‘সেই তো কথা’, জলদকণ্ঠে বাধা দিলেন পেস্তসোভ, যিনি ব্যস্ত হয়ে উঠতেন কথা বলতে এবং যে বিষয়ে কথা বলছেন সব সময় তাতে মন-প্রাণ ঢেলে দিতেন বলেই মনে হবে, ‘উচ্চতর বিকাশ বলতে কি বোঝায়? ইংরেজ, ফরাসি, জার্মান-কে বিকাশের উন্নত পর্যায়ে? কে একে অপরকে জাতীভূত করবে? আমরা দেখছি যে রাইন অঞ্চল সরকারিভাবে ফরাসিভুক্ত হয়েছে অথচ জার্মানদের মান নিচু নয়’, চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, ‘এক্ষেত্রে আছে আরেকটা নিয়ম!’
‘আমার মনে হয়, প্রভাটা সব সময় আসে সত্যিকারের সুশিক্ষা থেকে’, ভুরু সামান্য কপালে তুলে বললেন কারেনিন।
‘কিন্তু সত্যিকার সুশিক্ষার লক্ষণগুলো কি বলে আমরা ধরব?’ জিজ্ঞেস করলেন পেস্তসোভ।
কারেনিন বললেন, ‘আমি মনে করি, তার লক্ষণগুলো সবারই জানা।’
‘পুরো জানা কি?’ মিহি হেসে আলাপে নাক গলালেন কজ্নিশেভ, ‘এখন স্বীকৃত হয়েছে যে, সত্যকার শিক্ষা হতে পারে কেবল বিশুদ্ধ চিরায়ত শিক্ষা; কিন্তু দু’পক্ষে ঘোর বিতর্ক দেখতে পাচ্ছি আমরা এবং অস্বীকার করা যায় না যে বিপক্ষ শিবিরেও স্বীয় অনুকূলে যুক্তি আছে জোরদার।
‘আপনি তো চিরায়তপন্থী, কজ্নিশেভ। লাল মদ চলবে?’ বললেন অব্লোন্স্কি।
‘কোন শিক্ষা সম্পর্কেই আমি নিজের অভিমত দিচ্ছি না’, পানপত্র বাড়িয়ে দিয়ে শিশুর প্রতি প্রশ্রয়ের হাসি হেসে কজ্নিশেভ বললেন, ‘আমি শুধু বলছি যে, দু’পক্ষেরই জোরালো যুক্তি আছে,’ কারেনিনের দিকে চেয়ে তিনি চালিয়ে গেলেন। ‘নিজে আমি চিরায়ত শিক্ষা পেয়েছি, কিন্তু এ বিতর্কে আমি নিজে ব্যক্তিগতভাবে এখনো আমার স্বস্থান খুঁজে পাচ্ছি না। বাস্তব বিদ্যার চেয়ে চিরায়ত বিদ্যাকে কেন প্রাধান্য দেওয়া হবে তার পরিষ্কার যুক্তি চোখে পড়ছে না আমার।’
‘শিক্ষাদানে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের প্রভাবও তো একই’, খেই ধরলেন পেস্তসোভ, ‘ধরুন না শুধু জ্যোতির্বিদ্যা, ধরুন উদ্ভিদবিদ্যা, পশুবিদ্যা এবং তাদের সাধারণ নিয়মগুলো!’
