ভোজনকক্ষে তাঁর সাথে দেখা হল কনস্তান্তিন লেভিনের।
‘দেরি না করে তুমি পারো কখনো?’ তাঁকে বাহুবন্ধনে নিয়ে বললেন অব্লোন্স্কি।
‘তোমার এখানে অনেক লোক? কে, কে?’ অজ্ঞাতসারে লাল হয়ে আর দস্তানা দিয়ে টুপির তুষারকণা ঝড়তে ঝড়তে বললেন লেভিন।
‘সবাই আপনার লোক। কিটিও আছে। চল, কারেনিনের সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দিই।’
উদারনৈতিক মতাবলম্বী হলেও অব্লোন্স্কি জানতেন যে কারেনিনের সাথে পরিচয় থাকাটা কারো কাছে চরিতার্থতার একটা ব্যাপার না হয়ে পারে না, তাই সেরা বন্ধুর কাছে তারই প্রস্তাব দিলেন তিনি। কিন্তু সেই মুহূর্তে এ পরিচয়ের সমগ্র পরিতোষ গ্রহণের অবস্থায় ছিলেন না কনস্তান্তিন লেভিন। সড়কে কিটিকে ক্ষণিক দেখতে পাওয়ার কথাটা ছেড়ে দিরে সেই যে স্মরণীয় সন্ধ্যায় তিনি ভ্রন্স্কিকে দেখেছিলেন, তার পর থেকে তিনি কিটিকে আর দেখেননি অন্তরে অন্তরে তিনি জানতেন যে আজ এখানে তিনি দেখতে পারেন কিটিকে। কিন্তু নিজের চিন্তার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে তিনি নিজেকে বোঝাতে চাইছিলেন যে সেটা তাঁর জানা নেই। কিন্তু এখন, যখন শুনলেন যে সে এখানে, তখন এমন আনন্দ আর সেই সাথে এমন ভয় হল তাঁর যে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল, যা বলতে চাইছিলেন, বলতে পারলেন না।
‘কেমন, কেমন সে এখন? যেমন ছিল আগে, অথবা যেমন তাকে দেখেছিলেন ঘোড়ার গাড়িটায়? আর দারিয়া অলেক্সান্দ্রভনা যদি সত্যি কথাই বলে থাকেন, তাহলে? কেনই-বা সত্যি বলবেন না?’ মনে মনে ভাবছিলেন তিনি।
‘ও, হ্যাঁ, আলাপ করিয়ে দাও কারেনিনের সাথে’, বহু কষ্টে শেষ পর্যন্ত বলতে পারলেন কথাটা, দৃঢ়, মরিয়া পদক্ষেপে ড্রয়িং-রুমে ঢুকে দেখতে পেলেন কিটিকে।
কিটি আগের মতও নয়, গাড়িতে যা দেখা গিয়েছিল, তার মতও নয়; একেবারে অন্যরকম।
কিটিকে দেখাচ্ছিল সন্ত্রস্ত, ভীরু, লজ্জিত আর তাতে করে আরো মধুর মনে হল তাকে। ঘরে ঢুকতেই তাঁকে দেখল কিটি। তাঁর অপেক্ষায় সে ছিল। খুশি হয়ে উঠল সে আর নিজের খুশিতে এমনই বিব্রত বোধ করল যে, লেভিন যখন গৃহকর্ত্রীর কাছে যেতে যেতে আবার তার দিকে তাকান, সে মুহূর্তে তার, লেভিনের ডল্লি ওরও যিনি সবই দেখছিলেন, মনে হল সে আর সামলাতে পারবে না, কেঁদে পেলবে। লাল হয়ে উঠল কিটি, বিবর্ণ হয়ে গেল, আবার লাল হয়ে উঠে আড়ষ্ট হয়ে গেল, সামান্য কাঁপা-কাঁপা ঠোঁটে অপেক্ষা করতে লাগল লেভিনের। লেভিন ওর কাছে এসে মাথা নুইয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন নীরবে। ঠোঁটের সামান্য কাঁপন আর যে আর্দ্রতা চোখকে আরো জ্বলজ্বলে করে তুলেছে তা না থাকলে হাসিটা তার প্রায় প্রশান্ত মনে হতে পারত যখন সে বলল : ‘কতদিন দেখা হয়নি আমাদের!’ মরিয়া দৃঢ়তায় নিজের ঠাণ্ডা হাতে লেভিনের করমর্দন করল সে।
