‘কি আমি করতে পারি?’ কাঁধ আর ভুরু উঁচিয়ে বললেন কারেনিন। স্ত্রীর শেষ অপরাধের স্মৃতিটা তাঁকে এতই উত্ত্যক্ত করছিল যে, কথা শুরুর সময়ের মত আবার নিরুত্তাপ হয়ে গেলেন তিনি। ‘আপনার সহানুভূতির জন্যে আমি আপনার কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, কিন্তু সময় হয়ে গেছে আমার’, উঠে দাঁড়িয়ে বললেন তিনি 1
‘না-না, একটু দাঁড়ান! ওকে ধ্বংস করা আপনার উচিত নয়। দাঁড়ান, আমি নিজের সম্পর্কে আপনাকে বলি। বিয়ে করলাম, কিন্তু স্বামী আমাকে ছলনা করে; রাগে দুঃখ আমি সব কিছু বিসর্জন দিতে চেয়েছিলাম, নিজেই আমি চেয়েছিলাম তা…কিন্তু চৈতন্যোদয় হল। কে করালে? আন্না বাঁচালে আমাকে। তারপর এই তো বেশ চলে যাচ্ছে। বেড়ে উঠছে ছেলেমেয়েরা, স্বামী পরিবারের কাছে ফিরে আসছে, বুঝতে পারছে নিজের অন্যায়, হয়ে উঠছে অনেক শুদ্ধ, ভালো, আমিও বেঁচে আছি…আমি ক্ষমা করেছিলাম, আপনাকেও ক্ষমা করতে হবে!’
কারেনিন শুনে গেলেন, কিন্তু ডল্লির কথা আর প্রভাবিত করছিল না তাঁকে। মনের মধ্যে তাঁর আবার ফুঁসে উঠল সেদিনের সমস্ত বিদ্বেষ যখন বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। গা ঝাড়া দিয়ে তিনি উচ্চ খনখনে গলায় কথা বলতে লাগলেন : ‘ক্ষমা আমি করতে পারি না এবং চাই না, সেটাকে আমি অন্যায় বলে মনে করি। এই নারীটির জন্যে আমি করেছি সব কিছু, সেটা সে তার স্বভাবসিদ্ধ কাদায় চটকেছে। আমি আক্রোশপরায়ণ লোক নই, কখনো ঘৃণা করিনি কাউকে, কিন্তু ওকে আমি প্রাণপণে ঘৃণা করি, এমন কি তাকে ক্ষমা করতেও পারি না। কেননা আমার যে অপকার সে করেছে, তার জন্যে তাকে ঘৃণা করি বড় বেশি!’ বিদ্বেষে রুদ্ধকণ্ঠ হয়ে বললেন তিনি।
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা সসংকোচে ফিসফিস করে বললেন, ‘যারা তোমাকে ঘৃণা করে তাদের ভালোবেসে…’, ঘৃণাভরে মুচকি হাসলেন কারেনিন। কথাটা তাঁর অনেকদিন থেকেই জানা, কিন্তু এটা তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে না।
‘তোমাকে যারা ঘৃণা করে তাদের ভালোবেসে তা ঠিক, কিন্তু তুমি যাদের ঘৃণা কর তাদের ভালোবাসা যায় না। আপনার মনে যে ব্যথা দিলাম সে জন্যে মাপ করবেন। প্রত্যেকেরই নিজ নিজ কষ্ট আছে যথেষ্ট!’ আত্মসংবরণ করে শান্তভাবে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন কারেনিন।
তেরো
টেবিল ছেড়ে সবাই যখন উঠলেন, লেভিনের ইচ্ছে হয়েছিল কিটির সাথে ড্রয়িং-রুমে যাবেন; কিন্তু ভয় হল, তার প্রতি বড় বেশি সুস্পষ্ট মনোযোগ প্রদর্শনে কিটি আবার রাগ না করে। পুরুষদের দলটার সাথেই তিনি থেকে গেলেন, যোগ দিলেন সাধারণ আলাপটায়, এবং কিটির দিকে না তাকিয়েও অনুভব করছিলেন তার গতিভঙ্গি, তার দৃষ্টি, ড্রয়িং- রুমের সেই জায়গাটা যেখানে সে ছিল।