কারেনিন জবাব দিলেন, ‘আমি এর সাথে পুরোপুরি একমত হতে পারছি না। আমার মনে হয় এটা অস্বীকার করা যায় না যে, ভাষায় গঠনপ্রণালীর অধ্যয়নই আত্মিক বিকাশে অতি অনুকূল প্রভাব ফেলে। তাছাড়া চিরায়ত সাহিত্যিকদের প্রভাব অতিমাত্রায় নৈতিক, এটাও অস্বীকার করা যায় না। যেক্ষেত্রে দুর্ভাগ্যবশত প্রাকৃতিক বিদ্যাশিক্ষার সাথে মিলেছে অনিষ্টকর, অসত্য কতকগুলো মতবাদ যা আমাদের কালের দুষ্টক্ষত।’
কজ্নিশেভ কিছু-একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু পেস্তসোভ তাঁর জলদগম্ভীর কণ্ঠে তাঁকে থামিয়ে দিলেন। সোৎসাহে তিনি প্রমাণিত করতে লাগলেন এ অভিমতের অসারতা। কজনিশেভ শান্তভাবে তাঁর কথা আসার পালার অপেক্ষায় রইলেন, স্পষ্টতই একটা বিজয়সূচক জবাব তৈরি ছিল তাঁর।
‘তবে’, মুচকি হেসে, কারেনিনকে উদ্দেশ্য করে কজ্নিশেভ বললেন, ‘দুই বিদ্যার লাভালাভ ওজন করে কোন- একটাকে পছন্দ করা যে কঠিন তা না মেনে উপায় নেই। আর আপনি এখনই যা বললেন, চিরায়ত বিদ্যায় নৈতিকতা—সোজাসুজি বলব—কালাপাহাড়-বিরোধী মনোবৃত্তির প্রভাব না থাকলে কোন্টা বাছব—এ প্রশ্নের এত সত্বর ও চূড়ান্ত মীমাংসা সম্ভব হত না।’
‘চিরায়ত বিদ্যার পক্ষে যদি এই কালাপাহাড়-বিরোধী মনোবৃত্তির শ্রেষ্ঠতা না থাকত, তাহলে আমরা একটু বেশি ভাবনা-চিন্তা করতাম, বাজিয়ে দেখতাম দু’পক্ষের যুক্তিকে’, মুচকি হেসে বললেন কজ্নিশেভ, ‘দুই ধারার জন্যেই রাস্তা খুলে দিতাম আমরা। কিন্তু এখন আমরা জানি যে, চিরায়ত বিদ্যার এই বটিকাগুলোর মধ্যে আছে কালাপাহাড়-বিরোধী মনোবৃত্তির ভেষজশক্তি। তখন আমরা নির্ভয়ে তা সুপারিশ করব আমাদের রোগীদের জন্যে…কিন্তু যদি তা না থাকে?’ কথা তিনি সম্পূর্ণ করলেন সূক্ষ্ম লবণ ছিটিয়ে।
সের্গেই ইভানোভিচের বটিকার কথায় সবাই হেসে উঠলেন। সবচেয়ে সশব্দে ও স্ফূর্তিতে তুরোভ্ৎসিন, আলাপটা শুনতে শুনতে তিনি কেবল প্রতীক্ষা করছিলেন কখন পরিহাসে এর শেষ হবে।
অব্লোন্স্কি পেস্তসোভকে নিমন্ত্রণ করে ভুল করেননি। পেসোভের কাছে বিদগ্ধ আলোচনা ক্ষান্ত হতে পারে না এক মিনিটের জন্যও। কজ্নিশেভ তাঁর রসিকতা দিয়ে আলোচনাটা বন্ধ করা মাত্রই তিনি টেনে আনলেন অন্য প্রসঙ্গ। বললেন, ‘সরকারের এই-ই উদ্দেশ্য ছিল, এটা মানা যায় না। সরকার স্পষ্টতই চালিত হয়েছে সাধারণ বিবেচনায় গৃহীত ব্যবস্থাগুলো কি প্রতিক্রিয়া হবে সেদিকে উদাসীন থেকেছে। যেমন নারীশিক্ষার কথাটাই ধরা যাক। এটাকে গণ্য করা উচিত অতি ক্ষতিকর, কিন্তু সরকার মেয়েদের জন্যে কোর্স আর বিশ্ববিদ্যালয় খুলছে।’
আর সাথে সাথেই কথোপকথন চলে গেল নারীশিক্ষার নতুন খাতে।
কারেনিন বললেন যে, নারীশিক্ষাকে সাধারণত নারীমুক্তির সাথে গুলিয়ে ফেলা হয় এবং সেই কারণে এটা ক্ষতিকর মনে হতে পারে।
পেস্তসোভ বললেন, ‘উল্টো আমি মনে করি, দুটো প্রশ্নই অঙ্গাঙ্গি জড়িত। এটা এক পাপচক্র। যথেষ্ট শিক্ষা নেই বলে মেয়েদের অধিকারও নেই। আবার শিক্ষার অপ্রতুলতা আসছে অধিকারের প্রভাব থেকে। মনে রাখা উচিত যে, মেয়েদের দাসত্ব এত প্রবল আর পুরানো যে—ওদের কাছ থেকে আমাদের যা তফাৎ করে রাখছে সেই গহ্বরটা আমরা দেখতে চাই না?’
