সবাই হেসে উঠল, সবচেয়ে ফুর্তি করে হাসলেন অব্লোন্স্কি।
‘হ্যাঁ, এটাই সবচেয়ে সেরা পদ্ধতি!’ পনীর চিবাতে চিবাতে এগিয়ে দেওয়া পানপাত্রটায় কি-এক বিশেষ ধরনের ভোদ্কা ঢালতে ঢালতে বললেন তিনি। এই রহস্যেই অবসান হল বিতর্কের।
‘পনীরটা মন্দ নয়। কে নেবেন?’ গৃহস্বামী বললেন, ‘আবার তুমি ব্যায়াম শুরু করেছ নাকি?’ বাঁ হাতে লেভিনের পেশী টিপে বললেন তিনি। হেসে লেভিন তাঁর পেশী ফোলালেন, অব্লোন্স্কির আঙুলের নিচে পাতলা ফ্রক-কোটের তল থেকে ইস্পাতের মত উঁচু হয়ে উটল গোলাকার পনীর-সদৃশ পেশীর ডিম
‘আহ্, বাইসেপখান কি! একেবারে সামসন!’
‘আমার মনে হয় ভালুক শিকারের জন্যে বেশ শক্তি দরকার’, বললেন কারেনিন, শিকার সম্পর্কে যাঁর ধারণা ছিল খুবই ঝাপসা। পনীর মাখাতে গিয়ে ফিনফিনে এক টুকরো রুটি ভেঙে ফেললেন তিনি।
লেভিন হাসলেন।
‘শক্তির কোন দরকার নেই। একটা বাচ্চাও ভালুক মারতে পারে’, মুখরোচক টেবিলেটা কাছে গৃহকর্ত্রীর সাথে যে মহিলারা আসছিলেন তাঁদের উদ্দেশে মাথা নুইয়ে সরে গিয়ে লেভিন বললেন।
‘শুনেছি আপনি ভালুক মেরেছেন, সত্যি?’ কিটি জিজ্ঞেস করল বারবার পিছলে যাওয়া একটা ব্যাঙের ছাতাকে কাঁটার বিধাবার চেষ্টা করে, সাদা বাহুর ওপরকার লেসটা ঝাঁকিয়ে, ‘আপনাদের ওখানে ভালুক আছে নাকি?’ তাঁর দিকে মাথা আধখানা ফিরিয়ে সে যোগ করল হেসে।
সে যা বলল, সেটা মনে হবে অসাধারণ কিছু নয়, কিন্তু যখন এটা সে বলছিল তখন তার প্রতিটি ধ্বনি, ঠোঁট, হাতের প্রতিটি ভঙ্গি কি অবর্ণনীয় তাৎপর্যই না ধরেছিল লেভিনের কাছে। ছিল তাতে লেভিনের কাছে ক্ষমাভিক্ষা, তাঁর ওপর আস্থা, সোহাগ, কমনীয়, ভীরু-ভীরু লেভিনের আর প্রতিশ্রুতি আর আশা আর ভালোবাসা যাতে তিনি বিশ্বাস না করে পারেন না, সুখে যাতে তাঁর শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছিল।
‘না, আমরা গিয়েছিলাম ভের গুবের্নিয়ায়। ফেরার পথে ট্রেনের কামরায় দেখা জয় আপনার দেওয়া অথবা দেওরের জামাইয়ের সাথে’, হেসে বললেন তিনি, ‘সে এক মজার সাক্ষাৎ।’
ফুর্তি করে, মজা করে তিনি বলতে লাগলেন কিভাবে সারারাত না ঘুমিয়ে তিনি মেষচর্মের কোট গায়ে হুড়মুড়িয়ে ঢুকেছিলেন কারেনিনের কামরায়।
‘প্রবাদে যা বলে তার উল্টোটা করলে কন্ডাক্টর, আমার ওই মেষচর্মের জন্যে আমাকে সে ভাগাতে চাইছিল; আমি যত লম্বা-চওড়া বুলি ঝড়তে লাগলাম, আর আপনিও…’ কারেনিনের নাম, পিতৃনাম মনে করতে না পেরে তিনি বললেন তাঁর উদ্দেশে, ‘আমার মেষচর্মের জন্যে আমি খুবই কৃতজ্ঞ।’
