‘আপনি বলছেন অধিকার’, পেস্তসোভ কখন থামবেন তার অপেক্ষায় থাকার পর কজ্নিশেভ বললেন, ‘জুরি, নির্বাচক, অধিকর্তা, কর্মচারী, আইনসভার সদস্য হবার অধিকার…’
‘নিঃসন্দেহে।’
‘কিন্তু বিরল ব্যতিক্রম হিসেবে মেয়েরা যদি এসব পদে যায়ও, তাহলেও আমার মনে হয় আপনার অধিকার কথাটার ব্যবহার হয়েছে বেঠিক। দায়িত্ব কথাটা বলা বেশি সঠিক হত। জুরি, নির্বাচক, টেলিগ্রাফ-কর্মীর কাজ করতে গিয়ে আমরা অনুভব করি—একটা দায়িত্ব পালন করছি। তাই সঠিকভাবে বলা উচিত যে, মেয়েরা দায়িত্ব চাইছে এবং সেটা খুবই আইনসঙ্গত। এবং সাধারণ পুরুষালী শ্রমে তাদের সাহায্য করার এই বাসনাটায় সহানুভূতি জানানোই সম্ভব।’
‘একেবারে ঠিক কথা’, সায় দিলেন কারেনিন, ‘আমি মনে করি, প্রশ্নটা শুধু এই যে—এ দায়িত্ব পালনে তারা সক্ষম কিনা।’
‘খুব সম্ভব যে সক্ষম মধ্যে। আমরা দেখছি, যে…’
‘আর সেই প্রবাদটা?’ আলাপটা অনেকক্ষণ ধরে শুনতে শুনতে তাঁর ছোট ছোট চোখে উপহাস ঝিকমিকিয়ে বললেন প্রিন্স, ‘নিজের মেয়েদের সামনেও বলা চলবে : লম্বা চুলে খাটো বুদ্ধি।’
‘নিগ্রোর মুক্ত হবার আগে পর্যন্ত ঠিক এরকমটাই ভাবা হত!’ রাগতভাবে বললেন পেস্তসোভ।
‘আমার কাছে শুধু অদ্ভুত ঠেকে যে, মেয়েরা নতুন দায়িত্ব নিতে চাইছে’, বললেন কজ্নিশেভ, ‘যেক্ষেত্রে দুঃখের বিষয় আমরা দেখছি যে পুরুষেরা সাধারণত তা এড়িয়ে চলে।
‘দায়িত্বের সাথে সাথেই থাকে অধিকার; ক্ষমতা, টাকা, সম্মান—এই চায় মেয়েরা’, বললেন পেস্তসোভ।
‘এরও সমান কথা যে, আমি ধাই মা হবার অধিকার চাইছি অথচ তার জন্যে আমাকে নয়, টাকা দেওয়া হচ্ছে মেয়েদের’, বললেন বৃদ্ধ প্রিন্স
তুরোভ্ৎসিন হেসে উঠলেন হো-হো করে, আর কর্নিশেভের আফসোস হল যে, এমন একটা কথা তিনি বলেননি। এমন কি কারেনিনও হাসলেন।
‘হ্যাঁ, কিন্তু পুরুষেরা সন্তানদের নিজের স্তন পান করাতে পারে না, তবে মেয়েরা…’
‘আরে না, জাহাজে সেই যে ইংরেজটা নিজের ছেলেকে দুধ খাইয়েছিল’, নিজের মেয়েদের সামনে কথোপকথনের এই স্বাধীনতাটুকু নিজের জন্য মঞ্জুর করে বললেন বৃদ্ধ প্রিন্স।
‘এমন ইংরেজ যতগুলো আছে, চাকুরে মেয়েও হবে ততগুলো’, কজ্নিশেভ বললেন শেষ পর্যন্ত।
‘কিন্তু যে মেয়ের সংসার নেই, কি সে করবে?’ চিবিসোভার কথা মনে করে বললেন অব্লোন্স্কি, তার কথাই তাঁর মনে হচ্ছিল সারাক্ষণ, সেই ভেবেই তিনি সহানুভূতি দেখালেন পে সোভকে, সমর্থন করলেন তাঁকে।
‘যদি সে মেয়ের ঘটনাটা ভালো করে বিচার করা যায়, তাহলে দেখা যাবে যে–নিজের সংসার অথবা ভালো করে নারীর মত থাকতে পারত বোনের সে সংসারও ত্যাগ করে গেছে’, হঠাৎ পিত্তি জ্বলে ওঠায় কথোপকথনে যোগ দিলেন দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা, কোন মেয়ের কথা অব্লোন্স্কি বলতে চাইছিলেন, সেটা সম্ভবত অনুমান করেছিলেন তিনি।
