কারেনিনের যাত্রাটা খুবই সোরগোল তুলল আরো এই জন্য যে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাবার জন্য বারোটা ঘোড়া ভাড়ার যে টাকা তাঁকে দেওয়া হয়েছিল যাত্রার ঠিক আগে, সরকারীভাবে সে টাকা তিনি ফেরত দেন।
এই প্রসঙ্গে প্রিন্সেস মিয়াগ্কায়াকে বেত্সি বললেন, ‘আমি এটাকে খুবই মহৎ কাজ বলে মনে করি। কেন ডাক- ঘোড়ার জন্যে ভাতা দেওয়া যখন সবাই জানে যে লোকে আজকাল সর্বত্র যাচ্ছে রেলে।’
প্রিন্সেস মিয়াকায়া মানলেন না, বেত্সির মতে তিনি বিরক্তই হলেন। বললেন, ‘ও কথা বলা আপনার পক্ষে সোজা—যখন লাখ লাখ টাকা আছে আপনার, জানি না কত? তবে আমার স্বামী যখন গ্রীষ্মকালে পরিদর্শনে যায় তখন আমার খুবই ভালো লাগে। ওর কাছেও সফরটা স্বাস্থ্যকর এবং উপাদেয় আর ওই টাকায় আমিও গাড়ি আর কোচোয়ান রাখতে পারি।’
দূরের গুবের্নিাগুলোয় যাবার পথে কারেনিন তিন দিন রইলেন মস্কোয়।
আসার পরের দিন তিনি দেখা করতে গেলেন বড়লাটের সাথে। ফেরার পথে জাগেনি গলির মোড়ে সব সময় যেখানে গাড়ি আর গাড়োয়ানের ভিড় জমে যায, সেখানে হঠাৎ এত সোল্লাসে উচ্চৈস্বরে তাঁর নাম ধরে ডাক শুনলেন যে ফিরে না তাকিয়ে পারলেন না। ফুটপাতের কোণে ফ্যাশনদুরস্ত ছোট কোটে আর ফ্যাশনদুরস্ত ছোট টুপি বাঁকা করে পরে অব্লোন্স্কি দাঁড়িয়ে ছিলেন হাসিমুখে, লাল ঠোঁটের ফাঁকে ঝলমল করছে সাদা দাঁত, আনন্দ তাঁর ধরছে না, যৌবনে দীপ্তিমান, দৃঢ়ভাবে নাছোড়বান্দার মত চেঁচিয়ে তাঁকে বলছেন থামতে। মোড়ে থেমে থাকা একটা গাড়ি জানালা এক হাতে ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। যার ভেতর থেকে মুখ বাড়িয়ে ছিল মখমলে টুপি পরা একটা মহিলা আর দুটো শিশুর মাথা, অন্য হাতে তিনি জামাতাকে হাতছানি দিচ্ছিলেন হেসে। মহিলাটিও দরাজ হাসিমুখে হাত নাড়লেন কারেনিনের উদ্দেশে। উনি হলেন সন্তান ডল্লি।
মস্কোয় কারো সাথে দেখা করার ইচ্ছে ছিল না কারেনিনের, স্ত্রীর ভাইয়ের সাথে তো একেবারেই নয়। টুপি তুলে সৌজন্যটুকু দেখিযে তিনি এগিয়ে যেতে চাইছিলেন কিন্তু অব্লোন্স্কি তাঁর কোচোয়ানকে থামতে বলে বরফের ওপর দিয়ে ছুটে গেলেন তাঁর কাছে।
‘খবর না দেওয়াটুকুও মহা অপরাধ হত বুঝি! কবে এলে? কাল আমি গিয়েছিলাম দ্যুসো হোটেলে, আবাসীদের নামের বোর্ডে দেখি লেখা ‘কারেনিন’। একেবারে খেয়ালই হয়নি যে ওটা তুমি!’ গাড়ির জানালায় মাথা গলিয়ে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘নইলে তখনই যেতাম। তোমাকে দেখে কি যে আনন্দ হচ্ছে!’ তুষারকণা ঝেড়ে ফেলার জন্য পায়ে পা ঠুকে বললেন তিনি, পুনরুক্তি করলেন, ‘কি মহাপাপ, খবরটুকুও না দেওয়া!’
‘সময় ছিল না, বড় ব্যস্ত’, শুকনো গলায় বললেন কারেনিন।
‘চল, আমার স্ত্রীর কাছে, তোমাকে সে খুবই দেখতে চায়।’
যে কম্বলটায় কারেনিনের শীতার্ত পা জড়ানো ছিল সেটা খুলে গাড়ি থেকে নেমে তুষারপাতের মধ্যে দিয়ে তিনি গেলেন দারিয়ার আলেক্সান্দ্রভনার কাছে।
‘কি ব্যাপার কারেনিন। আমাদের এড়িয়ে এড়িয়ে যাচ্ছেন কেন?’ হেসে ডল্লি বললেন।
‘বড় ব্যস্ত ছিলাম। খুব খুশি হলাম আপনাকে দেখে’, বললেন এমন সুরে যাতে পরিষ্কার বোঝা গেল এতে তিনি অখুশি, ‘কেমন আছেন?
