‘তা কি, ওর সাথে দেখা হয়েছে তোমার?’ কারেনিন জিজ্ঞেস করলেন বাঁকা হেসে।
‘হবে না, কেন, কাল এসেছিলেন আমাদের আপিসে। মনে হয় নিজের কাজটা উনি চমৎকার বোঝেন, খুব কর্মপটু লোক।’
‘হ্যাঁ, কিন্তু কোন দিকে চালিত ওর পটুতা?’ কারেনিন বললেন, ‘কোন-একটা কাজ করার দিকে, নাকি যা করা হয়েছে তার কেঁচেগণ্ডুষ করতে? আমাদের রাষ্ট্রের দুর্ভাগ্য যে এটা কাগুজে প্রশাসন, যার যোগ্য প্রতিনিধি উনি।’
‘সত্যি আমি জানি না ওঁর মধ্যে কোন জিনিসটার সমালোচনা করা যায়। ওঁর কি ধারা আমার জানা নেই। তবে একটা কথা-লোক উনি খাশা। আমি এইমাত্র ওঁর কাছে গিয়েছিলাম, সত্যি, খাশা লোক। জলযোগ করলাম আমরা, ওঁকে আমি শিখিয়ে দিলাম, ওই-যে জানো তো, কি করে সুরা আর নারাঙ্গার রস মিশিয়ে শরবত করতে হয়। গা জুড়িয়ে দেয় তা। অথচ আশ্চর্য, এটা উনি জানতেন না। খুব ভালো লেগেছে তাঁর। না, সত্যি, খাশা লোক।’
ঘড়ি দেখলেন অব্লোন্স্কি। ‘বাপ্ রে, চারটা বেজে গেছে দেখছি, অথচ দলগোভুশিনের কাছে যাওয়া আমার এখনো বাকি! তাহলে খেতে এসো কিন্তু। তুমি ভাবতে পারবে না তুমি কি দুঃখ দিচ্ছ আমাকে আর আমার স্ত্রীকে।’
শ্যালককে কারেনিন যেভাবে অভ্যর্থনা করেছিলেন, বিদায় দিলেন মোটেই সেভাবে নয়।
বিষণ্নভাবে বললেন, ‘কথা যখন দিয়েছি, যাব।’
‘বিশ্বাস কর, কদর করছি তোমাকে। আশা করি তোমাকে খেদ করতে হবে না’, হেসে বললেন অব্লোন্স্কি।
যেতে যেতেই ওভারকোট পরে নিলেন তিনি, হাতের ধাক্কা লাগল চাপরাশির মাথায়, হেসে উঠে বেরিয়ে গেলেন।
‘পাঁচটায়, ফ্রক-কোটে!’ দরজার দিকে ফিরে আরো একবার চেঁচিয়ে বলে চলে গেলেন।
নয়
যখন গৃহস্বামী নিজে এসে পৌঁছলেন, ততক্ষণে পাঁচটা বেজে গেছে, কিন্তু অতিথি এসে পড়লেন ইতিমধ্যেই। তিনি ঢুকলেন সের্গেই ইভানোভিচ কজ্নিশেভ আর পেস্তসোভকে নিয়ে একত্রে, ঢোকার মুখে দেখা হয়েছিল তাঁদের সাথে অব্লোন্স্কি যা বলতেন, এ দুজন হলেন মস্কো বুদ্ধিজীবীদের প্রধান প্রতিনিধি। চরিত্র ও চাতুর্য, উভয় দিক থেকেই তাঁর শ্রদ্ধেয়। তাঁরাও সম্মান করতেন পরস্পরকে, কিন্তু প্রায় সব ব্যাপারেই তাঁদের মধ্যে মতভেদ হত প্রচণ্ড এবং আপোসহীন, সেটা এই জন্য নয় যে তাঁরা ছিলেন দুই বিরোধী ধারার লোক, বরং এই জন্য যে তাঁরা একই শিবিরভুক্ত (শত্রুরা তাঁদের এক করেই, দেখতেন), কিন্তু সে শিবিরের অভ্যন্তরে প্রত্যেকের ছিল নিজ নিজ তারতম্য। আর অর্ধবিমূর্তনের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিন্তার মত মতের মিল ঘটাতে এতটা অক্ষম যেহেতু আর কিছুই নেই, তাই তাঁদের মতে মতে কখনো মেলেনি শুধু তাই নয়, উষ্মা প্রকাশ না করে, কেবল এক অপরের অসংশোধনীয় বিভ্রান্তিতে হাসাহাসি করে তাঁরা পরস্পর অভ্যস্ত হয়ে গেছেন বহুদিন।
তাঁরা দরজায় ঢুকে আবহাওয়া নিয়ে আলাপ করছিলেন, এমন সময় অব্লোন্স্কি তাঁদের সাথে ধরলেন। ড্রয়িং- রুমে বসে ছিলেন অব্লোন্স্কির শ্বশুর প্রিন্স কারেনিন, তরুণ শ্যেরবাৎস্কি, তুরোভ্ৎসিন, কিটি আর কারেনিন।