‘কিন্তু আমরা দাঁড়াচ্ছি নীতি নিয়ে, আদর্শ নিয়!’ সোচ্চার জলদকণ্ঠে বললেন পোেভ, ‘নারীরা চায় স্বাধীনতার, শিক্ষিত হবার অধিকার। তার অসম্ভাবিতার চেতনায় তারা সংকুচিত, দমিত।’
‘আর আমি সংকুচিত আর দমিত এজন্যে যে; অনাথাশ্রমে ধাই মা হিসেবে আমাকে নেওয়া হচ্ছে না’, আবার বললেন বৃদ্ধ প্রিন্স আর তাতে তুরোৎসিনের এত আনন্দ হল যে তাঁর অ্যাসপারাগাসের মোটা বোঁটাটা তিনি গুঁজে দিলেন সসের মধ্যেই।
এগারো
শুধু কিটি আর লেভিন ছাড়া সবাই এই সাধারণ আলোচনায় যোগ দিয়েছিল। প্রথমে যখন এক জাতির ওপর অন্য জাতির প্রভাবপাতের কথা ওঠে, তখন লেভিনের আপনা থেকেই মনে হয়েছিল যে—এ বিষয়ে তাঁর কিছু বলার আছে। কিন্তু এই নিয়ে যে ভাবনাটা আগে তাঁর কাছে ছিল অতি গুরুত্বপূর্ণ, এখন সেটা ঝলক দিয়েছিল শুধু যেন স্বপ্নে, কোন আগ্রহই তাতে আর বোধ করছিলেন না তিনি। তাঁর এমন কি অদ্ভুত লাগল কেন ওরা এমন বিষয় নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছে যা সবার কাছেই নিষ্প্রয়োজন। তেমনি কিটির কাছেও মনে হয়েছিল নারীর অধিকার আর শিক্ষা নিয়ে তারা যা বলছে সেটা আগ্রহোদ্দীপক হবার কথা। কতবার সে এ নিয়ে ভেবেছে, স্মরণ করেছে প্রবাসে তার বান্ধবী ভারেঙ্কা, তার দুঃসহ অধীনতার কথা, কতবার সে ভেবেছে যে তারও কি দশা হবে যাদ তার বিয়ে না হয়, কতবার সে বোনের সাথে তর্ক করেছে এ নিয়ে! কিন্তু এখন এতে তার আগ্রহ নেই মোটেই। এখন ওর কথাবার্তা চলছে লেভিনের সাথে, কথাবার্তা নয়, কি-এক রহস্যময় মিলন যা প্রতি মুহূর্তে তাঁদের নিবিড় করে বাঁধছে, যে অজানায় তাঁরা পদার্পণ করছেন তার সামনে একটা আনন্দঘন ত্রাসে দুজনেই আবিষ্ট হচ্ছিলেন।
লেভিন গত বছর কেমন করে তাকে দেখতে পেয়েছিলেন, কিটির এ প্রশ্নের জবাবে লেভিন প্রথমে বললেন যে ঘাস-কাটা থেকে ফেরার সময় বড় সড়কে তাকে দেখতে পেয়েছিলেন।
লেভিন হেসে বললেন, ‘তখন খুব সকাল। আপনি সম্ভবত সবেমাত্র ঘুম থেকে জেগেছিলেন। আপনার মা তখনো নিজের কোণটিতে ঘুমিয়ে। সকালটা চমৎকার। যেতে যেতে ভাবছিলাম, কারা যাচ্ছে ওই চার ঘোড়ার গাড়িতে? চমৎকার চার ঘোড়ার গাড়ি, গলায় ঘণ্টি। মুহূর্তের জন্যে দেখা গেল আপনাকে, জানালার দিকে তাকিয়ে দেখি আপনি এভাবে বসে আছেন, দু’হাতে টুপির ফিতে ধরে আছেন আর কিছু-একটা নিয়ে চিন্তায় ভয়ংকর মগ্ন। কি ভাবছিলেন তা জানার জন্যে আমার কি যে ভয়ানক ইচ্ছে করছিল! গুরুতর কিছু?’
