অব্লোন্স্কি নিজে খেতে ভালোবাসেন, তবে আরো বেশি ভালোবাসেন অন্যকে খাওয়াতে, পার্টি হবে ছোট, কিন্তু আহার্য, পানীয় ও আমন্ত্রিত নির্বাচনে উপাদেয়। সেদিনকার ডিনারের কর্মসূচিটা তাঁর খুব মনে ধরেছে : থাকবে টাটকা পার্চ মাছ আর অ্যাসপারাগাস এবং প্রধান খাদ্য হবে অপূর্ব কিন্তু সাধারণ রোস্ট বীফ এবং যথাযোগ্য মদ : এই গেল খাদ্য আর পানীয়ের ব্যাপার। অতিথিদের মধ্যে থাকবে কিটি আর লেভিন এবং জিনিসটা যাতে দৃষ্টিকটু না লাগে সে জন্য ডাকা হয়েছে এক খালাতো বোন আর তরুণ শ্যেরবাৎস্কিকে, অতিথিদের মধ্যে প্রধান খাদ্য হবে কজ্নিশেভ সের্গেই এবং কারেনিন। কজ্নিশেভ-মস্কোওয়ালা, দার্শনিক, কারেনিন-পিটার্সবুর্গী, জাগতিক। হ্যাঁ, আরও ডাকবেন বিখ্যাত বাতিকগ্রস্ত উৎসাহী পেস্তসোভকে যিনি একাধারে উদারনীতিক, বাপ্রিয়, সুরকার, ঐতিহাসিক ও সুমিষ্ট পঞ্চাশ-বছুরে এক কিশোর, যিনি কজ্নিশেভ ও কারেনিনের চাটনি বা সসের কাজ করবেন। তিনি ওঁদের চটাবেন আর লেলিয়ে দেবেন পরস্পরের বিরুদ্ধে
বন বিক্রির টাকার দ্বিতীয় কিস্তি পাওয়া গেছে, এখনো তা খরচ হয়ে যায়নি। ডল্লি ইদানীং খুব ভালো, মিষ্টি ব্যবহার করছেন, ডিনার পার্টির আইডিয়াটায় সব দিক থেকেই খুশি লাগছিল অব্লোন্স্কির। খুবই শরীফ তাঁর মেজাজ। শুধু দুটো ব্যাপার কিছুটা অপ্রীতিকর, কিন্তু অব্লোন্স্কির চিত্তভরপুর-করা উদার ফুর্তির সাগরে দুটো ব্যাপারই তলিয়ে গেছে। ব্যাপার দুটো হল : প্রথম, গতকাল রাস্তায় কারেনিনের সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যাবার সময় উনি লক্ষ্য করেছিলেন যে ভদ্রলোক তাঁর প্রতি শুষ্ক ও কঠোর, তাঁর এই মুখভাব এবং মস্কোয় এসে তিনি যে তাঁর কাছে যাননি, আত্মগোপন করে থেকেছেন, তার সাথে আন্না আর ভ্রন্স্কিকে নিয়ে যেসব কথা তাঁর কানে এসেছে তা মিলিয়ে অব্লোন্স্কি অনুমান করলেন যে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কিছু একটা নটখট বেঁধেছে।
এই হল একটা অপ্রীতিকর ব্যাপার। খানিকটা অপ্রীতিকর দ্বিতীয় ব্যাপারটা হল এই যে, সমস্ত নতুন অধিকর্তার মত এই নতুন অধিকর্তাটিরও ভয়ংকর লোক বলে নামডাক আছে যিনি শয্যা ত্যাগ করেন সকাল ছ’টায়, ঘোড়ার মত খাটেন এবং একই রকম খাটুনি দাবি করেন অধীনস্থদের কাছ থেকে। তাছাড়া লোকজনের সাথে আচার-ব্যবহার ভল্লুক বলে নতুন অধিকর্তাটির খ্যাতি আছে। আগের কর্তা যে ধারা অনুসরণ করতেন এবং আজ পর্যন্ত অব্লোন্স্কি যে ধারা অনুসরণ করে আসছেন, শোন যার এঁর ধারাটি ঠিক তার বিপরীত। আগের দিন অব্লোন্স্কি অফিসে এসেছিলেন উর্দি পরে এবং নতুন অধিকর্তা তাঁর প্রতি খুবই সৌজন্য প্রকাশ করেন, কথা বলেন পরিচিতের মত; সেই জন্য ফ্রককোট পরে তাঁকে দেখতে যাওয়া কর্তব্য বলে গণ্য করেছিলেন অব্লোন্স্কি। নতুন অধিকর্তা তাঁকে ভালোবাসা গ্রহণ নাও করতে পারেন—এই ভাবনাটা হল আরেকটা বিছছিরি ব্যাপার, কিন্তু স্বতঃপ্রবৃত্তিতে অব্লোন্স্কি অনুভব করছিলেন গিয়ে পাপী। কেন চটাচটি-ঝগড়াঝাঁটি করা?’ হোটেলে ঢুকতে ঢুকতে ভাবছিলেন তিনি।
