‘তা মরণের ভাবনা করা আমার বন্ধ হবে না’, লেভিন বললেন, সত্যি, মরার সময় হয়েছে। আর বাকি সব একেবারে বাজে। আমি তোমাকে সত্যি কথাই বলছি : আমার ভাবনাগুলোকে, আমার কাজকে মূল্য দিই আমি; কিন্তু আসলে—তুমি ভেবে দ্যাখো : আমাদের এই গোটা দুনিয়াটা হল ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গ্রহের ওপর গজিয়ে ওঠা ছত্রাক। অথচ আমরা ভাবছি : মহতী কিছু-একটা থাকতে পারে আমাদের এখানে, চিন্তা, কর্ম! এসবই বালুকণা মাত্র।’
‘এ কথাটা—আমাদের দুনিয়াটার মতই পুরানো।’
‘পুরানো, কিন্তু জানো, কথাটা যখন পরিষ্কার বুঝবে, সব তখন কেমন যেন হয়ে ওঠে অকিঞ্চিৎকর। যখন বুঝবে যে আজ বা কাল মারা যাবে, কিছুই তোমার টিকে থাকবে না তখন সবই তুচ্ছ! নিজের ভাবনাটাকে আমি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি কিন্তু সেটা যদি কাজে পরিণত করাও যায়, তাহলেও দেখা যাবে সেটা ঐ ভালুকটা মারার মতই তুচ্ছ। এভাবেই জীবন কাটে, মেতে থাকি শিকার নিয়ে, কাজ নিয়ে, শুধু মরণের চিন্তাটা যাতে না আসে।’
লেভিনের কথা শুনে সূক্ষ্ম সস্নেহে একটা হাসি ফুটল অব্লোন্স্কির মুখে।
‘সে তো বটেই! এই তো তুমি এসেছিলে আমার কাছে। মনে আছে, আমি জীবন উপভোগ করতে চাই বলে তুমি আমাকে আক্রমণ করেছিলে?’
‘অত কঠোর হয়ো না নীতিবাদী!… ‘
‘তাহলেও জীবনে ভালোটা হল এই…’ লেভিন গোলমালে পড়ে গেলেন, ‘না, আমি ঠিক জানি না। শুধু জানি যে মরব শিগগিরই।
‘কেন শিগগির ‘
‘আর জানো মৃত্যুর কথা ভাবলে জীবনের অনেক মাধুর্য খোয়া যায়, তবে শান্তি মেলে।
উল্টো, শেষের দিকে বরং খুশি লাগে বেশি। তবে আমার সময় হয়ে গেছে’, দশ বারের বার উঠে দাঁড়িয়ে অব্লোন্স্কি বললেন।
‘না-না, খানিক বসো’, তাঁকে আটকালেন লেভিন, ‘কবে আবার দেখা হবে? আমি তো কালই চলে যাচ্ছি।’
‘বাঃ বেশ লোক বটে আমি!’ কেন এসেছিলাম এখানে… অবশ্য-অবশ্য আজ আসবে আমার ওখানে খেতে। তোমার ভাই থাকবে, আমার ভগিনীপতি কারেনিনও থাকবে।’
‘সে কি এখানে?’ লেভিন বললেন, কিটির কথা জিজ্ঞেস করার ইচ্ছে হয়েছিল। শুনেছিলেন শীতের গোড়ায় কিটি ছিল পিটার্সবুর্গে কূটনীতিকের স্ত্রী, বোনের কাছে। জানতেন না ফিরেছে কিনা। তবে জিজ্ঞেস করলেন না। ‘থাকে থাকবে, না থাকে নেই—এসে যায় না কিছুতে।
‘আসছ তো?’
