কিটি ভাবল, ‘চুল কি এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল?’ কিন্তু এই খুঁটিনাটিগুলোর স্মরণে তাঁর মুখে যে উল্লাসের হাসি ফুটেছিল তা দেখে কিটি বুঝল যে ভালোই একটা ছাপ ফেলেতে পেরেছিল সে। লাল হয়ে উঠে সে হেসে ফেলল।
‘সত্যি, মনে নেই।’
লেভিন তাঁর আর্দ্র চোখ আর কম্পমান দেহের দিকে তদ্গত হয়ে তাকিয়ে বললেন, ‘কি সুন্দর হাসে তুরোভৎসিন।’
কিটি জিজ্ঞেস করল, ‘ওঁকে আপনি চেনেন অনেকদিন থেকে?’
‘কে ওকে না চেনে!’
‘দেখতে পাচ্ছি, আপনি ওঁকে খারাপ লোক বলে ভাবেন।’
কিটি বলল, ‘ওটা ঠিক নয়! ওরকম কথা আর ভাববেন না। আমারও ওঁর সম্পর্কে খুব নিচু একটা ধারণা ছিল। কিন্তু উনি, উনি আশ্চর্য সহৃদয় মানুষ। মনটা ওঁর সোনার।’
‘ওর মনের খবর আপনি জানলেন কোত্থেকে?’
‘আমাদের সাথে ওঁর খুবই বন্ধুত্ব। ওঁকে আমি খুব ভালো জানি। গত শীতে, আপনি…আমাদের ওখানে যখন গিয়েছিলেন, তারপরে’, কিটি বলল একটু দোষী-দোষী, সেই সাথে ভরসার হাসি হেসে, ‘ডল্লির ছেলেমেয়েরা সবাই ভুগছিল স্কার্লেট জ্বরে। উনি একবার এলেন ডল্লির কাছে, আর থেকে গেলেন, ছেলেমেয়েদের শুশ্রূষায় সাহায্য করতে লাগলেন। ভাবতে পারেন’, ফিসফিসিয়ে বলল কিটি, ‘ওঁর এত মায়া হল যে উনি হ্যাঁ, তিন সপ্তাহ ছিলেন সেখানে, আয়ার মত দেখাশোনা করেন বাচ্চাদের।’
কিটি বোনের দিকে ঝুঁকে বলল, ‘তুরোৎসিনের কথা বলছি কনস্তান্তিন দ্দ্মিত্রিচকে।’
তুরোসিনের দিকে দৃষ্টিপাত করে ডল্লি বললেন, হ্যাঁ, আশ্চর্য, সুন্দর মানুষ!’ তিনিও টের পাচ্ছিলেন তাঁকে নিয়ে কথা হচ্ছে, সলজ্জভাবে ডল্লি হাসলেন তাঁর উদ্দেশে। লেভিন তুরোৎসিনের দিকে তাকিয়ে অবাক হলেন কেমন করে তিনি এ মানুষটির সমস্ত মাধুর্য আগে লক্ষ করেননি।
তাঁর যা এখন অনুভূতি, অকপটেই স্ফূর্তিতে সেটা প্রকাশ করে বললেন, ‘ঘাট, ঘাট মানছি! আর কখনো লোকদের সম্পর্কে খারাপ কিছু ভাবব না!’
