‘যদি তাই হয়…’, হঠাৎ বিবর্ণ হয়ে শুরু করলেন কারেনিন, কিন্তু এই সময় অ্যাডভোকেট উঠে পড়লেন, গেলেন আবার দুয়ারে দেখা দেওয়া সহকারীর কাছে।
‘ভদ্রমহিলাকে বলে দিন যে আমরা খেলো মালের ব্যাপারী নই’, এই বলে তিনি ফিরে এলেন কারেনিনের কাছে। স্বস্থানে এসে তিনি চুপিসারে আরেকটা পোকা ধরলেন, ভুরু কুঁচকে ভাবলেন, ‘গ্রীষ্ম নাগাদ আমার রেপ্স কাপড়ে বাঁধানো আসবাবগুলোর দশা ভালোই দাঁড়াবে।’
বললেন, ‘তাহলে বলুন কি বলছিলেন…’
‘আমার সিদ্ধান্ত আমি আপনাকে লিখে জানাব’, উঠে দাঁড়িয়ে কারেনিন টেবিলে ভয় দিলেন; কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে বললেন, ‘আপনার কথা থেকে তাহলে আমি ধরে নিতে পারি যে বিবাহবিচ্ছেদ পাওয়া সম্ভব। সেইসাথে অনুরোধ, আপনার ফি কত সেটা জানাবেন। ‘
‘সবই সম্ভব যদি আমার বুদ্ধিমত আমি যে ব্যবস্থাই নিই তার স্বাধীনতা দেন আমাকে’, প্রশ্নের জবাব না দিয়ে অ্যাডভোকেট বললেন, ‘কবে আপনার চিঠি পাওয়ার আশা করতে পারি?’ চোখ আর পেটেন্ট-লেদার বুট ঝকঝকিয়ে দরজার দিকে এগুতে এগুতে জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
‘এক সপ্তাহের মধ্যে। আর এ ব্যাপারটায় তদবির করার ভার আপনি নিচ্ছেন কিনা এবং এ উপকারের জন্যে কত ফি লাগবে সেটা আমাকে জানাবেন।’
‘তা বেশ।’
অ্যাডভোকেট সসম্ভ্রমে মাথা নোয়ালেন, মক্কেলের জন্য দরজা খুলে দিলেন। তারপর একা হতে আনন্দে গা ভাসালেন। এত খুশি হয়েছিলেন যে তাঁর নিয়মের বিরুদ্ধেই দরাদরি-করা মহিলাটিকে ছাড় দিলেন এবং থামালেন পোকা ধরা, একেবারে স্থির করে ফেললেন যে সামনের শীত নাগাদ সিগোনিনের মত আসবাবগুলো মখমলে বাঁধাই করে ফেলবেন।
ছয়
আগস্ট মাসের ১৭ তারিখে কমিশনের অধিবেশনে চমকপ্রদ বিজয় হয়েছিল কারেনিন কারেনিনের। কিন্তু সে বিজয়ের পরিণাম তাঁকে ল্যাঙ মারে। অরুশ জাতিদের জীবনযাত্রা সব দিক থেকে পর্যালোচনার জন্য নতুন কমিশন গঠন করে অসাধারণ দ্রুত ও উদ্যোগসহকারে তা যথাস্থানে পাঠিয়েছিলেন কারেনিন। রিপোর্ট পেশ করা হল তিন মাসের মধ্যে। অরুশদের জীবনযাত্রা বিচার করা হয়েছে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, নরকৌলিক, বৈষয়িক ও ধর্মীয় দিক থেকে। সমস্ত প্রশ্নেই উত্তর উপস্থাপিত হয়েছে চমৎকার, আর সে উত্তরে সন্দেহের অবকাশ নেই। কেননা রিপোর্ট রচিত হয়েছে সব সময় প্রমাদপ্রবণ মনুষ্যমস্তিষ্ক দ্বারা নয়, তা রচিত হয়েছে সরকারী ক্রিয়াকলাপ থেকে। সমস্ত রিপোর্টই হল সরকারী এবং রাজ্যপাল ও বিশপের রিপোর্টের ফল। যার ভিত্তি হল উয়েজ্দ শাসক ও রাজপুরুষদের রিপোর্ট, তারও আবার ভিত্তি ভলোত্ শাসন দপ্তর আর স্থানীয় পাদ্রীর রিপোর্ট; সুতরাং এ সবই উত্তর সন্দেহাতীত। দৃষ্টান্তস্বরূপ সরকারী যন্ত্রের সুবিধা