‘আপনি আমাকে দেখতে পাননি কিন্তু আমি আপনাকে দেখেছি’, সুখের হাসিতে দীপ্তি ছড়িয়ে লেভিন বললেন, ‘আমি আপনাকে দেখেছি যখন রেলস্টেশন থেকে আপনি যাচ্ছিলেন এওঁশোভোতে।’
‘কবে?’ অবাক হয়ে কিটি জিজ্ঞেস করল।
‘আপনি গাড়ি করে যাচ্ছিলেন এওঁশোভোতে’, লেভিন বললেন এবং অনুভব করলেন যে হৃদয় ভরে উঠছে যে সুখে তাতে হাবুডুবু খাচ্ছেন তিনি। ‘মর্মস্পর্শী এই যে প্রাণীটি, তার কিছু-একটা দোষ ধরার স্পর্ধা আমি পেয়েছিলাম কোত্থেকে! হ্যাঁ, দারিয়া আলক্সান্দভনা যা বলেছিলেন, মনে হচ্ছে তা ঠিকই’, ভাবলেন লেভিন।
অব্লোন্স্কি তাঁর হাত ধরে নিয়ে গেলেন কারিনিনের কাছে।
‘আসুন, আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিই’, দুজনের নাম বললেন তিনি।
‘আবার দেখা হয়ে খুবই আনন্দ হল’, লেভিনের করমর্দন করে কারেনিন বললেন শীতল কণ্ঠে।
‘আপনাদের আগেই পরিচয় ছিল নাকি?’ অবাক হয়ে অব্লোন্স্কি জিজ্ঞেস করলেন।
‘রেলগাড়িতে তিন ঘণ্টা আমরা ছিলাম একসাথে’, হেসে বললেন লেভিন, ‘কিন্তু বেরিয়ে আসি যেন ছদ্মবেশী নৃত্য থেকে, কুহেলিকা নিয়ে, অন্তত আমি।’
‘বটে! আচ্ছা এবার আসুন’, ভোজনকক্ষের দিকে হাত দেখিয়ে বললেন অব্লোন্স্কি।
ভোজনকক্ষে ঢুকে পুরুষেরা গেলেন মুখরোচক টেবিলটার কাছে, যাতে ছিল ছয় ধরনের ভোদ্কা, রুপার খুন্তি দেওয়া বা না-দেওয়া সমান সংখ্যক পনীর, মাছের ডিমের আচার, নোনা হেরিং মাছ, নানা ধরনের জমিয়ে রাখা খাবার, ফরাসি পাঁউরুটির চাকা ভরা ডিশ।
ভোদ্কা আর মুখরোচক খাবারগুলো গন্ধে ভুরভুর টেবিলটার কাছে পুরুষেরা দাঁড়িয়ে রইলেন মূল আহারের অপেক্ষায়। পোল্যান্ডের রুশীকরণ নিয়ে সের্গেই ইভানোভিচ কজ্নিশেভ, কারেনিন আর পেসোভের মধ্যেকার আলাপটা থিতিয়ে এল।
অতি বিমূর্ত ও গুরুতর বিতর্কের অবসান ঘটাবার জন্য সূক্ষ্ম লবণ প্রয়োগে বিতর্কিদের মেজাজ ফেরাতে আর কেউ পারতেন না কর্নিশেভের মত, এবারেও সেটা তিনি দেখালেন।
কারেনিন প্রমাণ করছিলেন যে পোল্যান্ডের রুশীকরণ সম্ভব হতে পারে কেবল সর্বোচ্চ নীতি প্রবর্তনের ফলে, যা রচনা করার কথা রুশী প্রশাসনের
পেস্তসোভ জিদ করছিলেন যে একটা জাতির অন্য জাতিতে আত্তীকরণ ঘটে কেবল শেষোক্ত জাতির জনবহুলতায়।
কজ্নিশেভ উভয়ের বক্তব্যেই সায় দিচ্ছিলেন কিছু ‘কিন্তু’ রেখা। ড্রয়িং-রুম থেকে তাঁরা বেরোন, তর্কটা থামাবার জন্য কজ্নিশেভ হেসে বললেন : ‘তাহলে অরুশদের রুশীকরণের জন্যে একটাই উপায় আছে— যথাসম্ভব বেশি সন্তানোৎপাদন। এ ব্যাপারে আমি আর আমার ভাই সবার চেয়ে খারাপ। কিন্তু আপনারা, বিবাহিত সাহেবরা আর বিশেষ করে আপনি, অবলোন্স্কি, পুরোপুরি দেশপ্রেমিকের কাজ করছেন; ক’টা হল আপনার?’ হেসে, ছোট্ট একটা পানপাত্র তাঁর কাঁছে ধরে তিনি বললেন গৃহস্থামীকে।
