অবলোনস্কির ওপর থেকে তাঁর গভীরে প্রোজ্জ্বল দৃষ্টি না সরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন লেভিন, ‘আন্দাজ করতে পেরেছ?
‘আন্দাজ করেছি, কিন্তু এ নিয়ে কথা পাড়তে পারছি না। এ থেকেই তুমি বুঝবে আমি ঠিক ধরেছি কি না, অবলোনস্কি লেভিনের দিকে তাকিয়ে বললেন সূক্ষ্ম হাসিতে।
‘কিন্তু তুমি কি বলে? কম্পিত কণ্ঠে লেভিন বললেন, টের পাচ্ছিলেন যে তাঁর মুখের পেশী কেঁপে কেঁপে উঠছে। ‘তোমার কি মনে হচ্ছে,
লেভিনের চোখ থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে ধীরে ধীরে শাবলির গেলাস নিঃশেষ করে অবলোনস্কি বললেন : ‘আমি? এর চেয়ে ভালো আর কিছু আমার চাইবার নেই। যা হওয়া সম্ভব তা ভেতর এটাই শ্রেয়।
‘কিন্তু তোমার ভুল হচ্ছে না তো? কি নিয়ে আমরা কথা বলছি তা জান তুমি? স্থির দৃষ্টিতে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে লেভিন বলে উঠলেন, ‘তুমি কি ভাব এটা সম্ভব?
ভাবি যে সম্ভব। অসম্ভব হবে কেন?
‘আরে না-না, সত্যিই তুমি ভাবছ যে এটা সম্ভব না-না, তুমি যা ভাবছ সবটুকু খুলে বল। কিন্তু যদি, যদি প্রত্যাখ্যান আমার কপালে থাকে… আমি এমন কি নিশ্চিতই যে…’
তার আকুলতায় হেসে ফেলে অবলোনস্কি বললেন, কেন ও কথা ভাবছ তুমি?
মাঝে মাঝে আমার এরকমই মনে হয়। তাহলে সেটা যে একটা ভয়াবহ ব্যাপার হবে ওর কাছেও, আমার কাছেও।
মানে, মেয়েদের কাছে অন্তত এক্ষেত্রে ভয়াবহ কিছু নেই, পাণিপ্রার্থনায় প্রত্যেক মেয়েই গর্বিত বোধ করে।
‘হ্যাঁ প্রত্যেকে, কিন্তু সে নয়।’
অবলোনস্কি হাসলেন। লেভিনের এই আবেগপ্রবণতা তিনি বেশ বোঝেন, জানেন যে ওঁর কাছে বিশ্বের সমস্ত মেয়ে দুভাগে বিভক্ত। এক দলে পড়ে কিটি ছাড়া আর সব মেয়ে, সব কিছু মানবিক দুর্বলতা আছে তাদের, অতি মামুলী মেয়ে সব; দ্বিতীয় দলে পড়ে শুধু সে, কোনরকম দুর্বলতা যার নেই, সমস্ত মানবজাতির সে অনেক উর্ধ্বে।
‘আরে দাঁড়াও’, লেভিনের হাত চেপে ধরে তিনি বললেন, সসের পাত্রটা লেভিন ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিলেন, সস্ নাও।’
বাধ্যের মত লেভিন সস্ নিলেন, কিন্তু অবলোনস্কিকে খাওয়ার ফুরসত দিলেন না। বললেন : ‘আরে না, না, একটু রোসো তো তুমি। বুঝতে তো পারছ এটা আমার কাছে জীবন-মরণের প্রশ্ন। কারো সাথে কখনো এ নিয়ে কথা বলিনি। তাছাড়া তোমার সাথে যেমন তেমন ভাবে আর কারো সাথেই কথা বলতে পারি না আমি। দেখো, তুমি আর আমি একেবারে ভিন্ন লোক, রুচিতে, দৃষ্টিভঙ্গিতে, সব কিছুতেই; কিন্তু আমি জানি যে তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমাকে বোঝো আর এই জন্যই দারুণ ভালোবাসি তোমাকে। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার দোহাই, একেবারে খোলাখুলি সব বলো।’
যা ভাবছি তাই তো তোমাকে বলছি, হেসে বললেন অবলোনস্কি, কিন্তু তোমাকে আর বেশিকিছু বলব? আমার স্ত্রী আশ্চর্য মহিলা’, স্ত্রীর সাথে নিজের সম্পর্কের কথা মনে পড়ায় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি, তারপর এক মিনিট চুপ করে বলে গেলেন : ‘ওর দিব্যদৃষ্টি আছে, লোকের অন্তর ভেদ করে সে দেখতে পায় তাই নয়। কি ঘটবে তাও তার জানা থাকে, বিশেষ করে বিবাহাদি ব্যাপারে। যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে শাখোস্কায়া ব্রেনতেকে বিয়ে করবে। কারুর বিশ্বাস হতে চাইছিল না, কিন্তু ঘটল ঠিক তাই-ই। আর সে তোমার পক্ষে।
তার মানে!
