‘বিবাহবিচ্ছেদের জন্যে আমার সহযোগিতা আপনি চান?’
‘হ্যাঁ, ঠিক তাই, কিন্তু আপনাকে বলে রাখা উচিত যে এতে আপনার মনোযোগের অব্যবহার করার ভয় থাকছে আমার। আমি এসেছি শুধু আপনার সাথে প্রাথমিক একটা পরামর্শের জন্যে। বিবাহবিচ্ছেদ আমি চাই, কিন্তু কি কি উপায়ে সেটা সম্ভব তা আমার গুরুত্বপূর্ণ। উপায়গুলো যদি আমার প্রয়োজনের সাথে না মেলে, তাহলে খুব সম্ভব আমি আইনের আশ্রয় নিতে অস্বীকৃত হব।’
‘ও, সে তো সব সময়ই তাই’, অ্যাডভোকেট বললেন, ‘সব সময়ই সেটা আপনার ইচ্ছাধীন।’
অ্যাডভোকেট চোখ নামালেন কারেনিনের পায়ের দিকে, টের পাচ্ছিলেন যে নিজের অসংযত আনন্দ দেখিয়ে তিনি আহত করতে পারেন মক্কেলকে। নাকের সামনে উড়ে-আসা আরেকটা পোকার দিকে চাইলেন তিনি, হাত তাঁর ঝটকা দিয়ে উঠল, কিন্তু কারেনিনের অবস্থাটার প্রতি সম্মানবশত ধরলেন না সেটাকে।
‘এ ব্যাপারে আমাদের আইনে বিধি আমার মোটামুটি জানা থাকলেও’, কারেনিন বলে চললেন, ‘আমি সাধারণভাবে জানতে চাই, কার্যক্ষেত্রে এ ধরনের ব্যাপার চলে কিভাবে?’
‘আপনি চাইছেন যে’, চোখ না তুলে, কিছুটা তুষ্টি নিয়েই মক্কেলের কথার সুরে সুর মিলিয়ে অ্যাডভোকেট জবাব দিলেন, ‘কি কি উপায়ে আপনার ইচ্ছা পূরণ হতে পারে তা আপনাকে আমি বলি?’
কারেনিনের সম্মতিসূচক মাথা-নাড়া পেয়ে শুধু মাঝে মাঝে তাঁর লাল ছোপে ভরে ওঠা মুখের দিকে চকিত দৃষ্টিপাত করে অ্যাডভোকেট কথা চালিয়ে গেলেন।
আমাদের আইনের প্রতি তাঁর অনুমোদনের সামান্য আভাস দিয়ে তিনি বললেন, ‘আমাদের আইনে বিবাহবিচ্ছেদ সম্ভব, যা আপনি জানেন, নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে…অপেক্ষা করুন!’ দরজায় উঁকি দেওয়া সহকারীকে বললেন তিনি, তাহলেও উঠে দাঁড়িয়ে কয়েকটা কথা বলে আবার বসলেন, ‘সম্ভব এই-এই ক্ষেত্রেঃ দম্পতিদের দৈহিক অক্ষমতা, সংবাদ না দিয়ে পাঁচ বছরের বিচ্ছেদ’, বলছিলেন তিনি লোমে ভরা নিজের খাটো আঙুল মুড়ে, ‘তারপর ব্যভিচার’ (কথাটা তিনি উচ্চারণ করলেন সুস্পষ্ট তৃপ্তির সাথে)। ‘উপবিভাগগুলো এই রকম’ (মোটা মোটা আঙুলগুলো মুড়ে চললেন তিনি, যদিও ঘটনা এবং উপবিভাগগুলোকে স্পষ্টতই একসাথে শ্রেণীবদ্ধ করা যায় না) : ‘স্বামী বা স্ত্রীর দৈহিক অক্ষমতা, তারপর স্বামী বা স্ত্রীর দিক থেকে ব্যভিচার।’ সমস্ত আঙুলগুলো মোড়া শেষ হয়ে যাওয়ায় উনি আবার সেগুলো সোজা করে নিলেন এবং বলে চললেন : ‘এগুলো হল তাত্ত্বিক দিক থেকে। কিন্তু আমি অনুমান করি, আপনি আমার কাছে এসে আমাকে সম্মান দেখিয়েছেন ব্যবহারিক ব্যাপারটা জানাবার জন্যে। তাই আগেকার নজিরগুলো থেকে আপনাকে আমার জানানো উচিত যে বিবাহবিচ্ছেদের সমস্ত ঘটনাই দাঁড়ায় এই : দৈহিক অক্ষমতা নেই, যা আমি বুঝছি? খবর না দিয়ে অনুপস্থিতিও?…’