বারো
যে আলাপটা জমেছিল তাতে নারীর অধিকার নিয়ে মেয়েদের সামনে দাম্পত্য জীবনে অধিকারের অসাম্যের প্রশ্নটা সুড়সুড়ি দেওয়ার মত। ডিনারের সময় পেস্তসোভ বারকয়েক প্রশ্নটা তুলতে চেয়েছিলেন, কিন্তু সের্গেই ইভানোভিচ কজ্নিশেভ ও অব্লোন্স্কি তাঁকে সাবধানে নিরস্ত করেন।
টেবিল ছেড়ে উঠলেন সবাই যখন আর মহিলারা বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে পেস্তসোভ তাঁদের অনুসরণ না করে অসাম্যের প্রধান কারণ কি তা বোঝাতে লাগলেন কারেনিনকে। তাঁর মতে, আইনে এবং জনমতের পক্ষ থেকে স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতা ও স্বামীর বিশ্বাসঘাতকতায় শাস্তি বিধানের মধ্যে বৈষম্য থাকে।
অব্লোন্স্কি তাড়াতাড়ি করে কারেনিনের কাছে এসে তাঁকে ধূমপানের আমন্ত্রণ জানালেন।
‘না, আমি ধূমপান করি না’, শান্তভাবে উত্তর দিলেন কারেনিন এবং এ প্রসঙ্গটায় যে ভয় পান না সেটা যেন ইচ্ছে করেই দেখাবার জন্য তিনি নিষ্প্রাণ হেসে ফিরলেন পেসোভের দিকে।
‘আমি মনে করি যে, ব্যাপারটাই এমন যে এরূপ দৃষ্টিভঙ্গির যুক্তি থাকে’, এই বলে উনি ড্রয়ি-রুমে চলে যেতে চাইছিলেন; কিন্তু এই সময় তাঁকে উদ্দেশ করে হঠাৎ কথা বলে উঠলেন তুরোভ্ৎসিন।
‘আচ্ছা, আপনি প্রিয়ানিকভের খবরটা শুনেছেন?’ শ্যাম্পেন সেবনে মদির হয়ে বহুক্ষণ নিজের কষ্টকর নীরবতাটা ভাঙার অপেক্ষায় থাকার পর তুরোভ্ৎসিন বললেন, ‘ভাসিয়া প্রিয়ানিকভ—সেদিন শুনলাম যে’, আর্দ্র ও রক্তিম ঠোঁটে তাঁর হৃদয়বান হাসি নিয়ে বিশেষ করে প্রধান অতিথি আলেকসেই আলেক্সান্দ্রভিচকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন, ‘ভের শহরে ভিৎস্কির সাথে ডুয়েল লড়ে তিনি তাকে খুন করেছেন।’
সব সময়ই যেমন মনে হয় ইচ্ছে করেই যেন চোট লাগছে ঠিক ব্যথার জায়গাটাতেই, এখন তেমনি অব্লোন্স্কিরও মনে হচ্ছিল যে প্রতি মুহূর্তে কথাবার্তাটা গিয়ে পড়ছে কারেনিনের ব্যথার জায়গায়। জামাতাকে আবার সরিয়ে নিয়ে যাবার চেষ্টা করলেন তিনি, কিন্তু কারেনিন নিজেই উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রিয়ানিকভ লড়ল কেন?’
‘বৌয়ের জন্যে। বাহাদুরের মত কাজ করেছেন। চ্যালেঞ্জ করে দিলেন খতম করে!’
কারেনিন নিরাসক্ত গলায় বললেন, ‘অ’, ভুরু কপালে তুলে চলে গেলেন ড্রয়িং-রুমে।
ড্রয়িং-রুমে ওঁর সাথে দেখা হতে ভীত হাসি নিয়ে ডল্লি বললেন তাঁকে, ‘ভারি আনন্দ হচ্ছে যে আপনি এসেছেন। আপনার সাথে কথা আছে। বসুন এখানে।’
উত্তোলিত ভুরুতে যে নিরাসক্তির ভাব ফুটেছিল মুখে, সেটা নিয়ে কারেনিন বসলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার পাশে, কৃত্রিম হাসি হাসলেন। বললেন, ‘সে ভালোই। কেননা আমিও আপনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে তখনই বিদায় নেব বলে ভাবছিলাম। কাল চলে যেতে হবে আমাকে।’
দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনার দৃঢ়বিশ্বাস ছিল যে আন্না নির্দোষ, তিনি টের পাচ্ছিলেন যে বিবর্ণ হয়ে উঠছেন; নিরুত্তাপ, অনুভূতিহীন এই যে লোকটা অমন শান্তভাবে মনস্থ করেছে যে তাঁর নির্দোষ বান্ধবীর সর্বনাশ করে ছাড়বে, তার প্রতি রাগে তাঁর ঠোঁট কাঁপছে।
একটা মরিয়া প্রতিজ্ঞায় তাঁর চোখে চোখে তাকিয়ে তিনি বললেন, ‘কারেনিন, আলেক্সান্দ্রভিচ, আপনাকে আমি আন্নার খবর জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনি জবাব দেননি। কেমন আছেন সে?
কারেনিন তাঁর চোখের দিকে না তাকিয়ে উত্তর দিলেন, ‘সুস্থ আছে বলেই তো মনে হয়, দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা।’
