেখুন। যা চেয়েছি, খুবই যা চেয়েছি, সেটা বলব!’ কিটি লিখল : যা. ঘ. তা. যে. আ. ভু. যা. ক্ষ. ক। অক্ষরগুলোর অর্থ : ‘যা ঘটেছিল তা যেন আপনি ভুলে যান ক্ষমা করেন।’
উত্তেজিত হাতে লেভিন খড়ি নিয়ে সেটাকে ভেঙে কাঁপা কাঁপা আঙুলে লিখলেন এই বাক্যটার আদ্যক্ষরঃ ‘ভুলে যাবার, ক্ষমা করার কিছু নেই আমার, আপনাকে ভালোবাসতে কখনো ক্ষান্ত হইনি আমি।’
তাঁর দিকে নিবদ্ধ হাসি নিয়ে কিটি চাইল।
ফিসফিসিয়ে বলল, ‘বুঝতে পেরেছি।’
লেভিন বসে লিখলেন লম্বা একটা বাক্য। কিটি বুঝল এবং ‘তাই না?’ জিজ্ঞেস না করেই তখনই জবাব লিখল তার।
কি সে লিখেছে তা বহুক্ষণ বুঝে উঠতে পারেননি লেভিন, ঘন ঘন চাইছিলেন তার চোখের দিকে। সুখে আঁধার হয়ে আসছিল তাঁর চিন্তা। কিটি যা বোঝাতে চেয়েছে সে শব্দগুলো তিনি কিছুতেই ধরতে পারছিলেন না; কিন্তু তাঁর যা জানা দরকার ছিল তা সবই বুঝলেন কিটি সুখোজ্জ্বল মধুর চোখ থেকে। তাঁর তিনটা অক্ষর লেখা শেষ না হতেই কিটি তা পড়ে ফেলে বাক্যটা শেষ করে উত্তর দিল : ‘হ্যাঁ।’