সায় দিয়ে মাথা নাড়লেন কারেনিন।
‘তাহলে আসছে এটা : দম্পতিদের একজনের ব্যভিচার এবং পরস্পরের সম্মতিক্রমে তা প্রকাশ, আর সে রকম সম্মতি না থাকলে জোর করে তা প্রকাশ। বলা উচিত যে, শেষোক্ত ব্যাপারটা বাস্তবে দেখা যায় কম’, বলে অ্যাডভোকেট চকিতে দৃষ্টিপাত করলেন কারেনিনের দিকে, তারপর চুপ করে রইলেন, যেভাবে পিস্তল-বিক্রেতা দুটো অস্ত্রের গুণ বর্ণনা করে খরিদ্দারের পছন্দের প্রতীক্ষায় থাকে। কিন্তু কারেনিন কিছু বললেন না, তাই অ্যাডভোকেট আবার শুরু করলেন, ‘সবচেয়ে সাধারণ, সহজ এবং আমি মনে করি বিচক্ষণ হল পরস্পরের সম্মতিক্রমে ব্যভিচার। কোন অপরিণত লোক হলে আমি কথাটা এভাবে বলতাম না’, অ্যাডভোকেট বললেন, ‘কিন্তু আশা করি, আমাদের কাছে এটা বোধগম্য।‘
কারেনিন কিন্তু এতই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন যে পরস্পরের সম্মতিক্রম ব্যভিচারের বিচক্ষণতা তখনই বুঝে উঠতে পারলেন না, সে না-বোঝাটা প্রকাশ পেল তাঁর দৃষ্টিতে; তবে অ্যাডভোকেট সাথে সাথেই সাহায্য করলেন তাঁকে : ‘দুজনে আর একসাথে থাকতে পারছে না-এই হল গে ঘটনা। আর দুজনেই যদি সেটা মেনে নেয়, তাহলে খুঁটিনাটি ও আনুষ্ঠানিকভাবে দিকগুলো হয়ে দাঁড়ায় অচিঞ্চিৎকার। সেই সাথে এটা হল সবচেয়ে সহজ আর সঠিক উপায়।
কারেনিন এবার পুরোপুরি বুঝলেন। কিন্তু এ ব্যবস্থা গ্রহণে বাধা দিচ্ছিল তাঁর ধর্মীয় সংস্কার। বললেন, ‘বর্তমান ক্ষেত্রে এ প্রশ্ন আসে না। এক্ষেত্রে শুধু একটা ব্যাপারেই সম্ভব : ইচ্ছার বিরুদ্ধেই প্রকাশ করে দেওয়া, আমার কাছে যে চিঠি আছে তাতে তা প্রমাণিত হবে।’
চিঠির উল্লেখ অ্যাডভোকেট ঠোঁট চেপে অস্ফুট শব্দ করলেন যাতে প্রকাশ পেল একই সাথে সমবেদনা আর অবজ্ঞা।
শুরু করলেন, ‘দেখুন, এ ধরনের ব্যাপারের নিষ্পত্তি করে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ, যা আপনি জানেন। আর পাদ্রীরা, স্বামীরা এ সব ব্যাপারের তুচ্ছ খুঁটিনাটিও ঘাঁটাঘাঁটি করতে খুব ভালোবাসেন’, হেসে বললেন উনি, তাতে ফুটে উঠল পাদ্রীদের রুচির সাথে তাঁর সহমর্মিতা, ‘চিঠি অংশত প্রমাণ করতে পারে তাতে সন্দেহ নেই; কিন্তু ব্যাপারটা ফাঁস করতে হবে সরাসরি উপায়ে, অর্থাৎ সাক্ষী মারফত। আপনি যদি আমার ওপর আস্থা রাখার সম্মান আমাকে দেন, তাহলে কি কি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত তা নির্বাচনের ভার আমাকে দিন। যে ফল পেতে চায় তাকে উপায়টাও মেনে নিতে হবে।’