তিনি তার নিজের ওপর এতটুকু জোর না খাটিয়ে তখনই পালন করতে লাগলেন যে প্রতিশ্রুতি কিটিকে তিনি দিয়েছিলেন—সবার সম্পর্কে সব সময় তাদের ভালো দিকটার কথা ভাবতে হবে, সব সময় ভালোবাসতে হবে সবাইকে। আলাপ চলছিল রুশী পল্লীসমাজ নিয়ে। পেস্তসোভ তার ভেতর কি একটা বিশেষ সূচনা দেখতে পাচ্ছিলেন, তার নাম তিনি দিয়েছেন ঐকতানীয় সূচনা। লেভিনের অমত ছিল পেসোভের সাথেও, বড় ভাইয়ের সাথেও, যিনি নিজের ধরনে রুশী পল্লীসমাজের গুরুত্ব মেনেও নিচ্ছিলেন, আবার মানছিলেনও না। তবে লেভিন ওঁদের সাথে কথা বললেন তাঁদের মধ্যে আপোস করিয়ে দিয়ে মতভেদ নরম করিয়ে আনার চেষ্টা করে। তিনি নিজে কি বললেন তাতে তাঁর বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না আর ওঁর যা বলছেন তাতে তাঁর আগ্রহ ছিল আরো কম, তিনি চাইছিলেন শুধু একটা জিনিস—তাঁরও এবং ওঁদেরও যেন ভালো হয়। এখন তিনি জেনেছেন শুধু কোন্ জিনিসটা গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই জিনিসটা প্রথমে ছিল ওখানে, ড্রয়িং-রুমে, তারপর চলতে চলতে এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। ফিরে না চেয়েও তিনি টের পাচ্ছিলেন তাঁর প্রতি নিবদ্ধ দৃষ্টি আর হাসি, তাই না চেয়ে পারলেন না। শ্যেরবাৎস্কির সাথে কিটি দাঁড়িয়ে ছিল দোরগোড়ায়, চাইছিল তাঁর দিকে।
তার কাছে গিয়ে লেভিন বললেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আপনি পিয়ানো বাজাতে যাচ্ছেন। গাঁয়ে এই জিনিসটা আমি পাই না—সঙ্গীত।’
কিটি হাসির উপহারে তাঁকে ভূষিত করে বলল, ‘না, আমরা এসেছি আপনাকে ডেকে নিয়ে যেতে আর এসেছেন বলে ধন্যবাদ জানাতে। তর্কের কি যে এত শখ? একজন অন্যজনকে স্বমতে আনতে তো পারবে না কখনো।’
লেভিন বললেন, ‘তা ঠিক, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই হয় যে উত্তপ্ত তর্কটা চলে কারণ প্রতিপক্ষ কি বলতে চাইছ সেটা কোনক্রমেই বোঝা হয় না।’
বেশি বুদ্ধিমান লোকদের মধ্যে তর্কে লেভিন প্রায়ই লক্ষ্য করেছেন যে প্রচুর প্রয়াস এবং ভুরিভুরি সূক্ষ্ম যুক্তি ও বাক্যের পর তার্কিকেরা শেষ পর্যন্ত এই চেতনায় পৌঁছায় যে পরস্পরের কাছে যে তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করছে বহুক্ষণ ধরে, আগেই, তর্ক শুরুর প্রথম থেকেই তা তাদের জানা ছিল কিন্তু ভালো-লাগাটা তাদের বিভিন্ন, এবং কি সেই ভালোলাগাটা তা বলতে চায় না পাছে আপত্তি ওঠে এই ভয়ে। বহুবার তাঁর এই অভিজ্ঞতা হয়েছে যে তর্কের সময় মাঝে মাঝে ধরা যায় কি ভালোবাসে প্রতিপক্ষ এবং হঠাৎ নিজেরই ভালো লেগে যায় সেটা, মতে মতে মিল হয়ে যায় সাথে সাথেই। সমস্ত যুক্তি ঝরে পড়ে নিষ্প্রয়োজন হয়ে; কখনো কখনো অভিজ্ঞতাটা হয়েছে বিপরীত : নিজে ডেটা পছন্দ করি, যার জন্য যুক্তি বানাচ্ছি, সেটা শেষ পর্যন্ত বলে ফেলে আর ভালোভাবে, অকপটে, তা বলা হলে প্রতিপক্ষ হঠাৎ সায় দিয়ে বসে, তর্ক থামায়। এই কথাটাই বলতে চেয়েছিলেন তিনি।