‘আমাদের আন্না বোনটির খবর কি?’
কারেনিন কি একটা গুঁইগুঁই করে বলে চলে যেতে চাইছিলেন, কিন্তু অব্লোন্স্কি থামালেন তাঁকে।
‘শোনো কাল আমরা কি করব। ডল্লি, কাল খেতে ডাকো ওকে! কজ্নিশেভ আর পেস্তসোভকেও ডাকব, যাতে মস্কো বুদ্ধিজীবীদের কিছু স্বাদ ও পায়।’
‘আসুন দয়া করে’, ডল্লি বললেন, ‘আমরা আপনার অপেক্ষায় থাকব পাঁচটায়, যদি চান ছ’টাতে। তা, আন্না বোনটি কেমন আছে? কতদিন যে…’
‘ভালো আছে’, মুখ কুঁচকে গুঁইগুঁই করলেন কারেনিন, ‘খুব খুশি হলাম!’ নিজের গাড়ির দিকে গেলেন তিনি।
‘আসবেন তো? চেঁচিয়ে ডল্লি জিজ্ঞেস করলেন।
কি একটা বললেন কারেনিন, চলন্ত গাড়ি ঘোড়ার শব্দে সেটা ডল্লি ভালো শুনতে পেলেন না।
‘আমি কাল যাব তোমার কাছে!’ তাঁর উদ্দেশে চেঁচিয়ে বললেন অব্লোনস্কি।
গাড়িতে উঠে কারেনিন এমন সেঁধিয়ে বসলেন যাতে তিনি ওঁদের না দেখেন, তাঁকেও ওঁরা দেখতে না পায়।
‘একেবারে বিদঘুটে!’ স্ত্রীকে বললেন অব্লোন্স্কি, তারপর ঘড়ি দেখে মুখের কাছে হাত দিয়ে স্ত্রী এবং সন্তানদের প্রতি স্নেহজ্ঞাপক ভঙ্গি ছুঁড়ে চটপটিয়ে চলে গেলেন ফুটপাত দিয়ে।
‘স্তিভা! স্তিভা!’ লাল হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন ডল্লি।
তিনি ঘুরে দাঁড়ালেন।
‘আমাকে যে গ্রিশা আর তানিয়ার জন্যে ওভারকোট কিনতে হবে। টাকা দাও তার জন্যে!’
‘ও কিছু না, বলে দিয়ো যে আমি পরে দামটা দিয়ে দেব’, পরিচিত একজনের উদ্দেশে ফুর্তিতে মাথা নেড়ে উধাও হয়ে গেলেন তিনি।
সাত
পরের দিন রবিবার। ব্যালের মহলায় অব্লোন্স্কি গেলেন বলশয় থিয়েটারে এবং তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় সদ্য অবতীর্ণ সুন্দরী নর্তকি মাশা চিবিসোেভাকে দিলেন গতকালকার প্রতিশ্রুতি প্রবাল নেকলেস এবং যবনিকার অন্তরালে দিনের অন্ধকারে উপহার পেয়ে জ্বলজ্বল করে ওঠা মধুর মুখখানায় একটা চুমু এঁকে দেবারও সুযোগ করে নিলেন তিনি প্রবাল নেকলেস দেওয়া ছাড়াও ব্যালের পর দেখা করা নিয়ে কথা বলে নেবারও প্রয়োজন ছিল। ব্যালের শুরুতে উপস্থিত থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়, এই, কথা জানিয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি দিলেন যে শেষ অংকে আসবেন এবং ওকে নিয়ে যাবেন নৈশাহারে। থিয়েটার থেকে অব্লোন্স্কি গেলেন অখোৎনি রিয়াদ-এ, ডিনারের জন্য মাছ আর অ্যাসপারাগাস বাছলেন নিজেই এবং বারোটার সময় পৌঁছলেন দ্যুসো হোটেলে, সেখানে তিনজনের সাথে তাঁর দেখা করার দরকার ছিল, সৌভাগ্যবশত তিনজনেই উঠেছেন একই হোটেলে : তাঁদের একজন হলেন লেভিন, সম্প্রতি তিনি ফিরছেন বিদেশ থেকে, অন্যজন তাঁর নতুন অধিকর্তা, এই উচ্চ পদে তিনি সবে অধিষ্ঠিত হয়েছেন, মস্কোয় এসেছেন পরিবর্তন, আর রয়েছেন জামাতা কারেনিন, অবশ্য-অবশ্যই তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যেহেত হবে ডিনারের।