ছাড়া কেন মাঝে মাঝে ফলন কমে, কেন অধিবাসীরা নিজেদের ধর্মবিশ্বাস আঁকড়ে থাকে ইত্যাদি যেসব প্রশ্নের যুগ যুগ ধরে সমাধান হয় না, হতে পারে না, তার পরিষ্কার, সন্দেহাতীত সমাধান পাওয়া গেছে। আর সে সিদ্ধান্ত হয়েছে কারেনিনের মতামতের অনুকূলে। কিন্তু স্ত্রেমভ, গত অধিবেশনে যিনি ভয়ানক মার খেয়েছেন বলে, অনুভব করছিলেন, তিনি হঠাৎ এমন একটা কৌশল অবলম্বন করলেন যা কারেনিনের কাছে অপ্রত্যাশিত। অন্য কতকগুলো সদস্যকে পেছনে টেনে স্ত্রেমভ হঠাৎ চলে এলেন কারেনিনের পক্ষে এবং কার্যকরী করার জন্য কারেননি যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন তার প্রচণ্ড সমর্থন করলেন শুধু তাই নয়, একই প্রেরণায় অন্যান্য সব চরমপন্থী প্রস্তাবও পেশ করলেন। কারেনিনের যা মূল ভাবনা ছিল তার বিপরীতে আরো জোরদার করা এসব ব্যবস্থা গৃহীত হয় এবং তখন প্রকাশ পেল স্ত্রেমভের কারসাজি। একেবারে চূড়ান্ত টেনে নিয়ে যাওয়া এসব ব্যবস্থা হঠাৎ দেখা গেল এমনই গবেট যে একই কালে রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, সমাজসেবক, বুদ্ধিমতী মহিলা তার সংবাদপত্র-সবাই একসাথে আক্রমণ করল ব্যবস্থাগুলোকে এবং তার স্বীকৃত জনক কারেনিনের বিরুদ্ধে প্রকাশ করল তাদের ক্রোধ। প্ৰেমভ কিন্তু সরে রইলেন, ভাব দেখালেন যেন কারেনিনের পরিকল্পনা তিনি অনুসরণ করেছেন অন্ধের মত, যা করা হয়েছে তাতে নিজেই এখন তিনি বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ। ল্যাঙ খেলেন কারেনিন। কিন্তু ক্ষীয়মাণ স্বাস্থ্য ও পারিবারিক অশান্তি সত্ত্বেও কারেনিন হার মানলেন না। দ্বিধাবিভক্ত হল কমিশন। প্রেমভের নেতৃত্বে একদল সদস্য নিজেদের ভুলের এই কৈফিয়ত দিল যে কারেনিন পরিচালিত রিভিজরী কমিশনের রিপোর্ট তারা বিশ্বাস করেছিল এবং বলল যে রিপোর্টটা একেবারে বাজে, শুধু একটা চোতা কাগজ। কারেনিন এবং আরেক দল লোক কাগজের প্রতি এইরূপ বৈপ্লবিক মনোভাবের বিপজ্জনকতা লক্ষ্য করে রিভিজরী কমিশন রচিত তথ্যগুলো সমর্থন করে চললেন। এর ফলে রাষ্ট্রের উঁচু মহলে এমন কি সমাজেও সবাই গোলমালে পড়লেন এবং ব্যাপারটায় সকলের খুবই আগ্রহ থাকলেও কেউ বুঝতে পারলেন না অরুশ লোকেরা সত্যি কি দারিদ্র্যে ভুগছে আর ধ্বংস পাচ্ছে নাকি শ্রীবৃদ্ধি হচ্ছে তাদের। এর পরিণামে এবং অংশত স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তাঁর প্রতি একটা অবজ্ঞার ফলে কারেনিনের অবস্থা হয়ে দাঁড়াল খুবই টলমলে। এই অবস্থায় একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। কমিশনকে অবাক করে তিনি ঘোষণা করলেন যে সমীক্ষার জন্য তিনি নিজে অত্যন্ত অঞ্চরে যাবার অনুমতি চাইবেন। এবং অনুমতি পেয়ে তিনি যাত্রা করলেন দূরের গুবেনির্য়াগুলোয়।