‘আসন নির্বাচনে যাত্রীদের অধিকার এমনিভাবে খুব বিশৃঙ্খলা’, রুমাল দিয়ে আঙুলের ডগা মুছে বললেন কারেনিন।
‘দেখলাম, আমার সম্পর্কে আপনি মনঃস্থির করে উঠতে পারছেন না’, ভালোমানুষি হাসি হেসে বললেন লেভিন, ‘কিন্তু আমার ঐ মেষচর্মটা মার্জনা করিয়ে নেবার জন্যে আমি তাড়াতাড়ি করে শুরু করলাম সুধীসুলভ আলাপ।’
সের্গেই ইভানোভিচ আলাপ চালিয়ে যাচ্ছিলেন গৃহকর্ত্রীর সাথে আর এক কান দিয়ে শুনছিলেন ভাইয়ের কথা, আড়চোখে তাকিয়েছিলেন তাঁর দিকে। ভাবছিলেন, ‘আর ওর হল কি?’ এমন জয়জয়কার ভাব।’ তিনি জানতেন না যে লেভিন অনুভব করছেন যে তাঁর পাখা গজিয়েছে। লেভিন জানতেন যে কিটি তাঁর কথা শুনছে আর তার ভালো লাগছে শুনতে। শুধু সেটাতেই তিনি নিমগ্ন। শুধু এই ঘরখানায় নয়, সারা দুনিয়ায় আছেন শুধু তিনি, যিনি পেয়ে গেছেন বিপুল তাৎপর্য আর গুরুত্ব, এবং আছে কিটি। তিনি অনুভব করছিলেন যে তিনি আছেন এত উঁচুতে যে মাথা ঘোরে, আর নিচুতে কোথায় যেন অনেক দূরে রয়েছে এসব সজ্জন, সুন্দর কারেনিনরা, অব্লোন্স্কিরা, সারা পৃথিবী।
একেবারে অলক্ষিতে, ওঁদের দিকে না তাকিয়ে যেন আর কোথাও বসার জায়গা নেই এমন ভাব করে অব্লোন্স্কি খাবার টেবিলে লেভিন আর কিটিকে বসিয়ে দিলেন পাশাপাশি। লেভিনকে তিনি বললেন, ‘তুমি তো এখানে বসতে পারো।’
যার জন্য অব্লোন্স্কির দূর্বলতা ছিল সেই বাসনগুলোর মতই খাবারও হয়েছিল চমৎকার। খুব উৎরেছিল মারি- লুইজ স্যুপ; মুখে গলে যাওয়া ছোট ছোট পিঠেগুলো একেবারে অনবদ্য। সাদা টাই-ঝোলানো দুজন চাপরাশি আর মাতভেই আহার্য ও মদ্য পরিবেশন করছিল দৃষ্টিকটু না হয়ে শান্তভাবে, তৎপরতার সাথে। বৈষয়িক দিক থেকে সার্থক হয়েছিল ডিনার; অবৈষয়িক দিক থেকেও কম সার্থক হয়নি। কখনো সবার মিলিত, কখনো ব্যক্তিগত কথোপকথন থেমে গেল না, আর ডিনারের শেষে তা এতই সজীব হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, পুরুষেরা টেবিল ছেড়ে উঠেছিলেন আলাপ না থামিয়ে, এমন কি কারেনিনেরও নিরাসক্তি কেটে গিয়েছিল।
আন্না কারেনিনা – ৪.১০
দশ
পেস্তসোভ শেষ পর্যন্ত তর্ক করতে ভালোবাসতেন, সের্গেই ইভানোভিচ কজ্নিশেভের কথায় তিনি তুষ্ট হননি, সেটা আরো এই কারণে যে নিজের মতামতের অন্যায্যতা তিনি নিজেই টের পাচ্ছিলেন।
তিনি স্যুপ খেতে খেতে কারেনিনকে রললেন, ‘আমি শুধু জনবহুলতার কথাই বলতে চাইনি, সেই সাথে ভিত্তিটাও, তবে নীতি নয়।’
তাড়াহুড়া না করে আলস্যভরে জবাব দিলেন কারেনিন, ‘আমার মনে হয় ওটা একই ব্যাপার। আমার মতে, অন্য জাতিকে প্রভাবিত করতে পারে শুধু সেই জাতি যার বিকাশ উচ্চতর, যে…