মানে এই যে তোমাকে সে ভালোবাসে তাই নয়, বলছে যে কিটি অবশ্য-অবশ্যই হবে তোমার বউ।
এ কথায় লেভিনের মুখ উদ্ভাসিত হয়ে উঠল যে হাসিতে সেটা চরিতার্থতার অশ্রুকণার সামিল।
‘এই কথা সে বলছে! চেঁচিয়ে উঠলেন লেভিন, আমি সব সময়ই বলে এসেছি যে অতি চমৎকার লোক তোমার বউটি, কিন্তু যথেষ্ট হল এ সব কথা, উঠে দাঁড়িয়ে লেভিন বললেন।
‘বেশ, কিন্তু বসো তো।’
দৃঢ় পদক্ষেপে লেভিন পিঞ্জরাকৃতি ঘরখানায় দু’বার পায়চারি করলেন, চোখ পিটপিট করলেন যাতে অশ্রু দেখা যায় এবং কেবল তারপরেই ফিরে এলেন নিজের আসনে। বললেন, বুঝতে পারছ, প্রেম নয় এটা। প্রেমে আমি পড়েছি, কিন্তু এটা সে জিনিস নয়। আমার নিজের অনুভূতি এটা নয়, বাইরেকার কি-একটা শক্তি আচ্ছন্ন করেছিল আমাকে। আমি তো চলেই গেলাম, কেননা ঠিক করলাম ও সব হবে না, বুঝেছ, ওটা পৃথিবীতে যা হয় না তেমন একটা সুখ; নিচের সাথে লড়াই চালিয়েছি আমি, এখন দেখতে পাচ্ছি ওটা ছাড়া জীবন অর্থহীন। ফয়সালা করা দরকার…’
‘কিন্তু তুমি চলে গিয়েছিলে কেন?
‘আহ্ দাঁড়াও! ইস্, কত যে ভাবনা ঘুরছে মাথায়! কত কি জিজ্ঞেস করার আছে! শোন বলি, এই-যে বললে, এতে যে কি করে দিলে আমাকে তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। এতই আমি সুখী যে জানোয়ারই বনে গেছি । সব ভুলে গিয়েছিলাম। আজকে আমি শুনলাম যে নিকোলাই ভাই…জানো তো, সে এখানে… অথচ তার কথা ভুলে গেছি। আমার মনে হয় সেও যেন সুখী। ওটা একটা পাগলামি গোছের। কিন্তু একটা জিনিস সাঘাতিক… এই যেমন তুমি বিয়ে করেছ, এই অনুভূতিটা তোমার জানা আছে… এটা সাঘাতিক যে আমরা বয়স্ক, প্রেমের পথ নয়, পাপের পথ অতিক্রম করে এসেছি, হঠাৎ মিলিত হতে যাচ্ছি নিষ্পাপ, নিষ্কলংক একটা প্রাণীর সাথে; এটা বীভৎসতা, তাই নিজেকে অযোগ্য বলে না ভেবে পারা যায় না।
‘তোমার পাপ তো তেমন বেশি নয়।
‘আহ্, তাহলেও’, লেভিন বললেন, তাহলে, নিজের জীবনের পাতাগুলো পড়তে গিয়ে আমি কেঁপে উঠি, অভিশাপ দিই, তিক্ত বিলাপ করি…’ হ্যাঁ!