অব্লোন্স্কির তৎক্ষণাৎ নজরে পড়ল যে তাঁকে বিনা আসরটা ভালো জমছে না। দারিয়া আলেক্সান্দ্রভনা তাঁর ধূসর রেশমী পোশাকি গাউনে স্পষ্টতই ভাবনা করছিলেন ছেলেমেয়েদের নিয়ে যাদের একলা খাবার কথা শিশু-কক্ষে, এবং এই জন্যও যে স্বামী এখনো ফিরছেন না, স্বামীকে ছাড়া দলটাকে সামলাতে পারছিলেন না তিনি। সবাই তাঁরা বসেছিলেন পাদ্রীকন্যাদের মত (বৃদ্ধ প্রিন্সের ভাষায়), ভেবে পাচ্ছিলেন না কেন তাঁরা এখানে, চুপ করে যাতে না থাকতে হয় তার জন্য উচ্চারণ করছিলেন কষ্টকল্পিত এক-একটা শব্দ। দিলদরাজ তুরোভ্ৎসিন স্পষ্টতই নিজেকে স্বস্থানচ্যুত বলে অনুভব করছিলেন, মোটা ঠোঁটের যে হাসিতে তিনি অব্লোন্স্কিকে স্বাগত করলেন তা যেন স্পষ্ট ভাষায় বলছিল, ‘বেশ ভাই, বুদ্ধিমন্তদের মধ্যে আমাকে দিব্যি বসিয়ে রেখে গেছিস। কিছু টেনে Chateau des fluers-এ গেলেই পারতাম, ওটাই আমার যথাস্থান।’ বৃদ্ধ প্রিন্স চুপচাপ বসে ছিলেন, চকচকে আড়চোখে দেখছিলেন কারেনিনকে অব্লোন্স্কি টের পেলেন, এই যে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাটিকে অতি উপাদেয় ভোজ্যরূপে পরিবেশন করা হয় নিমন্ত্রিতদের কাছে তাঁকে দেগে দেবার মত কোন-একটা টিপ্পনী তাঁর ভাবা হয়ে গেছে। কিটি তাকিয়ে ছিল দরজার দিকে যাতে কনস্তান্তিন লেভিনের আগমনে লাল না হয়ে ওঠার মত শক্তি সে পায়। তরুণ শ্যেরবাৎস্কি যার সাথে কারেনিনের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়নি, দেখাবার চেষ্টা করছিল যে তাতে তার কিছু এসে যায় না। স্বয়ং করেনিন, মহিলাদের সাথে ডিনারে বসলে পিটার্সবুর্গের যা চাল, ফক-কোট আর সাদা টাই পরে বসেছিলেন আর অব্লোন্স্কি তাঁর মুখ দেখে বুঝলেন যে তিনি এসেছেন শুধু কথা দিয়েছেন বলে, আর এই সমাবেশটায় উপস্থিত থেকে তিনি একটা গুরুভার কর্তব্য পালন করছেন। অব্লোন্স্কির আসার আগে পর্যন্ত যে হিম সমস্ত অতিথিকে জমিয়ে রেখেছিল তার প্রধান অপরাধ তাঁরই।
অব্লোন্স্কি ড্রয়িং-রুমে ঢুকে মাপ চাইলেন। কৈফিয়ত দিলেন যে, কোন এক প্রিন্সের কাছে তিনি আকটা পড়েছিলেন। যিনি সব সময় তাঁর সমস্ত বিলম্ব ও অনুপস্থিতির ওজর, মিনিটখানেকের মধ্যে সবার সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দিলেন এবং পোল্যান্ডের রুশীকরণ নিয়ে কারেনিনকে লাগিয়ে দিলেন সের্গেই কজ্নিশেভের সাথে, সে প্রসঙ্গটা তাঁরা তৎক্ষণাৎ লুফে নিলেন পেসোভের সাথে। তুরোৎসিনের কাঁধ চাপড়ে তিনি মজার কিছু-একটা বললেন তাঁর কানে কানে, এবং তাঁকে বসালেন প্রিন্স আর স্ত্রীর মাঝখানে। তারপর কিটিকে বললেন যে তাকে আজ ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে, কারেনিনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন শ্যেরবাৎস্কির। এক মিনিটের মধ্যে তিনি এই সামাজিক ময়দার তালটা এমন বদলে দিলেন যে ড্রয়িং-রুম যা হয়ে দাঁড়াল বলার নয়, চাঙ্গা হয়ে উঠল কণ্ঠস্বর। ছিলেন না শুধু কনস্তান্তিন লেভিন। তবে সে বরং ভালোই, কেননা ভোজনকক্ষে গিয়ে অব্লোন্স্কি সভয়ে দেখলেন যে পোর্ট, ওয়াইন আর শেরি আনা হয়েছে লেভে থেকে নয়, দেভ্রে থেকে। যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি লেভে’র কাছে কোচোয়ানকে পাঠাবার ব্যবস্থা করে তিনি আবার ফিরলেন ড্রয়িং-রুমে।
