‘কারেনিন, মাপ করবেন আমাকে, এ কথা জিজ্ঞেস করার অধিকার আমার নেই…কিন্তু বোন হিসেবে আমি আন্নাকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি; আমি অনুরোধ করছি, মিনতি করছি। বলুন আমাকে, কি হল আপনাদের মধ্যে? কি অপরাধ পেলেন ওঁর ‘
কারেনিন মুখ কুঁচকে, চোখ প্রায় খুঁজে মাথা নোয়ালেন।
তিনি ওঁর চোখের দিকে না তাকিয়ে ড্রয়িং-রুম পেরিয়ে চলে যাওয়া শ্যেরবাৎস্কির দিকে অপ্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি ধরে নিতে পারি, কেন আন্না আর্কাদিয়েভনার সাথে আমার পুরানো সম্পর্ক বদলানোর প্রয়োজন বলে মনে করছি সে কারণ স্বামী আপনাকে বলেছেন।’
নিজের সামনে তাঁর হাড্ডিসার হাতটা মুঠো করে সতেজ ভঙ্গিতে ডল্লি বলে উঠলেন, ‘এটা আমি বিশ্বাস করি না, বিশ্বাস করি না! বিশ্বাস করতে পারি না!’ ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে হাত দিলেন কারেনিনের আস্তিনে। ‘এখানে আমাদের অসুবিধা হচ্ছে, চলুন ওখানে যাই।’
কারেনিনকে প্রভাবিত করল ডল্লির উত্তেজনা। উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বাধ্যের মত ডল্লির পিছু পিছু গেলেন পড়ার ঘরে। কলম-কাটা ছুরিতে আঁচড় পড়া অয়েল-ক্লথ মোড়া একটা টেবিলের সামনে বসলেন তাঁরা।
তাঁকে এড়িয়ে যাওয়া ওঁর দৃষ্টিটা ধরার চেষ্টা করে ডল্লি বললেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না এটা!
‘সত্য ঘটনাকে বিশ্বাস না করা চলে না, দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা’, উনি বললেন ‘সত্য ঘটনা’ কথাটায় জোর দিয়ে।
‘কিন্তু কি সে করেছে?’ বললেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা, ‘ঠিক কি করেছে সে?’
‘সে তার কর্তব্য চুলোয় পাঠিয়েছে, বিশ্বাসঘাতকতা করেছে স্বামীর প্রতি। এই সে করেছে’, উনি বললেন।
‘না-না, হতে পারে না! না, আপনি করেছেন!’ ডল্লি বললেন চোখ খুঁজে, রগে হাত দিয়ে।
কারেনিন ঠাণ্ডা হাসলেন শুধু তাঁর ঠোঁট দিয়ে, ডল্লিকে আর নিজেকেও দেখাতে চাইলেন তাঁর প্রত্যয়ের দৃঢ়তা’ কিন্তু ডল্লির এই সতেজ সমর্থন তাঁকে দোলাতে না পারলেও তাতে লবণের ছিটে পড়ল তাঁর ক্ষতে। উনি বেশ উত্তেজিত হয়ে কথা বলতে লাগলেন।
‘ভুল করা খুবই কঠিন যখন স্ত্রী নিজেই সে কথা বলে স্বামীকে। বলে যে জীবনের আট বছর আর ছেলে- সবই ভুল। সে আবার গোড়া থেকে জীবন শুরু করতে চায়’, উনি বললেন রেগে, নাক ফোঁস ফোঁস করে।
‘আন্না আর দুশ্চরিত্রা—এ দুটো জিনিস মেলাতে পারছি না আমি, বিশ্বাস করি না ও কথা’
‘দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা’, এবার উনি বললেন সোজাসুজি ডল্লির সদাশয় উত্তেজিত মুখের দিকে চেয়ে, টের পাচ্ছিলেন যে অনিচ্ছা সত্ত্বেও মুখ ওঁর আলগা হয়ে আসছে, ‘অনিশ্চয়তা এখানে সম্ভব হতে পারলে আমি সব দিতাম। যখন মাত্র সন্দেহ ছিল তখন সেটা কষ্টকর হলেও এখনকার চেয়ে তা ছিল লঘু। যখন মাত্র সন্দেহ ছিল, তখন আশাও ছিল; কিন্তু এখন আর আশা নেই; তাহলেও আমি সব কিছুতেই সন্দেহ করি। সব কিছুতেই এমন আমার সন্দেহ যে ঘৃণা করি নিজের ছেলেকে, মাঝে মাঝে বিশ্বাস হয় না যে ও আমার ছেলে। বড় দুর্ভাগা আমি।’
এ কথা তাঁর বলার দরকার হত না। দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার মুখের দিকে উনি তাকাতে ডল্লি সেটা বুঝতে পেরেছিলেন, ওঁর জন্য কষ্ট হল তাঁর, তাঁর বান্ধবী নির্দোষ এ বিশ্বাস তাঁর টলে উঠল।
উঁহু, এ যে ভয়ংকর, ভয়ংকর! কিন্তু এ কি সত্যি যে আপনি বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন?’
