‘ও হ্যাঁ, পারমেজান। নাকি তোমার পছন্দ অন্য কিছু।
না, আমার কিছু এসে যায় না, হাসি চাপতে না পেরে বললেন লেভিন।
ফ্রক-কোটের টেইল উড়িয়ে তাতার ছুটে গেল এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ফিরে এল এক প্লেট খুলে ফেলা ঝিনুকের ঝকঝকে ভোলার ভেতর তার শাস আর আঙুলের ফাঁকে ধরা একটা বোতল নিয়ে।
মাড় দেওয়া ন্যাপকিনটা দলা-মোচড়া করে অবলোনস্কি সেটা তার ওয়েস্টকোটে খুঁজলেন এবং শান্তভাবে আয়েস করে হাত রেখে লাগলেন শুক্তি মাংসের সদ্গতিতে।
মন্দ নয়’, রুপার চামচে দিয়ে ঝিনুকের খোলা থেকে মাংস ছাড়াতে ছাড়াতে তিনি বললেন, ‘মন্দ নয়! চকচকে সজল চোখে কখনো তাতার, কখনো লেভিনের দিকে তাকিয়ে পুনরুক্তি করলেন তিনি।
ঝিনুকও লেভিন খেলেন যদিও পনিরের সাথে সাদা রুটি তার বেশি ভালো লাগতো। কিন্তু অবলোনস্কিকে তিনি তাকিয়ে দেখছিলেন মুগ্ধ হয়ে। এমন কি তাতারটিও বোতলের ছিপি খুলে পাতলা পানপাত্রে ফেনিল সুরা ঢালতে ঢালতে তার সাদা টাইটা ঠিক করে নিয়ে চাইছিল অবলোনস্কির দিকে।
নিচের পাত্র নিঃশেষ করে অবলোনস্কি বললেন, ‘ঝিনুক তোমার বিশেষ ভালো লাগে না, তাই না? নাকি কিছু একটা দুশ্চিন্তায় আছ? এ্যাঁ?
উনি চাইছিলেন লেভিন যেন হাসিখুশি হয়ে ওঠেন। কিন্তু লেভিনের যে শুধু খুশিই লাগছে না তাই নয়, সংকোচই । লাগছিল। তার মনে যে ভাবনাটা রয়েছে তাতে এই খানাঘরে, এই কেবিনগুলোর মধ্যে যেখানে মহিলাদের নিয়ে । আহার করছে লোকে, এই ছুটোছুটি আর ব্যস্ততার মাঝখানে তার কেমন ভয়-ভয় করছিল, অস্বস্তি হচ্ছিল; ব্রোঞ্জ, আয়না, গ্যাসের আলো আর তাতারদের এই পরিবেশটা অপমানকর ঠেকছিল তাঁর কাছে। ভয় হচ্ছিল, তার হৃদয় যাতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে তাতে বুঝি মালিন্য লাগবে।
বললেন, ‘আমি? হ্যাঁ, আমি একটু চিন্তায় আছি; কিন্তু তা ছাড়াও এই সব কিছু আমাকে ঠেসে ধরছে। আমি একটা গ্রাম্য লোক, তুমি ভাবতেই পারবে না আমার কাছে এ সবই বিকট, তোমার কাছে যে ভদ্রলোককে দেখেছিলাম, তার নখের মত…’
হেসে অবলোনস্কি বললেন, হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি বেচারা গ্রিনেভিচের নখে কৌতূহলী হয়ে উঠেছিলে তা দেখেছিলাম।
লেভিন বললেন, ‘আমি পারি না। তুমি আমার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে দেখার চেষ্টা কর, গ্রাম্য লোকের দৃষ্টিভঙ্গি নাও। গ্রামে আমরা হাত-দুখানা এমন অবস্থায় রাখার চেষ্টা করি যাতে কাজের সুবিধা হয়। তার জন্য নখ কেটে ফেলি, মাঝে মাঝে আস্তিন গুটিয়ে রাখি। আর এখানে লোকে ইচ্ছে করে যতটা পারা যায় নখ রাখে, আর কফে লাগায় পিরিচের মত চওড়া বোতাম যাতে হাত দিয়ে কিছু করতে না হয়।
অবলোনস্কি খুশিতে হেসে উঠলেন।
‘হ্যাঁ, ওর যে স্থল পরিশ্রমের প্রয়োজন নেই, এটা তার লক্ষণ। কাজ করে ওর মাথা…’
হয়ত তাই। তাহলেও আমার কাছে এটা বিকট লাগে যে আমরা গাঁয়ের লোকেরা কাজে লাগার জন্য তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে নিই, আর তুমি আমি চেষ্টা করছি খাওয়াটা যত পারা যায় লম্বা করতে, আর তাই ঝিনুকের মাংস খাচ্ছি ..’