‘নিশ্চয়ই।’
‘তাহলে পাঁচটার সময়, ফ্রক-কোট চাপিয়ে।’
অব্লোন্স্কি উঠে পড়লেন, গেলেন নিচে নতুন অধিকর্তার কাছে। স্বতঃবোধ প্রতারণা করেনি তাঁকে। ভয়ংকর নতুন অধিকর্তা দেখা গেল বেশ অমায়িক লোক। অব্লোন্স্কি তাঁর সাথে জলযোগ সারলেন এবং এতটা সময় কাটালেন যে, কারেনিনের কাছে পৌঁছতে পারলেন কেবল তিনটার পর।
আট
কারেনিন প্রভাতী উপাসনা থেকে ফিরে সারাটা সকাল নিজের ঘরেই কাটালেন। সেদিন সকালে তাঁর করার কাজ ছিল দুটো : প্রথমত, অরুশ জাতিদের যে প্রতিনিধিদল পিটার্সবুর্গ যাবার পথে এখন মস্কোয় আছে তাদের গ্রহণ করে সেখানে পাঠানো : দ্বিতীয়ত, অ্যাডভোকেটের কাছে প্রতিশ্রুত চিঠিটা লেখা। কারেনিনের উদ্যোগেই আহূত হলেও প্রতিনিধিদল তাঁর অনেক অসুবিধা, এমন কি তাঁর পক্ষে বিপদেরও কারণ হয়েছিল, মস্কোয় তাদের ধরতে পেরে খুশি হয়েছিলেন তিনি। নিজেদের কারণ হয়েছিল, মস্কোয় তাদের ধরতে পেরে খুশি হয়েছিলেন তিনি। নিজেদের ভূমিকা ও দায়িত্ব সম্পর্কে এ দলের সদস্যদের সামান্যতম জ্ঞানও ছিল না। সরলতাবেশে তাদের স্থির ধারণা হয়েছিল যে তাদের কাজ হল নিজেদের প্রয়োজনের কথা বলা এবং বর্তমান অবস্থাটা জানানো, সরকারের কাছ থেকে সাহায্য চাওয়া, তাদের আদৌ কোন জ্ঞান ছিল না যে তাদের কোন কোন দাবি ও আরজি শত্রুপক্ষকে সাহায্য করছে এবং পশু করে দিচ্ছে গোটা ব্যাপারটা। কারেনিন অনেকক্ষণ ধরে ব্যস্ত রইলেন তাদের নিয়ে, তাদের জন্য লিখে দিলেন একটা কর্মসূচি, যার বাইরে যাওয়া তাদের চলবে না, তারপর তাদের ছেড়ে দিয়ে পিটার্সবুর্গে চিঠি লিখলেন প্রতিনিধিদের তদারকির জন্য। এ ব্যাপারে প্রধান সাহায্যকারিণী হওয়ার কথা কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনার। প্রতিনিধিদের ব্যাপার-স্যাপারে উনি বিশেষজ্ঞ, তাঁর প্রতিনিধিদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সত্যিকার সলাপরামর্শ দিতে পারত না আর কেউ। এটা সেরে কারেনিন চিঠি লিখলেন অ্যাডভোকেটকে। এতটুকু দ্বিধা না করে তাঁর বিচার-বিবেচনা মত কাজ করার অনুমতি তাঁকে তিনি দিলেন। ছিনিয়ে নেওয়া পোর্টফোলিওতে তিনি আন্নার কাছে ভ্রন্স্কির যে তিনটা চিঠি পেয়েছিলেন, তাও পুরে দিলেন খামের মধ্যে।
কারেনিন যেদিন ঘরে আর না ফেরার সংকল্প নিয়ে বেরিয়ে যান, এবং যেদিন তিনি অ্যাডভোকেটের কাছে গিয়ে অন্তত একটা মানুষের কাছে নিজের সংকল্পের কথা বলেছিলেন এবং বিশেষ করে যেদিন তিনি জীবনের এই ব্যাপারটাকে কাগজের ব্যাপার করে তোলেন, সেদিন থেকে তিনি ক্রমে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলেন নিজের সংকল্প এবং এখন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলেন তা কার্যে পরিণত করার সম্ভাবনা।
অ্যাডভোকেটের কাছে লেখা খামটায় যখন তিনি সীল মারছিলেন, কানে এর অবলোন্স্কির উচ্চ কণ্ঠস্বর। চাকরের সাথে বচসা হচ্ছিল অব্লোন্স্কির, তিনি দাবি করছিলেন যে তাঁর আগমন কর্তাকে জানানো হোক।
কারেনিন ভাবলেন, ‘বয়ে গেল, এ বরং ভালোই : ওর বোন সম্পর্কে আমার অবস্থাটা এখুনি ওকে জানিয়ে দিয়ে বলব কেন ওর ওখানে খেতে যেতে আমি পারি না।’