‘শেষ ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আর কিছু করার নেই আমার।’
‘করার নেই, করার নেই…’, চোখে পানি নিয়ে পুনরাবৃত্তি করলেন ডল্লি। ‘না, করার নেই হতে পারে না!’ উনি বললেন।
‘এ ধরনের বিপদে সবচেয়ে ভয়ংকর হল অন্য বিপদ, লোকসান, মৃত্যুর মত তা নীরবে সয়ে যাওয়া যায় না, কিছু-একটা করতে হয়’, উনি বললেন যেন ডল্লির চিন্তাটা অনুমান করে, ‘যে হীনতার অবস্থায় পড়েছি তা থকে বেরিয়ে আসা দরকার। তিনজনে তো আর ঘর করা যায় না।’
‘বুঝতে পারছি, খুব ভালো করে বুঝতে পারছি সেটা’, বলে মাথা নিচু করলেন ডল্লি। চুপ করে রইলেন তিনি, ভাবছিলেন নিজের কথা, আপন পারিবারিক দুঃখের কথা। হঠাৎ সবেগে মাথা তুলে অনুনয়ের ভঙ্গিতে হাত জড়ো করলেন, ‘কিন্তু দাঁড়ান, আপনি তো খ্রিস্টান। ওর কথাটা ভাবুন! আপনি যদি ওকে ত্যাগ করেন তাহলে কি হবে ওর?’
‘আমি ভেবেছি দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা, অনেক ভেবেছি’, বললেন কারেনিন। মুখ ওঁর ভরে উঠল লাল লাল ছোপে, ঘোলাটে চোখ দুটো তাকিয়ে ছিল সোজা ডল্লির দিকে। এখন ওঁর জন্য কষ্টে সত্যিই বুক ভরে উঠল দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার। ‘ও নিজেই যখন আমার মুখে চুন-কালি লাগাবার কথাটা আমাকে বলে, তারপর আমি ঠিক ওটাই করেছিলাম : সব আগের মত চলতে দিলাম। সংশোধনের সুযোগ দিয়েছিলাম তাকে, চেষ্টা করেছিলাম তাকে বাঁচাতে কিন্তু কি হল? শোভনতা বজায় রেখে চলা—এই অতি সহজ দাবিটাও সে মেনে চললে না’, উত্তপ্ত হয়ে তিনি বললেন, ‘যে লোক ধ্বংস পেতে চায় না তাকে বাঁচানো যায়; কিন্তু স্বভাব যদি এতই নষ্ট হয়ে, বিকৃত হয়ে গিয়ে থাকে যা ধ্বংসটাই তার কাছে উদ্ধার বলে মনে হচ্ছে, তাহলে কি করা যাবে?’
‘সব করা যায়, শুধু বিবাহবিচ্ছেদ নয়!’ জবাব দিলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা।
‘কিন্তু সেই সবটা কি?’
‘না, এ যে ভয়ংকর কথা! কারো বউ হবে না সে, মারা পড়বে!’
