‘আসতে দাও!’ কাগজপত্র গুটিয়ে রাইটিং কেসে রাখতে রাখতে চেঁচিয়ে বললেন তিনি।
‘দেখলে তো মিথ্যে কথা বলছিলে, উনি তো ঘরেই আছেন!’ যে চাপরাশিটা তাঁকে ঢুকতে দিচ্ছিল না তাকে বললেন অব্লোন্স্কি এবং আসতে আসতেই ওভারকোট খুলে ঘরে ঢুকলেন। ‘ভারি আনন্দ হচ্ছে যে, তোমাকে ধরতে পেরেছি! তাহলে আশা করছি…’ ফুর্তিতে শুরু করলেন অব্লোন্স্কি।
‘আমি যেতে পারব না।’ উঠে দাঁড়িয়ে, অতিথিকে বসতে না বলে নিরুত্তাপ গলায় বললেন কারেনিন।
যে স্ত্রীর বিরুদ্ধে তিনি বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা আনছেন তার ভাইয়ের সাথে যে শীতল মনোভাব নেওয়া তাঁর উচিত সেটা তখনই নেবেন বলে তিনি ভেবেছিলেন; কিন্তু ভালোমানুষির যে সাগর অব্লোন্স্কির হৃদয়ের কূল ছাপিয়ে উঠছিল, সেটা তিনি হিসেবে ধরেননি।
নিজের পরিষ্কার ঝকঝকে দু’চোখ বড় বড় করে মেলে ধরলেন অব্লোন্স্কি।
‘যেতে পারবে না কেন? কি বলতে চাইছ তুমি?’ ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে বললেন ফরাসি ভাষায়, ‘ও চলবে না, তুমি যে কথা দিয়েছ। আমরা সবাই তোমার ভরসা করে আছি।’
আমি বলতে চাইছি যে, আপনাদের ওখানে আমি যেতে পারি না। কেননা আমাদের মধ্যে যে আত্মীয়তার সম্পর্কে ছিল তা ছিন্ন করতে হবে আমাকে। ‘
‘সে কি? মানে, কি ব্যাপার? কেন?’ হেসে অব্লোন্স্কি বললেন।
‘কারণ আপনার ভগিনী, আমার স্ত্রীর সাথে বিবাহবিচ্ছেদের মামলা শুরু করছি আমি। আমার উচিত…’
কিন্তু তিনি কথা শেষ করতে-না-করতেই অব্লোন্স্কি যা করলেন সেটা তিনি কল্পনাও করতে পারেন না। ‘আহ্’ শব্দ করে তিনি ধপ করে বসে পড়লেন চেয়ারে।
‘না, কারেনিন, কি বলছ তুমি!’ অব্লোন্স্কি চেঁচিয়ে উঠলেন, মুখে তাঁর ফুটে উঠল যন্ত্রণার ছাপ।
‘ব্যাপারটা তাই-ই।’
‘মাপ করো আমাকে, আমি এটা বিশ্বাস করতে পারি না…’
কারেনিন বসলেন, টের পেলেন যে তিনি যা আশা করেছিলেন তাঁর কথায় সে প্রতিক্রিয়া হয়নি, তাঁকে এখন সবটা বুঝিয়ে বলতে হবে এবং যাই তিনি বোঝেন, শ্যালকের সাথে তাঁর সম্পর্ক তাই থাকবে, যা ছিল। বললেন, ‘হ্যাঁ, বিবাহবিচ্ছেদ দাবি করার দুঃসহ আবশ্যিকতা দেখা দিয়েছে আমার সামনে।’
‘শুধু একটা কথা বলি, কারেনিন। আমি তোমাকে চমৎকার ন্যায়পর একজন মানুষ বলে জানি। আন্নাকেও জানি, মাপ করো আমাকে, ওর সম্পর্কে নিজের মতামত বদলাতে আমি অক্ষম, ওকে আমি জানি সুন্দর, চমৎকার এক নারী বলে, তাই মাপ করো আমাকে, এটা আমি বিশ্বাস করতে পারছি না। এখানে কিছু-একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে।
‘আহ্, যদি মাত্র ভুল বোঝাবুঝির ব্যাপার হত…’
‘দাঁড়াও, আমি বুঝতে পারছি’, ওঁর কথায় বাধা দিলেন অব্লোন্স্কি, ‘তা সে তো বটেই… শুধু একটা কথা : তাড়াহুড়া করো না। না-না, তাড়াহুড়া করবে না!’