‘সে তো বলাই বাহুল্য, কথাটা লুফে নিলেন অবলোনস্কি, শিক্ষাদীক্ষার লক্ষ্যই তো এই : সব কিছু থেকে তৃপ্তি হেঁকে নেওয়া।
তাই যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে আমি বরং বুনো হয়েই থাকতে চাই।’
এমনিতেই তো তুমি বুনো। বুনো লেভিনরা সবাই।’
দীর্ঘশ্বাস নিলেন লেভিন। মনে পড়ল নিকোলাই ভাইয়ের কথা, লজ্জা আর কষ্ট হল তাঁর, ভুরু কুঁচকে গেল। কিন্তু অবলোনস্কি এমন বিষয় নিয়ে কথা শুরু করলেন যে সাথে সাথেই তাতে আকৃষ্ট হলেন তিনি।
ঝিনুকের শুন্য খড়খড়ে খোলাগুলোকে সরিয়ে দিয়ে তিনি পনির টেনে এনে রীতিমত চোখ চকচক করে বললেন, ‘কি, ওদের ওখানে, মানে শ্যেরবাস্কিদের ওখানে যাবে?
হ্যাঁ, অবশ্যই যাব’, বললেন লেভিন, যদিও আমার মনে হয়েছিল যে প্রিন্স-মহিষী আমাকে ডেকেছেন অনিচ্ছায়।
‘কি বলছ? একেবারে বাজে কথা! এই ওঁর ধরন…ওহে ভাই, স্যুপ দাও!…ওটা ওঁর বড়লোকী স্বভাব’, বললেন অবলোনস্কি, ‘আমিও যাব, কিন্তু কাউন্টেস বানিনার ওখানে রিহার্সালে থাকতে হবে আমাকে। কিন্তু তুমি বুনো নও কি বলে? হঠাৎ তুমি মস্কো থেকে উধাও হলে, কি তার ব্যাখ্যা? তোমার সম্পর্কে শ্যেরবাৎস্কিরা আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন অবিরাম, যেন আমারই জানার কথা। আর আমি জানি শুধু একটা জিনিস : তুমি সব সময়ই তাই কর যা কেউ করে না।
‘হ্যাঁ’, লেভিন বললেন ধীরে ধীরে, বিচলিত হয়ে, ‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, আমি বুনো। তবে আমি যে চলে গিয়েছিলাম তাতে নয়, ফিরে যে এলাম, এতেই আমার বন্যত্ব প্রকাশ পাচ্ছে…’
‘ওহ্, কি সুখী তুমি!’ লেভিনের চোখে চোখে তাকিয়ে তার কথার খেই ধরে বললেন অবলোনস্কি।
কেন?
‘দৌড়বাজ ঘোড়াকে চেনা যায় তার গায়ে দাগা মার্কা দেখে, আর প্রেমিক যুবককে চেনা যায় তার ভাবাকুল চোখ দেখে’, বড় গলায় বললেন অবলোনস্কি, সব কিছুই তোমার সামনে।
‘আর তোমার কি সবই পেছনে?’
না, পেছনে না হলেও ভবিষ্যৎ তোমার, আর আমার আছে বর্তমান–এমনি, গিঠে গিঠে বাঁধা।
‘কেন, কি ব্যাপার?
‘ভালো নয়। মানে, নিজের কথা আমি বলতে চাই না, তার ওপর সব বুঝিয়ে বলা অসম্ভব’, বললেন অবলোনস্কি, ‘তা তুমি মস্কো এলে কেন?… ওহে প্লেটগুলো সরিয়ে নাও!’ তাতারের উদ্দেশে হাঁক দিলেন তিনি।