‘এই যে ভাসিলি’, বাঁকা করে টুপি পরে করিডর দিয়ে যেতে যেতে পরিচিত এক চারপাশিকে বললেন তিনি। ‘গালপাট্টা রাখতে শুরু করেছ দেখছি। লেভিন—সাত নম্বর কামরায়, তাই না? আমাকে নিয়ে চল না। আর হ্যাঁ, জেনে এসো তো, কাউন্ট আনিচ্কিনের’ (ইনিই নতুন অধিকর্তা) ‘সাথে দেখা করা চলবে কিনা।’
‘জ্বি আচ্ছা’, হেসে জবাব দিলে ভাসিলি, ‘অনেকদিন আমাদের এখানে আসেননি।’
‘কাল এসেছিলাম, তবে অন্য প্রবেশপথ দিয়ে। এটা সাত নম্বর?’
অব্লোন্স্কি যখন ভেতরে ঢুকলেন, লেভিন তখন ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভের গুবের্নিয়ার এক চাষীর সাথে মাপকাঠি দিয়ে টাটকা মারা একটা ভালুকের চামড়া মাপছিলেন।
‘ওহো মেরেছ?’ চেঁচিয়ে উঠলেন অব্লোন্স্কি, ‘খাসা চীজ! মাদী ভালুক?…
চাষীর করমর্দন করে ওভারকোট টুপি না খুলে চেয়ারে বসলেন তিনি।
‘আরে ওগুলো ছাড়ো-না, বসো’, ওঁর মাথা থেকে টুপি খুলতে খুলতে লেভিন বললেন।
‘না, সময় নেই আমার। এসেছি এক সেকেন্ডের জন্যে’, জবাব দিলেন অব্লোন্স্কি। ওভারকোটের বোতাম খুললেন তিনি, তারপর কোটটাই খুলে ফেললেন এবং শিকার নিয়ে আর অতি অঙ্গরঙ্গ সব বিষয় নিয়ে গল্প করে কাটালেন ঝাড়া এক ঘণ্টা।
‘তা বল তো, কি তুমি করলে বিদেশে? কোথায় গিয়েছিলে?’ চাষী বেরিয়ে যেতে বললেন অব্লোন্স্কি। ‘গিয়েছিলাম জার্মানিতে, প্রাশিয়ায়, ফ্রান্সে, ইংলন্ডে, তবে রাজধানীগুলোয় নয়, ফ্যাক্টরি-শহরগুলোতে, নতুন অনেক কিছু দেখা গেল। গিয়ে আনন্দই হচ্ছে।’
‘হ্যাঁ, শ্রমিকদের সংগঠন নিয়ে তোমার ধারণাটা জানা আছে আমার।’
‘মোটেই না : রাশিয়ায় শ্রমিকের প্রশ্ন উঠতেই পারে না। রাশিয়ায় প্রশ্নটা হল জমির সাথে শ্রমজীবী মানুষের সম্পর্ক নিয়ে। ও প্রশ্নটা ওখানেও আছে, তবে ওটা হল যা নষ্ট হয়েছে তার মেরামতি নিয়ে কিন্তু আমাদের এখানে…’
অব্লোন্স্কি মন দিয়ে লেভিনের কথা শুনছিলেন। বললেন, ‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, খুব সম্ভব তোমার কথাই ঠিক।’ যোগ করলেন, ‘কিন্তু তুমি বেশ খোশ মেজাজে আছ দেখে আনন্দ হচ্ছে; ভালুক শিকারেও যাচ্ছ, আবার কাজও করছ, মেতে থাকছ। অথচ শ্যেরবাৎস্কি আমাকে বলেছিল, তোমার সাথে দেখা হয়েছিল ওর—তুমি নাকি মনমরা হয়ে আছে, মৃত্যুর কথা বলছ…’