‘আমি তাড়াহুড়া করিনি’, নিরুত্তাপ গলায় বললেন কারেনিন, ‘আর এ ধরনের ব্যাপারে কারোর পরামর্শ নেওয়াও চলে না। আমি মন স্থির করে ফেলেছি।’
‘এ যে ভয়ংকর ব্যাপার!’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন অব্লোন্স্কি। আমি হলে এক কাজ করতাম কারেনিন। মিনতি করছি, তুমি এটা কর, উনি বললেন, ‘আমি যা বুঝছি, মামলা এখনো শুরু হয়নি। মামলা শুরু করার আগে আমার স্ত্রীর সাথে দেখা করো, কথা বল তার সাথে। বোনের মত সে আন্নাকে ভালোবাসে, তোমাকেও ভালোবাসে, আশ্চর্য মানুষ সে। দোহাই তোমার, কথা বল ওর সাথে! এই উপকারটুকু আমার জন্যে কর, মিনতি করছি!’
চিন্তামগ্ন হলেন কারেনিন, দরদভরে অবলোন্স্কি তাকিয়ে রইলেন তাঁর দিকে, তাঁর নীরবতা ভঙ্গ করলেন না।
‘তুমি যাবে তো ওর কাছে?’
‘জানি না। এ কারণেই আপনাদের ওখানে যাইনি। আমি মনে করি, আমাদের সম্পর্ক বদলানো উচিত।‘
‘কিসের জন্যে! আমি তো তার কোন কারণ দেখছি না। আমাকে অন্তত এটা ভাবতে দাও যে আমাদের মধ্যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছাড়াও তোমার প্রতি সব সময় যে সৌহার্দ্য পোষণ করে এসেছি তার অন্তত খানিকটা তোমারও আছে আমার প্রতি…এবং সত্যকার শ্রদ্ধা’, ওঁর হাতে চাপ দিয়ে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘তোমার সবচেয়ে খারাপ অনুমানটাই যদি ন্যায্যা হয়, তাহলেও আমি কোন পক্ষকেই বিচার করার দায়িত্ব নিচ্ছি না, কখনো নেবও না এবং কেন আমাদের সম্পর্ক বদলানো উচিত তার কোন কারণ দেখছি না আমি। এবার এটা করো, চল আমার স্ত্রীর কাছে।’
‘আমরা ব্যাপারটা দেখছি ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিতে’, নিরুত্তাপ কণ্ঠে বললেন কারেনিন, ‘তবে ও-নিয়ে আলোচনা থাকে।’
‘না-না, কেন আসবে না তুমি? অন্তত আজ ডিনারে। স্ত্রী আশা করছে তোমাকে। এসো দয়া করে। আর প্রধান ব্যাপার, কথা বল ওর সাথে। আশ্চর্য মানুষ সে। দোহাই তোমার, নতজানু হয়ে মিনতি করছি!’
‘এতই যখন আপনার ইচ্ছে, বেশ যাব’, দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন কারেনিন।
এবং প্রসঙ্গ পালটাবার বাসনায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন অব্লোন্স্কির নতুন অধিকর্তার কথা, যাতে দুজনেরই আগ্রহ। ভদ্রলোক এখনো বৃদ্ধ হননি আর হঠাৎ কিনা পেয়ে গেলেন এত উঁচু একটা পদ।
কাউন্ট আনিচুকিনকে কারেনিন আগেও পছন্দ করতেন না, সব সময়ই পার্থক্য ঘটত তাঁদের মতামতে, কিন্তু এখন কর্মক্ষেত্রে যে ব্যক্তির পদোন্নতি হল তার প্রতি পরাজিতের যে বিদ্বেষ চাকুরেদের কাছে বোধগম্য তা থেকে বিরত
থাকতে পারলেন না।
